মহাবিশ্ব
মহাবিশ্ব

মহাবিশ্বে আমরা কি সত্যিই একা

বিশাল মহাবিশ্বে কি অন্য কোথাও প্রাণের অস্তিত্ব আছে? এই প্রশ্ন আমাদের অনেকের মনেই উঁকি দেয়। নব্বই দশকের শুরু পর্যন্ত আমাদের সৌরজগতের বাইরে কোনো গ্রহের অস্তিত্ব আমাদের জানা ছিল না। কিন্তু ২০২৫ সাল পর্যন্ত নাসার বিভিন্ন মহাকাশ অভিযানের কল্যাণে বিজ্ঞানীরা ৬ হাজারের বেশি এক্সোপ্ল্যানেটের (সৌরজগতের বাইরে থাকা গ্রহ) অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছেন। আরও কয়েক হাজার গ্রহ এখন স্বীকৃতির অপেক্ষায় রয়েছে। এর মধ্যে ডজনখানেক গ্রহ পৃথিবীর সমান এবং তাদের নক্ষত্রের বাসযোগ্য অঞ্চলে অবস্থিত। সেখানে তরল পানির অস্তিত্ব থাকা সম্ভব বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ নিখুঁতভাবে দূরবর্তী এই গ্রহগুলোর বায়ুমণ্ডল পর্যালোচনা করে প্রাণের রাসায়নিক চিহ্ন খুঁজছে। এরই ধারাবাহিকতায় নাসা তৈরি করছে হ্যাবিটেবল ওয়ার্ল্ডস অবজারভেটরি, যা কাজে লাগিয়ে সরাসরি পৃথিবী সদৃশ গ্রহগুলোর বায়ুমণ্ডলে প্রাণের স্পন্দন খুঁজে বের করা যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যদিও প্রশ্ন থেকে যায়, কখন আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারব যে ভিনগ্রহে প্রাণ পাওয়া গেছে। এই জটিল প্রশ্নের উত্তর দিতে নাসার বিজ্ঞানীরা একটি নতুন বৈজ্ঞানিক কাঠামোর প্রস্তাব করেছেন। সাত স্তরের স্কেলবিশিষ্ট বৈজ্ঞানিক কাঠামোটির বিষয়ে নাসার প্রধান বিজ্ঞানী জিম গ্রিন বলেন, এ ধরনের একটি কাঠামো আমাদের বুঝতে সাহায্য করবে যে কোনো নির্দিষ্ট স্থানে প্রাণের সন্ধানে আমরা ঠিক কতটুকু এগিয়েছি এবং আমাদের প্রযুক্তি ও অভিযানগুলো সেই লক্ষ্য পূরণে কতটা সক্ষম। মানদণ্ডটি বিজ্ঞানীদের ধাপে ধাপে চূড়ান্ত ঘোষণার দিকে নিয়ে যাবে।

নাসার সদর দপ্তরের অ্যাস্ট্রোবায়োলজি প্রোগ্রামের প্রধান মেরি ভয়েটেক বলেন, এখন পর্যন্ত আমরা সাধারণ মানুষকে বুঝিয়েছি, হয় প্রাণ আছে অথবা নেই। কিন্তু বিজ্ঞানের প্রতিটি আবিষ্কার একটির ওপর আরেকটি দাঁড়িয়ে তৈরি হয়। আমাদের আবিষ্কারের উত্তেজনা ভাগ করে নেওয়ার এবং জনমনে সঠিক প্রত্যাশা তৈরির জন্য একটি ভালো পদ্ধতি দরকার। মঙ্গল গ্রহে যখনই পানি বা জৈব যৌগের সন্ধান পাওয়া যায়, সংবাদমাধ্যমে এমনভাবে প্রচার করা হয়, যেন প্রাণ পাওয়া গেছে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা জানেন, পানি থাকা মানেই প্রাণ থাকা নয়। এই মানদণ্ড থাকলে সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষ বুঝতে পারবেন যে প্রতিটি ছোট পদক্ষেপই চূড়ান্ত আবিষ্কারের সিঁড়ি।

মঙ্গল গ্রহের ক্ষেত্রে নাসার পারসিভিয়ারেন্স রোভার বর্তমানে নমুনা সংগ্রহ করছে। ভবিষ্যতে এই নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে এনে বিভিন্ন গবেষণাগারে পরীক্ষা করা হবে। যদি একাধিক টিম স্বাধীনভাবে এতে প্রাণের চিহ্ন পায়, তবে এটি মানদণ্ডের ষষ্ঠ স্তরে পৌঁছাবে। কিন্তু চূড়ান্ত স্তরে পৌঁছাতে মঙ্গলের অন্য কোনো স্থানে গিয়ে পুনরায় একই ফলাফল পাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। সৌরজগতের বাইরের গ্রহগুলোর ক্ষেত্রে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন এবং মিথেনের সহাবস্থানকে বিজ্ঞানীরা খুব গুরুত্ব দিচ্ছেন। পৃথিবীতে উদ্ভিদ অক্সিজেন ত্যাগ করে এবং মিথেনও মূলত জৈবিক উৎস থেকে আসে। এ দুটি গ্যাস একসঙ্গে পাওয়া স্তর ৪ পর্যায়ের একটি মাইলফলক হতে পারে। কিন্তু অক্সিজেন প্রাকৃতিকভাবেও তৈরি হতে পারে, তাই ভূতাত্ত্বিক কারণগুলো বাতিল না করা পর্যন্ত একে চূড়ান্ত প্রমাণ বলা যাবে না।

নাসার আসন্ন বিভিন্ন মিশন যেমন বৃহস্পতির বরফাবৃত চাঁদ ইউরোপার উদ্দেশ্যে ইউরোপা ক্লিপার এবং শনির চাঁদ টাইটান অনুসন্ধানে ড্রাগনফ্লাই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এগুলো সরাসরি প্রাণ না খুঁজলেও প্রাণের বসবাসের উপযোগী পরিবেশ সম্পর্কে আমাদের ধারণা স্পষ্ট করবে। মেরি ভয়েটেক আরও বলেন, প্রতিটি পরিমাপের মাধ্যমে আমরা গ্রহগুলোর জৈবিক ও অজৈবিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে শিখছি। আমরা যে মহাবিশ্বে একা নই, সেই ইঙ্গিত খুঁজে পেতে হলে বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের ব্যাপক অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন ধরনের পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।

সূত্র: নাসা