আতশবাজির পেছনে আছে বিজ্ঞান
আতশবাজির পেছনে আছে বিজ্ঞান

কীভাবে তৈরি হয় নানা রঙের আতশবাজি

উৎসব-পার্বণে বা আনন্দঘন মুহূর্তে আকাশে যখন নানা রঙের আতশবাজি ফোটে, তখন কার না চোখ জুড়িয়ে যায়! কখনো লাল, কখনো সবুজ, আবার কখনো নীল আলোর রোশনাই পুরো আকাশ আলোকিত করে তোলে। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, এই চোখধাঁধানো রঙিন আলো আসলে কোথা থেকে আসে? এর পেছনে রয়েছে চমৎকার এক বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব।

অনেক রঙের আতশবাজির রহস্যের উত্তর লুকিয়ে আছে পরমাণুর গঠনে। একটি পরমাণু মূলত ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন নিয়ে গঠিত। প্রোটন ও নিউট্রন থাকে নিউক্লিয়াসের ভেতর, আর ইলেকট্রনগুলো অবস্থান করে নিউক্লিয়াসের বাইরে নির্দিষ্ট শক্তির স্তরে। কোনো পরমাণুতে যখন প্রচুর পরিমাণ শক্তি প্রয়োগ করা হয়, তখন এর ইলেকট্রনগুলো সেই শক্তি শোষণ করে উচ্চ শক্তির স্তরে উন্নীত হয়। এর সামান্য পরেই ইলেকট্রনটি আবার তার পূর্বের নিম্ন শক্তির স্তরে ফিরে আসে এবং অতিরিক্ত শক্তি আলো বা আলোকশক্তি হিসেবে নির্গত করে। আর এখানেই লুকিয়ে আছে রঙিন আতশবাজির মূল রহস্য! আতশবাজির বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট তীব্র তাপই রহস্যের বড় কারণ।

আতশবাজির বিস্ফোরণের পরে তৈরি আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য বা রং নির্ভর করে ইলেকট্রনের দুটি শক্তির স্তরের শক্তির পার্থক্যের ওপর। মানুষের চোখ যে দৃশ্যমান আলো দেখতে পায়, তার তরঙ্গদৈর্ঘ্য ৩৫০ থেকে ৭৫০ ন্যানোমিটারের মধ্যে হয়ে থাকে। নানা রঙের দৃশ্যমান বর্ণালিতে তরঙ্গদৈর্ঘ্য লাল থেকে শুরু হয়ে বেগুনিতে গিয়ে শেষ হয়।

যেহেতু ইলেকট্রনের নির্দিষ্ট শক্তির স্তরে থাকে, তাই দুই স্তরের মধ্যে এই রূপান্তর একটি নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো তৈরি করে। যদি শক্তির পার্থক্য ২.০৩ ইলেকট্রন ভোল্ট হয়, তবে তা কমলা আলো (৬১০ ন্যানোমিটার) নির্গত করবে। তরঙ্গদৈর্ঘ্য এবং শক্তির পরিমাণ একে অপরের ব্যস্তানুপাতিক; তাই উচ্চ শক্তির (২.৩৩ ইলেকট্রন ভোল্ট) রূপান্তরে কম তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ৫৩২ ন্যানোমিটার বা সবুজ আলো উৎপন্ন হয়।

প্রতিটি মৌলের নিজস্ব ইলেকট্রন সংখ্যা এবং বিন্যাস অনন্য। এর অর্থ হলো সব মৌলের ইলেকট্রনিক রূপান্তরের শক্তি এক হয় না। প্রতিটি মৌলের নিজস্ব একটি স্পেকট্রাল ফুটপ্রিন্ট বা বর্ণালির ছাপ থাকে। ল্যাবরেটরিতে অজানা মৌলের উপাদান শনাক্ত করতে এই পদ্ধতি বহুল ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা মঙ্গল গ্রহের পাথরের উপাদান নির্ধারণেও এই স্পেকট্রাল ফুটপ্রিন্ট ব্যবহার করছেন।

বিজ্ঞানীরা ইলেকট্রন উত্তেজনার নীতিকে কাজে লাগিয়ে এমন সব উপাদান বা লবণ ডিজাইন করেছেন, যা নির্দিষ্ট রঙের আলো নির্গত করতে পারে। আতশবাজি বা নিয়ন সাইনে মূলত নির্দিষ্ট কিছু ধাতব লবণের সংমিশ্রণ ব্যবহার করা হয়। স্ট্রনশিয়াম লবণ বা লিথিয়াম লবণের কারণে লাল, ক্যালসিয়াম লবণের কারণে কমলা, সোডিয়াম লবণের কারণে হলুদ, বেরিয়াম লবণের কারণে সবুজ, কপার বা তামার লবণের কারণে নীল রঙের দেখা মেলে।

উৎসবের আমেজে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর পাশাপাশি বিজ্ঞানের এই চমৎকার রসায়ন সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যাক। সবাইকে ছুটির দিনগুলোর আনন্দময় ও নিরাপদ উদ্‌যাপনের শুভেচ্ছা!

সূত্র: ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি ব্লুমিংটন, যুক্তরাষ্ট্র