
পৃথিবীর জলবায়ু এখন ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ভারসাম্যহীন অবস্থায় রয়েছে বলে সতর্কতা জারি করেছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা। জাতিসংঘের আবহাওয়াবিষয়ক বিশেষায়িত সংস্থাটি জানিয়েছে, আমাদের গ্রহ যে পরিমাণ তাপ বিকিরণ করে ছেড়ে দেয়, তার চেয়ে অনেক বেশি তাপ গ্রহণ করছে। এর মূলে রয়েছে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মতো গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্রাতিরিক্ত নিঃসরণ। এই রেকর্ড পরিমাণ শক্তির ভারসাম্যহীনতা গত বছর সাগরের তাপমাত্রা এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে এবং মেরু অঞ্চলের বরফ গলন ত্বরান্বিত করেছে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, চলতি বছরের শেষের দিকে প্রাকৃতিক উষ্ণায়ন প্রক্রিয়া এল নিনো শুরু হতে পারে, যা তাপমাত্রার সব রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে। এত স্বাভাবিক গরমের চেয়ে বেশি উষ্ণতা অনুভব করব আমরা।
এই পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস দেশগুলোকে জীবাশ্ম জ্বালানি ত্যাগ করে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে যাওয়ার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি জানান, পৃথিবীকে তার সীমার বাইরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। জলবায়ুর প্রতিটি সূচক এখন লাল সংকেত দিচ্ছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার তথ্যমতে, ১৮৫০ সাল থেকে শুরু হওয়া রেকর্ডের মধ্যে গত ১১ বছর ছিল পৃথিবীর উষ্ণতম ১১টি বছর। ২০২৫ সালে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা প্রাক্-শিল্পায়ন যুগের চেয়ে ১ দশমিক ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। যদিও লা নিনা নামক প্রাকৃতিক শীতলীকরণ প্রক্রিয়ার কারণে ২০২৫ সাল ২০২৪ সালের চেয়ে সামান্য কম গরম ছিল, তবুও এটি ইতিহাসের তিনটি উষ্ণতম বছরের একটি।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা গত ২০ লাখ বছরের মধ্যে বর্তমানে সর্বোচ্চ। এই গ্যাসগুলোর আটকে রাখা অতিরিক্ত শক্তির ৯০ শতাংশের বেশি জমা হচ্ছে সমুদ্রে। এর ফলে সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সামুদ্রিক ঝড়ের তীব্রতা বাড়ছে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মহাসচিব অধ্যাপক সেলেস্তে সাউলো বলেন, ‘মানুষের কর্মকাণ্ড প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে ক্রমবর্ধমান হারে বিঘ্নিত করছে। এর পরিণাম আমাদের শত শত, এমনকি হাজার হাজার বছর ধরে ভোগ করতে হবে। উষ্ণায়নের প্রভাবে বর্তমান সময়েই চরম আবহাওয়ার তীব্রতা বাড়ছে এবং ডেঙ্গুর মতো রোগের বিস্তার সহজতর হচ্ছে।’ দক্ষিণ-পশ্চিম যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে রেকর্ড পরিমাণে আগাম তাপপ্রবাহ চলছে, যেখানে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১০ থেকে ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের তৈরি জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়া এই তীব্রতা হওয়া কার্যত অসম্ভব।
গবেষকেরা এখন প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে কড়া নজর রাখছেন। দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস বলছে, ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধে একটি শক্তিশালী এল নিনো পর্যায় তৈরি হতে পারে। মানুষের তৈরি উষ্ণায়ন ধারার সঙ্গে এল নিনোর প্রভাব যুক্ত হলে ২০২৭ সাল নাগাদ তাপমাত্রা নতুন কোনো উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। এ বিষয়ে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার বিজ্ঞানী জন কেনেডি বলেন, ‘যদি আমরা এল নিনোর দিকে ধাবিত হই, তবে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা আবারও বাড়বে এবং সম্ভাব্য নতুন সব রেকর্ড তৈরি হবে।’
সূত্র: বিবিসি