গ্রহাণুর প্রতীকী ছবি
গ্রহাণুর প্রতীকী ছবি

পৃথিবী কি সত্যিই গ্রহাণুর আঘাতে বসবাসের উপযোগী হয়ে উঠেছে

মহাবিশ্বের অন্তহীন শূন্যতায় পৃথিবীতে কীভাবে প্রাণের স্পন্দন হয়েছিল, তা আজও এক পরম রহস্য। অনেক বিজ্ঞানীর ধারণা, আদিমকালে পৃথিবীর বুকে ধেয়ে আসা একের পর এক গ্রহাণুর আঘাতই হয়তো পৃথিবীকে বসবাসের উপযোগী করে তুলেছিল। দক্ষিণ কোরিয়ায় আবিষ্কৃত এক নতুন ভূতাত্ত্বিক নিদর্শন এখন বিজ্ঞানীদের সেই ধারণাকে আরও বেশি জোরালো করে তুলছে।

কোরিয়া ইনস্টিটিউট অব জিওসায়েন্স অ্যান্ড মিনারেল রিসোর্সেসের বিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, দক্ষিণ কোরিয়ায় গ্রহাণুর আঘাতে তৈরি একটি গর্তের নিচে স্ট্রোমাটোলাইট খুঁজে পাওয়া গেছে। স্ট্রোমাটোলাইট মূলত অণুজীবের স্তর স্তরে জমে তৈরি হওয়া একধরনের পাথুরে কাঠামো। এটি পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্বের প্রাচীনতম প্রমাণের একটি। প্রায় ৪২ হাজার বছর আগে একটি বিশাল গ্রহাণুর আঘাতে গর্তটি তৈরি হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিজ্ঞানীদের মতে, গ্রহাণুর আঘাতের ফলে তৈরি হওয়া প্রচণ্ড উত্তাপ সেখানে গরম পানির ঝরনার মতো একটি স্থায়ী পরিবেশ তৈরি করেছিল। এই উষ্ণ জলীয় পরিবেশেই প্রাচীন অণুজীবের দল বেঁচে থাকার অনুকূল আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিল। শতকোটি বছর আগে যখন পৃথিবীর ওপর অনবরত মহাজাগতিক পাথর আছড়ে পড়ছিল, তখন এ ধরনের গর্তগুলোই হয়তো আদি প্রাণের জন্য অসংখ্য সাময়িক নিরাপদ আশ্রয়স্থল তৈরি করেছিল।

পৃথিবীর বুকে জড় বস্তু থেকে কীভাবে প্রথম জীবন্ত কোষের সৃষ্টি হয়েছিল, সে ইতিহাস এখনো বেশ ধোঁয়াশায় ভরা। তবে এ রহস্যের একটি বড় সূত্র লুকিয়ে আছে স্ট্রোমাটোলাইটের মধ্যে। সায়ানোব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য অণুজীবের তৈরি করা এই খনিজ কাঠামো পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে খুঁজে পাওয়া গেছে। এগুলোর বয়স প্রায় ৩৫০ কোটি বছর। এটি আমাদের গ্রহে প্রাণের বিকাশের অন্যতম প্রাচীনতম নিদর্শন। তবে এই অণুজীবের সম্প্রদায়গুলো কীভাবে আবির্ভূত বা ছড়িয়ে পড়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।

বিজ্ঞানীদের মতে, প্রায় ২৪০ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে অক্সিজেনের মাত্রা খুব বেশি ছিল না। সায়ানোব্যাকটেরিয়ার মতো প্রথম দিককার সালোকসংশ্লেষণকারী জীবগুলোই বাতাসে অক্সিজেন ছড়াতে শুরু করেছিল। স্ট্রোমাটোলাইট তৈরি করা অণুজীবগুলোর বিপাকীয় প্রক্রিয়ার ফলেই হয়তো পৃথিবীতে প্রথম অক্সিজেনের উৎপাদন শুরু হয়েছিল। যদি তা সত্যি হয়, তবে প্রাচীনকালের সেই গ্রহাণুর আঘাতগুলো পৃথিবীর বুকে ছোট ছোট অক্সিজেনের পকেট বা অক্সিজেন মরূদ্যান তৈরি করেছিল।

কোরিয়া ইনস্টিটিউট অব জিওসায়েন্স অ্যান্ড মিনারেল রিসোর্সেসের বিজ্ঞানী জায়সু লিম জানিয়েছেন, গ্রহাণুর আঘাতে তৈরি উষ্ণ জলীয় হ্রদেও যে স্ট্রোমাটোলাইট গঠিত হতে পারে, এটিই তার প্রথম সুনির্দিষ্ট ও ব্যাপক প্রমাণ। এ ধরনের পরিবেশ হয়তো আদিম অণুজীবের ইকোসিস্টেম বা বাস্তুতন্ত্র গড়ে তোলার জন্য অত্যন্ত অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করে দিয়েছিল। সংগৃহীত তথ্য পৃথিবীর অক্সিজেন বিকাশে স্ট্রোমাটোলাইটের ভূমিকা ১০০ ভাগ প্রমাণ করে না। তবে এ আবিষ্কার নির্দেশ করে যে পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশ এমন কিছু বিরল উপাদান ও ঘটনার সংমিশ্রণে ঘটেছিল, যা মহাবিশ্বের অন্য কোথাও এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। পৃথিবীর অন্যান্য সুপরিচিত গ্রহাণুর গর্তগুলোও এখন নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে স্ট্রোমাটোলাইটে সমৃদ্ধ উষ্ণ হ্রদগুলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন বৃদ্ধিতে কতটা অবদান রেখেছিল, তা জানা যাবে।

সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট