২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচের সময় প্রায় ঘনিয়ে আসছে। ফাইনালে প্রিয় দলের ম্যাচ মানেই দর্শকদের হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, টান টান উত্তেজনা আর মানসিক চাপের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। কিন্তু আপনি কি জানেন, প্রিয় দলের একটি ফাইনাল ম্যাচ দেখা আপনার শরীরের ওপর ঠিক কতটা প্রভাব ফেলে? সাম্প্রতিক একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, ফুটবলের হাই-ভোল্টেজ ম্যাচ দেখার সময় আমাদের শরীর এক চরম পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যায়।
জার্মানির বিলেফেল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের পরিচালিত এই গবেষণায় উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ দিনের তুলনায় ফুটবল ফাইনাল দেখার সময় একজন ভক্তের শারীরিক মানসিক চাপের মাত্রা প্রায় ৪১ শতাংশ বেড়ে যায়। শুধু তা–ই নয়, হৃৎস্পন্দনও স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি বৃদ্ধি পায়। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক অবস্থায় একজন মানুষের হৃৎস্পন্দন যেখানে প্রতি মিনিটে গড়ে ৭০ দশমিক ৯ বার থাকে, ফাইনাল ম্যাচের উত্তেজনায় তা বেড়ে ৭৮ দশমিক ৭ বার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
গবেষকেরা জার্মানির আরমিনিয়া বিলেফেল্ড ক্লাবের ২২৯ জন ফুটবল ভক্তের ওপর তিন মাস ধরে এই পর্যবেক্ষণ চালান। অংশগ্রহণকারীদের স্মার্টওয়াচ পরিয়ে তাঁদের হৃৎস্পন্দন এবং মানসিক চাপের সূচক ধারাবাহিকভাবে রেকর্ড করা হয়। এতে দেখা যায়, ম্যাচের শুরুর অনেক আগে থেকেই ভক্তদের মধ্যে মানসিক চাপের প্রভাব শুরু হয়ে যায়। সকাল থেকেই এই চাপ বাড়তে থাকে এবং খেলা শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে তা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। এমনকি ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পরও ভক্তদের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চমাত্রার চাপের লক্ষণ দেখা গেছে।
ম্যাচটি আপনি কোথায় দেখছেন, তার ওপরও শারীরিক প্রভাবের ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, যাঁরা সরাসরি স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখছেন, তাঁদের হৃৎস্পন্দনের গড় গতি ছিল প্রতি মিনিটে ৯৪ দশমিক ২ বার। অন্যদিকে টেলিভিশনের সামনে বসা ভক্তদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল গড়ে প্রতি মিনিটে ৭৯ দশমিক ৪ বার। বিশেষ করে প্রিয় দল গোল করলে স্টেডিয়ামে উপস্থিত দর্শকদের হৃৎস্পন্দন প্রতি মিনিটে ১০৮ বার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে, যা সাধারণ কোনো পরিস্থিতিতে কল্পনাও করা যায় না।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ম্যাচের সময় অ্যালকোহল সেবন এই উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। যাঁরা খেলা দেখার সময় মদ্যপান করেছেন, অন্যদের তুলনায় তাঁদের হৃৎস্পন্দন প্রায় ৫ শতাংশ বেশি ছিল। আর প্রিয় দল গোল করার পর তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২ শতাংশে। যদিও গবেষকেরা সরাসরি কোনো চিকিৎসাঝুঁকি মূল্যায়নের চেষ্টা করেননি, তবে তাঁরা সতর্ক করেছেন যে আবেগপ্রবণ অবস্থায় অ্যালকোহল গ্রহণ কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেমে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
ম্যাচের প্রথম কয়েক মিনিট যখন ফলাফল অনিশ্চিত থাকে, তখন হৃৎস্পন্দন সবচেয়ে বেশি থাকে। আবার খেলাটি একরকম নিশ্চিত হয়ে গেলে হৃৎস্পন্দন কিছুটা কমে আসে। তবে গবেষণার আরেকটি কৌতূহলপূর্ণ বিষয় হলো, খেলার একেবারে শেষ মিনিটে গোল হলে ভক্তদের হৃৎস্পন্দন আবার তুঙ্গে ওঠে, যদিও তখন দলের জেতার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য থাকে। গবেষকদের মতে, শরীর কেবল জয়-পরাজয়ের ওপরই প্রতিক্রিয়া দেখায় না, শরীরের আশা, গর্ব এবং দলের প্রতি তীব্র আবেগের ওপরও সাড়া দেয়।
ফুটবল ম্যাচের এই শারীরিক প্রভাব নতুন কিছু নয়। ২০০৬ সালের বিশ্বকাপ চলাকালে নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, জার্মানির ম্যাচ চলাকালে হৃদ্রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কার্ডিওভাসকুলার ঝুঁকির আশঙ্কা প্রায় তিন গুণ বেড়ে যায়। পরবর্তী বিভিন্ন গবেষণাতেও দেখা গেছে, ম্যাচের সময় কর্টিসল হরমোনের মতো স্ট্রেস হরমোন নিঃসরণ বেড়ে যায়। যাঁরা তাঁদের প্রিয় দলের সঙ্গে মানসিকভাবে বেশি একাত্ম বোধ করেন, তাঁদের শরীরে এই শারীরিক প্রতিক্রিয়া সবচেয়ে তীব্র হয়।
তাই এবারের বিশ্বকাপের ফাইনাল দেখার আগে শুধু প্রিয় দলের জয় কামনা করলেই হবে না, নিজের শরীরের যত্ন নেওয়ার বিষয়েও সচেতন থাকা জরুরি। উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে শরীরকে শান্ত রাখতে প্রয়োজনে গভীর শ্বাস নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, ফুটবলের আনন্দ যেন কোনোভাবেই আপনার স্বাস্থ্যের ঝুঁকি না হয়ে দাঁড়ায়।
সূত্র: ওয়্যার্ড