শিল্পীর চোখে পাহাড়ের গুহায় আদিম মানুষের বসবাস। ক্রোয়েশিয়ার নিয়েনদেরথাল জাদুঘরে ২০১৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তোলা
শিল্পীর চোখে পাহাড়ের গুহায় আদিম মানুষের বসবাস। ক্রোয়েশিয়ার নিয়েনদেরথাল জাদুঘরে ২০১৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তোলা

আদিম মানুষেরা যেভাবে হাঁটত

মানুষের সঙ্গে অন্যান্য প্রাণীর সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো বড় মস্তিষ্ক ও দুই পায়ে সোজা হয়ে হাঁটার ক্ষমতা। বিবর্তনের ইতিহাসে ঠিক কবে থেকে আমাদের পূর্বপুরুষেরা দুই পায়ে হাঁটতে শুরু করেছিল, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে বিতর্ক চলছে। সম্প্রতি একটি জীবাশ্ম বিশ্লেষণ এ রহস্যের জট খুলতে শুরু করেছে। গবেষকেরা বলছেন, আজ থেকে প্রায় ৭০ লাখ বছর আগেই মানুষের আদি পূর্বপুরুষদের মধ্যে দুই পায়ে হাঁটার বিবর্তনের লক্ষণ দেখা দিয়েছিল।

এ গবেষণার কেন্দ্রে রয়েছে ‘সাহেলানথ্রোপাস চ্যাডেন্সিস’ নামের একটি প্রজাতি। এরা উত্তর-মধ্য আফ্রিকায় বাস করত। ২০০১ সালে আফ্রিকার দেশ চাদে যখন প্রথম এই প্রজাতির মাথার খুলির ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়, তখনই নৃবিজ্ঞানীদের মনে কৌতূহল জাগে—আদিম এই প্রজাতি কি দুই পায়ে হাঁটত? মাথার খুলির গোড়ার যে অংশ দিয়ে মেরুদণ্ড প্রবেশ করে, তার অবস্থান দেখে মনে হয়েছিল, এটি সোজা হয়ে মাথা বহনের উপযোগী। কিন্তু কেবল মাথার খুলি দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব ছিল না। পরবর্তী সময়ে ওই একই স্থানে একটি ঊরুর হাড় পাওয়া যায়। ২০২০ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, এই হাড়ে দুই পায়ে হাঁটার কোনো জোরালো প্রমাণ নেই। এই ফলাফল সাহেলানথ্রোপাসকে মানুষের আদি পূর্বপুরুষ বা হোমিনিড হিসেবে গণ্য করার ক্ষেত্রে সংশয় তৈরি করেছিল।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক থ্রি-ডি জিওমেট্রিক মরফোমেট্রিকস নামের একটি উন্নত পদ্ধতি ব্যবহার করে জীবাশ্মটির আকৃতি নিখুঁতভাবে পরিমাপ করেছেন। তারা ঊরুর হাড়ে এমন কিছু শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্য খুঁজে পেয়েছে, যা পরবর্তীকালের হোমো স্যাপিয়েন্স বা আধুনিক মানুষের দুই পায়ে হাঁটার জন্য অপরিহার্য। ঊরুর হাড়টি কিছুটা ভেতরের দিকে বাঁকানো এবং সেখানে পপলির পেশি যুক্ত হওয়ার একটি ক্ষুদ্র অংশ রয়েছে। ২০২২ সালে ফ্রান্সের পোয়াতিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক গুইলাম ডেভার ও ফ্রাঙ্ক গাই নমুনাটিকে অভ্যাসগত দ্বিপদ বা দুই পায়ে হাঁটার প্রমাণ হিসেবে দাবি করেছিলেন। বিজ্ঞানীরা আরও একটি সূক্ষ্ম সংকেত খুঁজে পেয়েছেন। হাড়টির ঠিক সেই জায়গায় একটি ছোট পিণ্ড বা বাম্প রয়েছে, যেখানে মানুষের ক্ষেত্রে ইলিওফেমোরাল লিগামেন্ট যুক্ত থাকে। এই লিগামেন্টটি দুই পায়ে হাঁটার সময় শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে মূল স্থায়িত্ব দান করে।

অবশ্য সব বিজ্ঞানী এই তত্ত্বে এখনো পুরোপুরি একমত নন। জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউটের মেরিন কাজেনাভের মতে, এই প্রমাণ কিছুটা দুর্বল। অনেক চারপেয়ে প্রাইমেটদেরও এমন বাঁকানো ঊরুর হাড় থাকতে পারে। এ ছাড়া জীবাশ্মটি খুব একটা ভালো অবস্থায় নেই বলে এর সব বৈশিষ্ট্যের সঠিক বিস্তার বোঝা অসম্ভব।

সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান