ইন্টারনেট গ্রাহকের সমস্যার সমাধান করতে এভাবেই এগিয়ে যান বাবা সাজেদুল ইসলাম (বাঁয়ে) ও ছেলে মুনতাসির মামুন
ইন্টারনেট গ্রাহকের সমস্যার সমাধান করতে এভাবেই এগিয়ে যান বাবা সাজেদুল ইসলাম (বাঁয়ে) ও ছেলে মুনতাসির মামুন

গাইবান্ধার গ্রামে বাবা-ছেলের ব্রডব্যান্ড উদ্যোগ

ঘড়ির কাঁটায় রাত একটা বা রাত তিনটা যেটাই বাজুক না কেন, বাবা ও ছেলে পৌঁছে যান তাঁদের ব্রডব্যান্ড সংযোগের সেবা দিতে। ঘুরে বেড়ান গ্রামে গ্রামে তাঁদের সেবা নিয়ে। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সর্বানন্দ ও বামনডাঙ্গা—এই দুই ইউনিয়নের বেশির ভাগ গ্রামে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ নিয়ে কাজ করছেন বাবা সাজেদুল ইসলাম ও ছেলে মুনতাসির মামুন। ২০২০ সালে ‘সফল টেলিকম’ প্রতিষ্ঠা করে তাঁরা এ সংযোগ দিয়ে যাচ্ছেন।

ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত ফাইবার অপটিক কেব্‌লের নেশনওয়াইড টেলিকমিউনিকেশন ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্কের (এনটিটিএন) কল্যাণে গ্রামে ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া যাচ্ছে বলে জানালেন সাজেদুল। সর্বানন্দ ইউনিয়নে এনটিটিএন নিয়ে গেছে ফাইবার অ্যাট হোম। এর মাধ্যমে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগদাতা জাদু ব্রডব্যান্ডের কাছ থেকে ব্যান্ডউইথড নিয়েছে সফল টেলিকম। গ্রামের ছোট ছোট দোকানে দিয়েছেন ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ। এ কারণে অনলাইনের মাধ্যমে গ্রামের মানুষ পেয়েছে সরকারি সব ডিজিটাল সেবা। জন্মনিবন্ধন, টিন, ই-পাসপোর্ট, স্কুল ভর্তির আবেদন, পরীক্ষার ফলাফলসহ নানা রকম সেবা দিয়ে থাকেন ছোট ছোট দোকানিরা।

বড় শহরে তারহীন ওয়াই-ফাই সংযোগের হটস্পট দেখা যায় বিভিন্ন পার্ক কিংবা জনসমাগম হয়, এমন জায়গায়। কিন্তু গ্রামে এ সুবিধার কথা অনেকের ভাবনার বাইরে। সাজেদুল ও তাঁর ছেলে সে কাজই করে দেখাচ্ছেন বামনডাঙ্গা, সর্বানন্দ ইউনিয়নের মোড়ে মোড়ে। তিন বা চার রাস্তার মোড়, চায়ের দোকান এবং জনসমাগম হয় এমন ২৫টি স্থানে হটস্পটের ব্যবস্থা রয়েছে। বৃহস্পতিবার মুঠোফোনে সাজেদুল বলেন, ‘মোবাইল ফোন থেকে হটস্পট ব্যবহারকারী এখন ৫০৮ জন, যারা অনলাইনে ক্লাস করছে, বিভিন্ন টিউটরিয়াল দেখছে, নাটক-সিনেমা দেখছে, খবর শুনছে কিংবা ফেসবুক ব্যবহার করছে।’

গ্রামের হটস্পটগুলো থেকে গ্রাহকেরা তারহীন ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করতে পারেন। গ্রাহকদের জন্য বিভিন্ন প্যাকেজ তৈরি করেছেন বাবা-ছেলে। অভিনব ভাউচার কার্ড তৈরি করেছেন। ৩ দিনের আনলিমিটেড প্যাকেজের দাম ২০ টাকা, ৭ দিনের আনলিমিটেড প্যাকেজ ৬০ টাকা, ১৫ দিনের আনলিমিটেড প্যাকেজ ১০০ টাকা এবং ১ মাসের আনলিমিটেড প্যাকেজের দাম ২০০ টাকা।

ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগের কারণে গ্রামের ছোট দোকান এখন যেন ডিজিটাল সেন্টার

হটস্পটের বাইরে দুই ইউনিয়নে বর্তমানে ১০০টি বাড়িতে ব্রডব্যান্ড সংযোগ ব্যবহৃত হচ্ছে। গ্রামের বাজারের ৫টি দোকানেও আছে ব্রডব্যান্ড সংযোগ। এই দোকানগুলো থেকে অনলাইনে বিভিন্ন ফরম পূরণ, পরীক্ষার ফলাফল ইত্যাদি সেবা দেওয়া হয়।

সাজেদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রত্যন্ত গ্রামে মানুষের যেসব ডিজিটাল সেবা প্রয়োজন, সেগুলো দেওয়ার চেষ্টা করছি আমরা। বিভিন্ন মোড় ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে হটস্পটের ব্যবস্থা করে দিয়েছি। যে ছেলেমেয়েদের বাড়িতে ইন্টারনেট সংযোগ নেওয়ার সামর্থ্য নেই, তারা কম খরচে এই হটস্পট ব্যবহার করতে পারছে।’

সাজেদুলের ছেলে মুনতাসির মামুনের ডাকনাম সফল। তাঁর নামেই এ প্রতিষ্ঠান—সফল টেলিকম। ব্রডব্যান্ড সেবার কারিগরি দিকটির বেশির ভাগ ছেলেই সামলান। সর্বানন্দ ইউনিয়নের মাস্টারপাড়া গ্রামে ধানখেতের পাশেই সফল টেলিকমের সার্ভারকক্ষ। ধীরে ধীরে সেখানে বাড়ছে র‌্যাক (তাক), রাউটার, অ্যানটেনা ইত্যাদি যন্ত্রপাতির সংখ্যা।

গ্রামে ব্রডব্যান্ড সংযোগ দিয়ে এখন প্রতি মাসে কমবেশি ৩০ হাজার টাকা আয় হয় সফল টেলিকমের। এরই মধ্যে কয়েক কিলোমিটার ফাইবার অপটিক কেব্‌ল টেনেছে সফল টেলিকম। এই নেটওয়ার্কের বিস্তার দিন দিন বাড়ছে।

মাস্টারপাড়া গ্রামে সফল টেলিকমের সার্ভারকক্ষ

সাজেদুল ইসলাম বামনডাঙ্গা আব্দুল হক মহাবিদ্যালয়ে কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকরি করেন। বাকি সময় দেন ছেলের সঙ্গে সফল টেলিকমে। ছেলে মুনতাসির মামুন রংপুর মডেল কলেজে ব্যবস্থাপনা বিভাগে স্নাতক (সম্মান) তৃতীয় বর্ষের ছাত্র।

ইন্টারনেট সংযোগ, নেটওয়ার্কিং, সার্ভার, রাউটার ইত্যাদি বিষয়ের কারিগরি জ্ঞান পেয়েছেন ইউটিউবে নানা ধরনের টিউটরিয়াল ভিডিও দেখে। তারপর মাঠে নেমে পড়া। কাজ করতে করতেই প্রতিদিন শিখছেন, নিজের দক্ষতা বাড়াচ্ছেন। এভাবেই বললেন মুনতাসির মামুন।

সাজেদুল প্রথম আলোকে বলেন, ‘করোনা মহামারির সময় ছেলেমেয়েদের অনলাইন ক্লাস ও সুরক্ষার টিকা নিবন্ধনের মতো সেবা জরুরি হয়ে ওঠে। এ সেবা দিতে পেরে আমরা আনন্দিত। এ ছাড়া আমাদের গ্রাম এবং আশপাশের গ্রামেও কয়েকজন ফ্রিল্যান্সার ও ইউটিউবার রয়েছেন। তাঁরা আমাদের ব্রডব্যান্ড সংযোগ নিয়ে আয় করতে পারছেন। এগুলোও বড় প্রাপ্তি।’

গ্রামের মোড়ে হটস্পট সংযোগ দেওয়ার যন্ত্র

বামনডাঙ্গার ব্লগার ও ফ্রিল্যান্সার মুনির হোসেন মুঠোফোনে প্রথম আলোকে, ‘গ্রামে এমনিতেই ইন্টারনেটের সমস্যা। মোবাইল ফোনের টাওয়ার থাকলেও সেভাবে ইন্টারনেট পাওয়া য়ায় না। সফল টেলিকমের উদ্যোগের কারণে আমি সফলভাবে আমার কাজ করতে পারছি। বড় কথা হলো কোনো সমস্যা হলে যত রাতই হোক সেবা দেয় তারা।’

সাজেদুল ইসলাম ও মুনতাসির মামুন সফল টেলিকমের ব্রডব্যান্ড ও হটস্পটের সেবা আরও বিস্তৃত করতে চান। আশপাশের যেসব গ্রামে ইন্টারনেট নেই, সেখানেও নিয়ে যেতে চান তাঁদের সংযোগ। পাশাপাশি গ্রামের ছেলেমেয়েদের জন্য একটি ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণকেন্দ্র চালুর উদ্যোগও নেবেন বলে জানান তিনি।