জলবায়ু পরিবর্তনসহ আবহাওয়াগত বিভিন্ন কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা দেয় খরা। আর তাই বিশ্বজুড়ে খরা বা পানিশূন্য অবস্থাকে কখনোই আকস্মিক ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। কোনো কোনো বছর একাধিক মহাদেশজুড়ে শুষ্ক আবহাওয়া বিরাজ করলেও পুরো পৃথিবী কিন্তু কখনোই একসঙ্গে খরাকবলিত হয় না। সম্প্রতি সেলফ–ক্যালিব্রেটিং পালমার ড্রাউট সিভিয়ারিটি ইনডেক্স ব্যবহার করে পৃথিবী কেন কখনোই একসঙ্গে পুরোপুরি পানিশূন্য হয় না, তার কারণ খুঁজে বের করেছেন ভারতের বিজ্ঞানী উদীত ভাটিয়া।
১৯০১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ের আবহাওয়ার ধারণ করা তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষণায় বলা হয়েছে, বৈশ্বিক খরা পরিস্থিতির মধ্যে আংশিক মিল থাকলেও তা কখনোই পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সমুদ্রের তাপমাত্রার পরিবর্তন ও বায়ুমণ্ডলীয় চক্রের কারণে পৃথিবীর এক প্রান্তে যখন খরা দেখা দেয়, অন্য প্রান্তে তখন বৃষ্টির দেখা মেলে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরীয় চক্র এই প্রক্রিয়ায় প্রধান ভূমিকা পালন করে। এল নিনো চলাকালীন সাধারণত অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার কিছু অংশে খরা দেখা দেয়। অন্যদিকে লা নিনা এই শুষ্কতাকে আফ্রিকা বা দক্ষিণ আমেরিকার দিকে সরিয়ে দেয়। নেটওয়ার্ক মডেল অনুযায়ী, এল নিনো আঞ্চলিক খরার যোগসূত্রকে আরও দৃঢ় করে নির্দিষ্ট কিছু পকেট বা এলাকা তৈরি করে। কিন্তু লা নিনা এই খরাকে ছড়িয়ে দেয়, যার ফলে বৈশ্বিক পর্যায়ে কোনো একক মহা খরা সৃষ্টি হতে পারে না। মহাসাগরের এই পরিবর্তনশীলতা আর্দ্রতাকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত করে থাকে।
মাঝারি মাত্রার খরাও কৃষি খাতে বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে যখন শুষ্কতা সীমা অতিক্রম করে, তখন গম, ভুট্টা, ধান ও সয়াবিনের ফলন নাটকীয়ভাবে কমে যায়। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, এই ঝুঁকির সময় সব অঞ্চলে এক নয়। উত্তর আমেরিকার কোনো অংশে যখন ভুট্টার ফলন ব্যাহত হয়, দক্ষিণ এশিয়ার ধানের খেত তখন হয়তো স্থিতিশীল থাকে। দক্ষিণ আমেরিকার সয়াবিন চাষের ক্ষতি আর মধ্য এশিয়ার গমের সংকট সব সময় একই সময়ে ঘটে না। এ ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্নভাবে ঘটে বলে বৈশ্বিক খাদ্য ব্যবস্থা একবারে ধসে পড়া থেকে রক্ষা পায়।
ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাষ্পীভবনের হার বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা জলবায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তবে তাপমাত্রা বাড়লেও বৃষ্টির ধরনই নির্ধারণ করে কোন অঞ্চলটি বেশি শুষ্ক হবে। কয়েক দশকের তথ্য বলছে, খরার ক্ষেত্রে বৃষ্টির তারতম্যই সবচেয়ে বড় প্রভাবক। বায়ুমণ্ডলীয় সঞ্চালনের কারণে বৃষ্টি কখনোই বিশ্বজুড়ে একযোগে বন্ধ হয় না। যখন একটি সমুদ্র অববাহিকা উষ্ণ হয়, অন্যটি শীতল থাকে। ফলে পৃথিবী এক নিশ্বাসে শুকিয়ে যায় না; বরং অঞ্চলভেদে চাপের মুখে পড়ে। প্রকৃতির এই জটিল ভারসাম্যই বিশ্বকে একযোগে পানিশূন্য হওয়া থেকে রক্ষা করছে।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া