স্ক্লেরোটিয়াম স্টিপিট্যাটাম নামের বিরল ভূগর্ভস্থ ছত্রাক
স্ক্লেরোটিয়াম স্টিপিট্যাটাম নামের বিরল ভূগর্ভস্থ ছত্রাক

ভারতে সন্ধান পাওয়া বিরল ছত্রাক নিয়ে কৌতূহল

ভারতের কেরলের পালক্কাদ জেলায় মাটির নিচে মাশরুমসদৃশ অদ্ভুত কাঠামোর সন্ধান পাওয়া গেছে, যা বর্তমানে বিজ্ঞানী, জীববৈচিত্র্য গবেষক ও ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসায় আগ্রহীদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে। জেলার কারাকুরুসি গ্রামে চাষাবাদের জন্য মাটি খোঁড়ার সময় এক কৃষক মাটির নিচে মাশরুমসদৃশ অস্বাভাবিক কাঠামোগুলো খুঁজে পান। প্রাথমিকভাবে এগুলোকে খুব সাধারণ মনে হলেও, গবেষকেরা এগুলোকে স্ক্লেরোটিয়াম স্টিপিট্যাটাম নামের বিরল ভূগর্ভস্থ ছত্রাক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। স্থানীয় ভাষায় এটি নিলামাঙা বা আর্থ ম্যাঙ্গো নামে পরিচিত।

আর্থ ম্যাঙ্গো নামটি শুনলে মনে হতে পারে মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা কোনো হারানো ফল। কিন্তু বাস্তবে এটি একটি বিরল ছত্রাক যা মাটির পৃষ্ঠের নিচে গোপনে বৃদ্ধি পায়, বিশেষ করে উঁইপোকার ঢিবি বা উঁইপোকা সমৃদ্ধ এলাকায়। গবেষকদের মতে, ভারতে ভূগর্ভস্থ ছত্রাক নিয়ে খুব কম গবেষণা হওয়ায় এ ধরনের আবিষ্কার এখন বেশ বিরল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাধারণ মাশরুম মাটির ওপরে দৃশ্যমান হলেও, এই ছত্রাক মাটির নিচেই বিকশিত হয়। আর তাই ছত্রাকটি শনাক্ত করার পাশাপাশি প্রাকৃতিক অবস্থায় গবেষণা করা কঠিন। কেরলের বিভিন্ন অংশে ছত্রাকটি নিলামাঙা এবং চিতলকিঝাঙ্গু নামে পরিচিত। তবে এর আকৃতি ও মাটির নিচের অবস্থানের কারণেই একে মাটির আম বলা হয়। প্রকৃত আমের সঙ্গে এর কোনো উদ্ভিদতাত্ত্বিক সম্পর্ক নেই।

স্থানীয় লোকজ বা ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসায় ছত্রাকটির ওষুধি গুণের কথা প্রচলিত থাকায় এটি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। ওই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের বিশ্বাস, এটি কাশি, সর্দি, পেটের সমস্যা, জন্ডিস, কানের ব্যথা ও শরীরের ব্যথার প্রতিকার হিসেবে কাজ করে। তবে গবেষকেরা এই দাবিগুলোর বিষয়ে সতর্ক করেছেন। বর্তমানে এই ছত্রাক কোনো নির্দিষ্ট রোগ নিরাময় করতে পারে এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ অত্যন্ত সীমিত। তবু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছত্রাক অনেক সময় এমন জৈব-সক্রিয় উপাদান ধারণ করে, যা ওষুধশিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পেনিসিলিনের মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিক মূলত ছত্রাক গবেষণা থেকেই এসেছে। সেই সম্ভাবনা থেকেই স্ক্লেরোটিয়াম স্টিপিট্যাটামের মতো বিরল প্রজাতি নিয়ে বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

গবেষকদের মতে, এই ছত্রাকের সঙ্গে উঁইপোকাসমৃদ্ধ মাটির একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এটি এমন এলাকায় জন্মে যেখানে উঁইপোকার সক্রিয়তা বেশি। আর তাই ধারণা করা হচ্ছে, উঁইপোকা সম্ভবত ছত্রাক বৃদ্ধির জন্য উপযোগী মাটির পরিবেশ তৈরি করে অথবা ছত্রাকটি উঁইপোকার কলোনিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ভূগর্ভস্থ বাস্তুসংস্থানের ওপর কোনোভাবে নির্ভরশীল। এ ছাড়া কেরলের বর্ষা ও পরবর্তী সময়ে মাটির আর্দ্রতা এই ছত্রাকের বিকাশে বড় ভূমিকা পালন করে। প্রতিবছর পরিবেশগত অবস্থার পরিবর্তনের কারণে এই ছত্রাকের উপস্থিতি আগে থেকে অনুমান করা বা কৃত্রিমভাবে চাষ করা অত্যন্ত দুরূহ।

গবেষকদের আশঙ্কা, জমি ব্যবহারের ধরন পরিবর্তন, রাসায়নিক চাষ ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে অনেক বিরল ছত্রাক প্রজাতি নীরবেই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। যেহেতু ভূগর্ভস্থ ছত্রাক পর্যবেক্ষণ করা কঠিন, তাই বিজ্ঞানীদের পক্ষে এদের বিলুপ্তি শনাক্ত করাও দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া