সমুদ্রের তলদেশে থাকা পাহাড়
সমুদ্রের তলদেশে থাকা পাহাড়

সমুদ্রের তলদেশে থাকা পাহাড়ের চারপাশের পরিবেশ কেমন হয়

সমুদ্রের নীল জলরাশির নিচেও রয়েছে পাহাড়। তবে সেই সব পাহাড়ের চূড়ায় বরফ জমে থাকে না। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে হাজার হাজার ফুট নিচে অবস্থিত এসব পাহাড়কে বলা হয় সি-মাউন্ট। বিজ্ঞানীদের ধারণা, বিশ্বজুড়ে এমন ১ লাখেরও বেশি পাহাড় থাকলেও এখন পর্যন্ত মাত্র শূন্য দশমিক এক শতাংশেরও কম মানুষের নজরে এসেছে। উত্তর আটলান্টিকের হিমশীতল পানি থেকে শুরু করে ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরের অতলান্ত গভীর পর্যন্ত এই সব সি-মাউন্ট ছড়িয়ে আছে। সম্প্রতি বিবিসির এক প্রতিবেদনে এই রহস্যময় জগৎকে হাঙরদের স্বর্গরাজ্য হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

সি-মাউন্ট সমুদ্রের গভীর থেকে খাড়াভাবে ওপরের দিকে উঠে আসে। যখন সমুদ্রের ঢেউ বা স্রোত এই ঢালগুলোয় আঘাত করে, তখন তা এক বিশাল চামচের মতো কাজ করে। এর ফলে সমুদ্রের নিচের স্তরের পুষ্টিগুণে পূর্ণ ঠান্ডা পানি ওপরে উঠে আসে। এই পুষ্টির আকর্ষণে সেখানে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্লাঙ্কটন জন্মায়, যা খেতে আসে ছোট ছোট মাছ। আর সেই মাছ শিকার করতে ভিড় জমায় হাঙরসহ বড় বড় শিকারি প্রাণীরা।

বিজ্ঞানী স্যাম ওয়েবার দীর্ঘদিন দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত অ্যাসেনশন আইল্যান্ডের চারপাশের আগ্নেয়গিরি নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি জানান, এখানকার সাউদার্ন সি-মাউন্ট এলাকায় খোলা সমুদ্রের তুলনায় প্রায় ৪১ গুণ বেশি হাঙর দেখা যায়। এটি সমুদ্রের নিচে এক ছোট গ্রামের মতো। কেন হাঙররা এখানে জড়ো হয়, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের দুটি প্রধান তত্ত্ব রয়েছে। একটি হলো মরুদ্যান তত্ত্ব, যেখানে পাহাড় নিজেই প্রাণের উৎস হিসেবে কাজ করে। অন্যটি হলো হাব তত্ত্ব, যেখানে হাঙররা অন্য জায়গায় খাবার খেয়ে এখানে বিশ্রাম নিতে বা আড্ডা দিতে ফিরে আসে। দুটি তত্ত্বই সঠিক হতে পারে। একটি সিল্কি শার্কের গায়ে ট্যাগ লাগিয়ে দেখা গেছে, সে রাতে শিকার করতে ১০০ কিমি দূরে চলে যায় এবং সকালে ঠিকই পাহাড়ে ফিরে আসে। একে সার্ভিস স্টেশন হিসেবে দেখা যায়। হাঙররা কখনোই সাঁতার বন্ধ করতে পারে না। কিন্তু পাহাড়ের ঢালে যে ঊর্ধ্বমুখী স্রোত থাকে, তাতে গা ভাসিয়ে দিয়ে তারা শক্তি সঞ্চয় করতে পারে।

সমুদ্রের তলদেশে থাকা পাহাড় কেবল হাঙর নয়, বরং প্রবাল, তিমি, কচ্ছপ এবং টিউনা মাছের মতো হাজারো প্রজাতির আশ্রয়স্থল। তবে এই বাস্তুসংস্থান অত্যন্ত সংবেদনশীল। গভীর সমুদ্রে যারা মাছ ধরে, তারা মাত্র কয়েক ঘণ্টায় শত বছরের পুরোনো প্রবাল প্রাচীর ধ্বংস করে দিতে পারে। একবার ধ্বংস হলে এই এলাকা আবার আগের অবস্থায় ফিরতে কয়েক দশক সময় নেয়, অনেক ক্ষেত্রে তা আর কখনোই ফেরে না।

বর্তমানে পাহাড়গুলো রক্ষার দাবি জোরালো হচ্ছে। পর্তুগাল ইতিমধ্যেই গোরিঞ্জ পাহাড়ের চারপাশে সংরক্ষিত এলাকা তৈরি করেছে। জাতিসংঘ ২০২৬ সালের মধ্যে সি-মাউন্টে বাণিজ্যিকভাবে মাছ ধরা পুরোপুরি বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া