নেট–কাস্টিং মাকড়সা
নেট–কাস্টিং মাকড়সা

মাকড়সার জালে অনন্য কৌশলের সন্ধান

অস্ট্রেলিয়ার এক বিশেষ প্রজাতির নেট-কাস্টিং মাকড়সা এমন এক শিকারি জাল তৈরি করে, যা সাধারণ মাকড়সার রেশমের চেয়ে অনেক বেশি প্রসারিত হতে পারে এবং ছিঁড়ে না গিয়ে আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে। এই অনন্য স্থিতিস্থাপকতার কারণে মাকড়সাটি তার হাতের তৈরি জাল শিকারের দিকে ছুড়ে দিতে পারে এবং শিকারকে আটকে ফেলার পরও জালটি অক্ষত থাকে।

জার্মানির গ্রাইফসোয়াল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জোনাস ও উলফ এই মাকড়সার জালের অস্বাভাবিক প্রসারণ এবং পুনরুদ্ধারের ক্ষমতার পেছনে জালের এক বিশেষ নকশাকে দায়ী করেছেন। এই জালের কেন্দ্রীয় সুতাগুলো আক্রমণের সময় প্রায় ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত লম্বা হতে পারে এবং আবার আগের আকার ধারণ করতে পারে। ইলেক্ট্রনিক মাইক্রোস্কোপের নিচে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এই রেশমের একটি নরম কেন্দ্র বা কোর রয়েছে, যা লুপ বা কুণ্ডলী পাকানো তন্তু দিয়ে মোড়ানো। জালটি যখন প্রসারিত হয়, তখন এই লুপগুলো প্রথমে সোজা হয়ে যায়। ফলে সুতাটি শুরুতে নরম থাকে এবং পরে টান বাড়লে তা শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

বিজ্ঞানী জোনাস উলফ বলেন, আমরা দেখেছি শিকার ধরার এই রেশমে উলের মতো একটি বাঁকানো কাঠামো রয়েছে, যা মাকড়সাটিকে দ্রুত জাল ছুড়তে সাহায্য করে। এই কৌশলের কারণে জালটি দ্রুত খোলা সম্ভব হয় এবং এটি কোনো দুর্বল বা ঝুলে পড়া ফাঁদে পরিণত হয় না। জাল তৈরির সময় মাকড়সাটি কেবল রেশম বিছিয়ে দেয় না; বরং তার পেছনের পা দিয়ে সুতাগুলোকে বারবার টানে এবং পুনরায় গুছিয়ে রাখে। প্রতিটি ধাপে সে পেটের কাছে থাকা থলি বা স্পিনারেট থেকে সুতা বের করার সময় অতিরিক্ত তন্তুগুলোকে লুপ বা কুণ্ডলীতে ভাঁজ করে। এই বিশেষ কৌশলের কারণে জালের কিছু অংশ অন্য অংশের তুলনায় অনেক বেশি স্থিতিস্থাপক হয়ে ওঠে। আসলে মাকড়সাটির জাল তৈরির কৌশলের ওপরই জালের আচরণ অনেকটা নির্ভর করে।

শিকারি জালের সব সুতা একধরনের কাজ করে না। জালের ওপরের এবং ফ্রেমের সুতাগুলো বেশ শক্ত থাকে; কিন্তু নিচের দিকের সুতাগুলো হয় অনেক নরম। কারণ, এই অংশগুলোই সবচেয়ে বেশি প্রসারিত হয়। আক্রমণের সময় জালের কেন্দ্রীয় অংশ মাত্র ৭০ থেকে ১২৬ মিলিসেকেন্ডের মধ্যে ৮ থেকে ২৪ গুণ প্রসারিত হতে পারে। এই সুশৃঙ্খল প্রসারণব্যবস্থার কারণে অসম টানের ফলেও জালটি ছিঁড়ে যায় না। প্রকৌশলীরা দীর্ঘদিন ধরে এমন একধরনের তন্তু বা ফাইবার তৈরির চেষ্টা করছেন, যা শুরুতে সহজে বাঁকানো যাবে; কিন্তু চাপ বাড়লে তা ছিঁড়ে যাবে না। মাকড়সা তার জালের এই কাঠামোর মাধ্যমে সেই লক্ষ্য অর্জন করেছে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই নকশা অনুসরণ করে ভবিষ্যতে সার্জিক্যাল সুচার, কৃত্রিম লিগামেন্ট, শক-অ্যাবজরবিং টেক্সটাইল এবং হালকা ও টেকসই যন্ত্রাংশ তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।

নেট-কাস্টিং মাকড়সা অন্য সাধারণ মাকড়সার মতো স্থির ফাঁদ পেতে বসে থাকে না; বরং জালটিকে সামনের পায়ে ধরে রাখে। রাতে তাদের বড় চোখের সাহায্যে শিকারের দূরত্ব মেপে নিয়ে জাল ছুড়ে দেয়। টিকে থাকার এই লড়াইয়ের কারণেই সম্ভবত বিবর্তনের ধারায় তাদের জালে এমন অনন্য বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়েছে। ২০২৫ সালে রয়্যাল সোসাইটি পাবলিশিং ফটোগ্রাফি কম্পিটিশনে এই বিশেষ জালের একটি ছবি বিজয়ী হয়, যা বিজ্ঞানীদের বাইরেও সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

সূত্র: আর্থ