বিজ্ঞানের জয়যাত্রায় এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন কোটি কোটি পরমাণুর ভিড়ে মাত্র একটি পরমাণুর সন্ধান পাওয়াও এক বিশাল বিজয় হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। ১০৯ নম্বর মৌল মাইটনেরিয়াম আবিষ্কারের গল্পটি ঠিক তেমনই। এটি এমন একটি মৌল, যা প্রকৃতিতে পাওয়া যায় না। এর কোনো জৈবিক ভূমিকা নেই। বলা যায়, চোখের পলক ফেলার আগেই বিলীন হয়ে যায়। তবু নিউক্লীয় পদার্থবিজ্ঞানের সীমানা বুঝতে এ মৌলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মাইটনেরিয়াম একটি কৃত্রিমভাবে উৎপাদিত মৌল। এটি পর্যায় সারণির ট্রান্সইউরেনিয়াম বা অতিভারী মৌলগুলোর অন্তর্ভুক্ত। অতীতে এটি আননিলেনিয়াম বা মৌল ১০৯ নামেও পরিচিত ছিল। এই মৌলটির নামকরণ হয়েছে অস্ট্রিয়ায় জন্মগ্রহণকারী প্রখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী লিজ মাইটনারের সম্মানে। পারমাণবিক বিভাজন বা ফিশন প্রক্রিয়ার তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এই অতিভারী মৌলটির নাম তাঁর নামে রাখা হয়।
মাইটনেরিয়ামের সফল সংশ্লেষণ ঘটে ১৯৮২ সালে। তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির ডারমস্টাড শহরে অবস্থিত ইনস্টিটিউট ফর হেভি আয়ন রিসার্চের একদল বিজ্ঞানী এই অসাধ্য সাধন করেন। এই গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন বিখ্যাত বিজ্ঞানী পিটার আর্মব্রাস্টার ও গটফ্রিড মুনজেনবার্গ। গবেষকেরা একটি উচ্চশক্তিসম্পন্ন লিনিয়ার অ্যাকসিলারেটর ব্যবহার করে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে রাখা বিসমাথ-২০৯ পরমাণুর ওপর আয়রন-৫৮ আয়নের আঘাত করেন। ১০ দিন ধরে চলা অবিরাম আঘাতের পর তারা একটি অভাবনীয় ফলাফল পান। বিসমাথ ও আয়রন পরমাণুর মধ্যে নিউক্লীয় ফিউশন বা সংযোজন বিক্রিয়া ঘটে। তখন নতুন এই মৌলটির মাত্র একটি মাত্র নিউক্লিয়াস বা পরমাণু তৈরি হয়।
যদিও তৈরি হওয়া পরমাণুর সংখ্যা ছিল মাত্র এক, কিন্তু বিজ্ঞানীদের কাছে থাকা ডিটেকশন প্রযুক্তি বা শনাক্তকরণ পদ্ধতি বেশ সংবেদনশীল ছিল। সংবেদনশীলতার কারণে সেই একটি পরমাণুর অস্তিত্ব নিয়ে কোনো সন্দেহ ছিল না। এই পরমাণুটি ছিল মাইটনেরিয়াম-২৬৬ আইসোটোপ, যা মাত্র ৫ মিলিসেকেন্ড স্থায়ী হওয়ার পর তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের মাধ্যমে অন্য মৌলে রূপান্তরিত হয়ে যায়।
মাইটনেরিয়াম পর্যায় সারণির ট্রান্সঅ্যাকটিনয়েড মৌল হিসেবে পরিচিত। পর্যায় সারণির গ্রুপ-৯–এ অবস্থিত হওয়ার কারণে ধারণা করা হয়, এর রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যগুলো মূল্যবান ধাতু ইরিডিয়ামের মতো হবে। এটি একটি অত্যন্ত তেজস্ক্রিয় ধাতু। এখন পর্যন্ত গবেষণাগারে এই মৌলটির ১০টির কম পরমাণু তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।
যেহেতু এটি তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন এবং এটি অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী, তাই দৃশ্যমান বা পর্যবেক্ষণযোগ্য পরিমাণে এটি আলাদা করা সম্ভবত কখনোই সম্ভব হবে না। এরই মধ্যে মাইটনেরিয়ামের বেশ কিছু আইসোটোপ শনাক্ত করা হয়েছে। এদের ভর সংখ্যা ২৬৬ থেকে ২৭৯–এর মধ্যে। এই আইসোটোপগুলোর প্রতিটিই অত্যন্ত অস্থির, তবে এদের স্থায়িত্বের মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। মাইটনেরিয়াম-২৬৬ প্রথম আবিষ্কৃত আইসোটোপ, যার স্থায়িত্ব ছিল ৫ মিলিসেকেন্ড। মাইটনেরিয়াম-২৭৬ আইসোটোপটির অর্ধায়ু প্রায় ০.৭২ সেকেন্ড। মাইটনেরিয়াম-২৭৮ এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত মাইটনেরিয়ামের দীর্ঘতম স্থায়ী আইসোটোপ, যার অর্ধায়ু প্রায় ৮ সেকেন্ড।
সূত্র: ব্রিটানিকা