বিশ্বজুড়ে হিমবাহ বা গ্লেসিয়ার দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। নতুন এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, আগামী কয়েক দশকে এই বিলুপ্তির গতি আরও তীব্র হবে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, হিমবাহ কেবল একই গতিতে গলছে না, বরং চলতি শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এসে এদের হারিয়ে যাওয়ার হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। সুইজারল্যান্ডের ইটিএইচ জুরিখ ও ভ্রিজ ইউনিভার্সিটি ব্রাসেলসে গবেষকদের এই যৌথ গবেষণা সম্প্রতি নেচার ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকেরা বিশ্বের দুই লাখের বেশি হিমবাহের স্যাটেলাইট চিত্র ও বিভিন্ন জলবায়ু মডেল বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।
গবেষকেরা এই বিশেষ সময়কালকে পিক গ্লেসিয়ার এক্সটিংশন বা হিমবাহ বিলুপ্তির শীর্ষ সময় হিসেবে অভিহিত করেছেন। বর্তমানে প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে প্রায় এক হাজারটি হিমবাহ বিলুপ্ত হচ্ছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, যদি বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবু ২০৪১ সাল নাগাদ প্রতিবছর প্রায় দুই হাজারটি হিমবাহ চিরতরে হারিয়ে যাবে।
তাপমাত্রা বৃদ্ধি যদি ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, তবে ২০৫০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে প্রতিবছর চার হাজারের বেশি হিমবাহ অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। গবেষণার প্রধান লেখক ও হিমবাহ বিশেষজ্ঞ ল্যান্ডার ভ্যান ট্রিচ বলেন, ‘আমাদের এই ফলাফল জলবায়ু নীতিতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার গুরুত্বকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। এই শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের পর হিমবাহ বিলুপ্তির বার্ষিক সংখ্যা আবার কমতে শুরু করবে। তবে এর অর্থ এই নয় যে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। তত দিনে বিশ্বের বেশির ভাগ ছোট হিমবাহগুলো সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যাবে। ফলে বিলুপ্ত হওয়ার মতো হিমবাহের সংখ্যাই কমে আসবে। আল্পস পর্বতমালা অঞ্চলে ২১০০ সাল নাগাদ হিমবাহ বিলুপ্তির হার প্রায় শূন্যে নেমে আসবে। তখন সেখানে প্রায় কোনো হিমবাহই অবশিষ্ট থাকবে না। বিলুপ্ত হতে যাওয়া হিমবাহগুলোর বেশির ভাগই আকারে ছোট। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে এদের অবদান বড় বড় বরফখণ্ডের তুলনায় কম হলেও স্থানীয় পর্যায়ে এর প্রভাব হবে ভয়াবহ।’
বিজ্ঞানী ভ্যান ট্রিচ ব্যাখ্যা করে বলেন, প্রতিটি একক হিমবাহের হারিয়ে যাওয়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর বিশাল প্রভাব ফেলে। অনেক পাহাড়ি এলাকা শুষ্ক মৌসুমে পানির জন্য হিমবাহের গলিত পানির ওপর নির্ভর করে। এ ছাড়া পর্যটন এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গেও এই হিমবাহগুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ২০১৯ সালে সুইজারল্যান্ডের পিজল হিমবাহের বিলুপ্তির পর স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতীকীভাবে তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করেছিল। ম্যাথিয়াস হুস বলেন, ‘হিমবাহের এই ক্ষতি কেবল বৈজ্ঞানিক উদ্বেগের বিষয় নয়, তা সরাসরি আমাদের হৃদয়কে স্পর্শ করে। অনেক হিমবাহ বিলুপ্ত হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র; তবে সব হিমবাহের ভবিষ্যৎ এখনো অন্ধকার নয়। পৃথিবী কতটা উত্তপ্ত হবে, তার ওপর নির্ভর করবে ঠিক কত হিমবাহ শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে। গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমিয়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে হাজার হাজার হিমবাহকে রক্ষা করা সম্ভব।’
সূত্র: আর্থ ডট কম