
আফ্রিকা মহাদেশের ভূগর্ভে লুকিয়ে থাকা এক বিশাল টেকটোনিক সীমানা আবিষ্কার করেছেন বিজ্ঞানীরা। তানজানিয়া থেকে মোজাম্বিক পর্যন্ত বিস্তৃত এই প্রাচীন ভূতাত্ত্বিক চ্যুতিরেখাটির নাম দেওয়া হয়েছে রোভুমা ট্রান্সফর্ম মার্জিন। প্রায় ৩১০ মাইল দীর্ঘ এই ফাটল মহাদেশীয় ভূখণ্ড ও মহাসাগরের মধ্যবর্তী সীমানা হিসেবে কাজ করছে। বিজ্ঞানীদের মতে, ভবিষ্যতে এই ভূতাত্ত্বিক শক্তির প্রভাবে আফ্রিকা মহাদেশ শেষ পর্যন্ত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে। যার ফলে জন্ম নেবে নতুন মহাদেশ ও একটি নতুন মহাসাগর। নতুন এই আবিষ্কার মহাদেশগুলোর লাখ লাখ বছর ধরে স্থান পরিবর্তনের তত্ত্ব সম্পূর্ণ বদলে দেবে।
বিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, আফ্রিকা মহাদেশ ইতিমধ্যেই ইস্ট আফ্রিকান রিফট সিস্টেম নামের একটি বিশাল ফাটল বরাবর উত্তর–দক্ষিণে ভাঙতে শুরু করেছে। এর ফলে মহাদেশটি নুবিয়ান ও সোমালি নামের দুই টেকটোনিক প্লেটে বিভক্ত হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের ডার্বি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী জর্ডান ফিথিয়ান বলেন, নতুন আবিষ্কৃত রোভুমা ট্রান্সফর্ম মার্জিন এই প্লেটগুলোকে একে অপরের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে সাহায্য করছে। এই চ্যুতিরেখা অনেকটা রেললাইনের মতো কাজ করে, যা ভবিষ্যতে টেকটোনিক প্লেটগুলো কোন দিকে অগ্রসর হবে, তা নিয়ন্ত্রণ করে। এই চ্যুতিরেখার কারণে প্লেটগুলোর ঘূর্ণন সহজ হয়ে যায় এবং মহাদেশীয় বাধা কমে আসে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান আন্দ্রিয়াস চ্যুতির মতো আফ্রিকার চ্যুতিটি বর্তমানে সক্রিয় নয়, আর তাই চ্যুতিটিকে ফসিল ফল্ট বা জীবাশ্ম চ্যুতি বলা হচ্ছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, জুরাসিক আমলে যখন পৃথিবীর বিশাল সুপারকন্টিনেন্ট গন্ডোয়ানা ভেঙে আলাদা হয়ে যাচ্ছিল, তখনই চ্যুতিরেখা তৈরি হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রোভুমা নদী থেকে আসা পলিমাটি এই ফাটলকে ঢেকে ফেলেছে। ফলে এটি কয়েক কোটি বছর ধরে লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিল। ১৯৮০ দশক থেকে বিজ্ঞানীরা পূর্ব আফ্রিকার উপকূলে এমন কোনো লুকানো চ্যুতিরেখা থাকার সম্ভাবনা নিয়ে বিতর্ক করে আসছিলেন। অবশেষে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে এই বিতর্কের অবসান ঘটল।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, প্রায় ১০ কোটি বছর আগে মাদাগাস্কার দ্বীপ যখন তানজানিয়া উপকূলীয় বেসিন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দূরে সরে যায়, তখন এই রোভুমা ট্রান্সফর্ম মার্জিন চ্যুতিরেখাই প্রধান ভূমিকা রেখেছিল। এ বিষয়ে বিজ্ঞানী ফিথিয়ান জানান, আগামী কয়েক লাখ বছর পর এই ফসিল চ্যুতিরেখাটি আবারও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। টেকটোনিক চাপের পরিবর্তনের ফলে এটি নুবিয়ান ও সোমালি প্লেটের বিচ্ছিন্ন হওয়াকে ত্বরান্বিত করবে।
বিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, স্যাটেলাইট থেকে সংগৃহীত মহাকর্ষীয় পরিমাপ ও সেসমিক রিফ্লেকশন নামের একটি বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করে ভূপৃষ্ঠের গভীরের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এই পদ্ধতিতে ভূগর্ভে শব্দ তরঙ্গ পাঠিয়ে ভূত্বকের গঠন বিশ্লেষণ করা হয়। বিষয়টিকে পৃথিবীর বিশাল আলট্রাসাউন্ড স্ক্যানের সঙ্গে তুলনা করেছেন বিজ্ঞানী ফিথিয়ান।
সূত্র: ডেইলি মেইল