
দোকানে গেলে চিনামাটির বাসনের কারুকার্য দেখে আমরা মুগ্ধ হই। সেই নীল রঙের ছবি মোহনীয়তা তৈরি করে আমাদের মধ্যে। সিরামিকের বাসনে নীল রঙের আবহ আসে কোবাল্ট ব্লু নামের রঞ্জক থেকে। কোবাল্ট ব্লু হলো নীল রঞ্জক, যা ১ হাজার ২০০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় অ্যালুমিনা ও কোবাল্ট অক্সাইড থেকে তৈরি করা হয়। কোবাল্ট ব্লু পিগমেন্ট প্রুশিয়ান নীলের চেয়ে হালকা ও কম প্রতিক্রিয়াশীল। অত্যন্ত স্থিতিশীল বলে সিরামিকশিল্পে এ ধাতু ব্যবহার করা হয়। কোবাল্ট ধাতু থেকে বিভিন্ন শিল্প খাতে নীল রঞ্জক উৎপাদন করা হয়। স্মার্টফোন, কম্পিউটারসহ নানা বৈদ্যুতিক যানবাহনে ব্যবহৃত ব্যাটারি তৈরির অন্যতম উপাদানও কোবাল্ট ধাতু।
বর্তমানে এই কোবাল্ট ধাতু সমালোচনার মুখে পড়ছে। এই ধাতুকে রীতিমতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। কোবাল্ট রুপালি–নীল রঙের। এই ধাতু লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি তৈরি করতে ব্যবহৃত হয়। কোবাল্ট ধাতু সবচেয়ে বেশি সংগ্রহ করা হয় কঙ্গোর বিভিন্ন খনি থেকে। তবে এসব খনি থেকে কোবাল্ট ধাতু সংগ্রহের ফলে সেখানকার মানুষ ও পরিবেশ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। শুধু তা–ই নয়, হাজার হাজার শ্রমিক এসব খনিতে অমানবিক পরিশ্রম ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথের গবেষক সিদ্ধার্থ কারা জানিয়েছেন, বিশ্বের ৭০ শতাংশের বেশি কোবাল্ট সংগ্রহ করা হয় কঙ্গোর বিভিন্ন খনি থেকে। নিয়মিত কোবাল্ট ধাতু সংগ্রহের ফলে সেখানকার পানি ও মাটি ব্যাপকভাবে দূষিত হচ্ছে। অনেক দেশ নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে অগ্রসর হওয়ায় কোবাল্টের ব্যাটারির চাহিদা কমার কথা। কিন্তু ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ধারণা, ২০৩০ সালের মধ্যে কোবাল্টের বৈশ্বিক চাহিদা চার গুণ বৃদ্ধি পাবে। মূলত বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যাপক চাহিদার কারণে কোবাল্টের চাহিদা বাড়ছে। কোবাল্ট খনির কারণে কঙ্গোয় শ্রমিকেরা শোষণের শিকার হচ্ছেন।
কোবাল্ট উজ্জ্বল আকারের রুপালি-নীল ধাতু। ব্যাটারিতে প্রচুর পরিমাণে শক্তি সঞ্চয় করতে সাহায্য করে। হিমায়িত অবস্থা ও উষ্ণ তাপমাত্রায় ব্যাটারির তাপমাত্রা স্থিতিশীল রাখে। আর তাই মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা থেকে শুরু করে চিকিৎসাবিজ্ঞানের নানা যন্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে কোবাল্ট। কোবাল্ট লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির কর্মক্ষমতা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাধারণ ব্যাটারির চেয়ে লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি রিচার্জ করা যায় সহজে। বছরের পর বছর ধরে পুনরায় ব্যবহার করা যায়; যদিও এসব ব্যাটারি বেশ ব্যয়বহুল। এ ধরনের ব্যাটারি স্মার্টফোনের মতো সাধারণ যন্ত্র থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক গ্রিডে শক্তি সঞ্চার করার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
কোবাল্ট উৎপাদন ব্যয়বহুল আর বিষাক্ত বলে পরিবেশের ক্ষতির আশঙ্কাও বেশি।
কঙ্গোর বিভিন্ন খনি থেকে কোবাল্টের পাশাপাশি তামা ও ইউরেনিয়াম সংগ্রহ করা হচ্ছে। কঙ্গোর কোলওয়েজি শহরটি খনির শহর হিসেবে আলোচিত। বিজ্ঞানী বেনোইট নেমেরি জানিয়েছেন, কোবাল্ট খনি যে এলাকায় অবস্থিত, সেখানকার শিশুদের মূত্রে অন্যান্য এলাকায় বসবাসকারী শিশুদের তুলনায় ১০ গুণ বেশি কোবাল্টের উপস্থিতি দেখা যায়। কোবাল্ট ও ইউরেনিয়ামের কারণে বায়ুদূষণ হচ্ছে। ইউরেনিয়াম রেডন নামের একটি গ্যাসও নির্গত করে। কঙ্গোর বিভিন্ন খনিতে রেডনের মাত্রা খুব বেশি। রেডনের কারণে ফুসফুসের ক্যানসার হতে পারে। কোবাল্ট পরিবেশগত প্রভাব ও মানবাধিকারের সংকট তৈরি করছে। এসব উদ্বেগের কারণে অ্যাপল, টেসলাসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কোবাল্টের ব্যবহার কমানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
বৈদ্যুতিক গাড়িনির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলা নিজেদের কাজে কোবাল্টের ব্যবহার ৬০ শতাংশের বেশি কমিয়ে এনেছে। এখন টেসলার নতুন গাড়ির মডেলে কোবাল্ট–মুক্ত ব্যাটারি ব্যবহার করা হচ্ছে। খনির ওপর নির্ভরতা কমাতে বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বিকল্প খুঁজছে। রেডউড ম্যাটেরিয়ালস নামের একটি প্রতিষ্ঠানে ব্যাটারিসহ বিভিন্ন ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। প্রতিষ্ঠানটি লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি সংগ্রহ করে সেখানে থাকা কোবাল্ট, লিথিয়াম, তামা, নিকেলসহ বিভিন্ন উপাদান নতুন ব্যাটারিতে ব্যবহার করছে।
সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক