
নক্ষত্রজগতের পরিবর্তনশীলতা এবং রাতের আকাশ কীভাবে গতিশীলতা খুঁজে বের করে, তা নিয়ে শিশুদের উপযোগী একটা গেম বানিয়েছেন বাংলাদেশের চার শিক্ষার্থী।
আর সেটিই নাসা স্পেস অ্যাপস চ্যালেঞ্জ ২০২২ প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে উৎসাহব্যঞ্জক প্রকল্প হিসেবে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশের ‘টিম ডায়মন্ডস’। শিক্ষার্থীদের তৈরি এ প্রকল্পটি নক্ষত্রের রং, ঔজ্জ্বল্য, ভরের পরিবর্তন—এর পেছনে লুকিয়ে থাকা কারণগুলো সম্পর্কে শিশুদের জানাতে পারে। গেমটি খেলার সময় শিশুরা তাদের নিজস্ব নক্ষত্র তৈরি থেকে শুরু করে নক্ষত্রের ধরন, রঙের পরিবর্তন, ঔজ্জ্বল্য, ভরের পরিবর্তন করতে পারবে।
গত ৮ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা—নাসা একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নাসা স্পেস অ্যাপস চ্যালেঞ্জ প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করে। নাসার এ প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হলো বাংলাদেশের এই দল।
টিম ডায়মন্ডসের সদস্যরা হলেন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির টিসা খন্দকার (দলনেতা), মুনিম আহমেদ, ইনজামামুল হক, আবু নিয়াজ ও নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ছাত্রী জারিন চৌধুরী। উপদেষ্টা ছিলেন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক তৌহিদ ভূঁইয়া এবং মেন্টর একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সফটওয়্যার প্রকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খালেদ সোহেল।
নাসা স্পেস অ্যাপস চ্যালেঞ্জ ২০২২ একটি আন্তর্জাতিক হ্যাকাথন প্রতিযোগিতা। এ বছর নাসা স্পেস অ্যাপস চ্যালেঞ্জে ১৬২টি দেশ থেকে ২ হাজার ৮১৪টি দল অংশ নিয়েছিল। সব যাচাই-বাছাইপ্রক্রিয়া শেষে আন্তর্জাতিক বিচারপ্রক্রিয়ার জন্য বৈশ্বিক মনোনয়ন পেয়েছিল ৪২০টি দল। পরে মাত্র ৩৫টি দল চূড়ান্ত পর্বে ‘গ্লোবাল ফাইনালিস্ট’ হিসেবে জায়গা করে নেয়। ৩৫টি দলের এ তালিকায় বাংলাদেশের একমাত্র দল ছিল ‘টিম ডায়মন্ডস’।
চূড়ান্ত পর্বের আগে বেসিস এবং বেসিস স্টুডেন্টস ফোরামের সহযোগিতায় দেশে আয়োজিত প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ থেকে পাঁচ শতাধিক প্রকল্প জমা পড়েছিল। যাচাই-বাছাই শেষে ১২০টি প্রকল্পের প্রতিনিধিরা ৪৮ ঘণ্টাব্যাপী হ্যাকাথনে অংশ নেন এবং সেরা ১৮টি প্রকল্প নাসার জন্য বাংলাদেশ থেকে মনোনীত করা হয়। একযোগে ঢাকা, চট্টগ্রাম সিলেট, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, রংপুর, ময়মনসিংহ ও কুমিল্লায় এ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। কুমিল্লা থেকে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নাসায় মনোনয়ন পেয়েছিল ‘টিম ডায়মন্ডস’।
দলনেতা টিসা খন্দকার জানান, প্রকল্পটি শিশুদের নিয়ে। শিশুরা যেন ছোটবেলা থেকেই মহাকাশ নিয়ে ভাবতে পারে, মহাকাশের অজানা সব তথ্য সম্পর্কে খুব সহজে জানতে পারে। মহাকাশে থাকা অজস্র নক্ষত্র, এদের পরিবর্তন সাধারণত খালি চোখে দেখা সম্ভব হয় না। কারণ, এ পরিবর্তনগুলো খুব ধীর বা চোখের জন্য খুব ক্ষীণ হয়। তাদের চ্যালেঞ্জের মূল বিষয়বস্তু ছিল নাক্ষত্রিক এ পরিবর্তন মানুষ কীভাবে শিখবে? কীভাবে বুঝবে যে রাতের আকাশ আসলে কতটা গতিশীল!
টিম ডায়মন্ডের প্রকল্প একটি গেম। গেমের মাধ্যমে মহাকাশ সম্পর্কে জানার এক ব্যবস্থা। এ গেমের মাধ্যমে শিশুরা নক্ষত্রের রং, ঔজ্জ্বল্য, ভরের পেছনে লুকিয়ে থাকা কারণগুলো সম্পর্কে জানতে পারবে। এটি খেলতে খেলতে শিশুরা তাদের নিজস্ব নক্ষত্র তৈরি থেকে শুরু করে নক্ষত্রগুলোর নকশা, রঙের পরিবর্তন, ঔজ্জ্বল্য, ভরের পরিবর্তন অনুমান করতে পারবে।
টিসা বলেন, এর উদ্দেশ্য ছিল মূলত শিশুদের তারার ঝিকিমিকি, রাতের আকাশের ধীরগতির পরিবর্তন এবং কেন ঘটেছিল, তা বোঝার সুযোগ দেওয়া। তাদের বিশ্বাস যে তাদের অ্যাপটি ছোটবেলা থেকেই মহাকাশের অজানাকে জানাতে এবং অদেখাকে দেখাতে ভূমিকা পালন করবে।
টিসা খন্দকার বলেন, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা যে সত্যিই উদ্ভাবনী ক্ষমতার অধিকারী, তা আরও একবার প্রমাণিত হলো। একজন মানুষের কাছে নিজের দেশকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার চাইতে গৌরবের হয়তো আর কিছুই হতে পারে না। নাসা স্পর্শের নয়, এক বিশাল স্বপ্ন জয়ের জায়গা।
এ অর্জন সম্পর্কে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) সভাপতি রাসেল টি আহমেদ বলেন, ‘স্মার্ট বাংলাদেশ নির্মিত হচ্ছে আমাদের তরুণদের হাত ধরে। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সম্মিলিত দলটি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের খেতাব অর্জন করেছে, যা নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য বড় অর্জন। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের দল তৃতীয়বারের মতো এবং পরপর গত দুই বছর বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। আমরা বেসিস থেকে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার যে যাত্রা অব্যাহত রেখেছি, এ অর্জন আমাদের প্রচেষ্টার পথে আরেকটি বড় মাইলফলক।’
টিম ডায়মন্ডসের সদস্যরা পুরস্কার হিসেবে নাসার মূল আয়োজনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পাবেন। সেই ভ্রমণে নাসার একটি কেন্দ্র পরিদর্শনসহ মহাকাশযান উৎক্ষেপণ দেখার সুযোগ থাকবে।