সকালে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ গরম চা বা কফি ছাড়া অনেকেরই দিন শুরু হয় না। তাই দ্রুত পানি গরম করার জন্য প্লাস্টিকের ইলেকট্রিক কেটলি নিয়মিত ব্যবহার করেন অনেকে। তবে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণা সকালের এই অভ্যাসের বিষয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে। অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ডের বিজ্ঞানীদের পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্লাস্টিকের কেটলিতে পানি ফোটানোর সময় বিপুল পরিমাণে ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিক পানির সঙ্গে মিশে যায়।
গবেষকদের দাবি, একটি সম্পূর্ণ নতুন প্লাস্টিকের কেটলি প্রথমবার ব্যবহার করার সময় প্রতি মিলিলিটার পানিতে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ ন্যানোপ্লাস্টিক কণা নির্গত হয়। সেই হিসাবে, সাধারণ ২৫০ মিলিলিটারের এক কাপ চায়ের পানিতে প্রায় ৩০০ কোটি প্লাস্টিকের কণা মিশে যেতে পারে! গবেষণার প্রধান লেখক এলভিস ওকোফো বলেন, বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের প্রতিদিনের রুটিন হলো প্লাস্টিকের কেটলিতে পানি ফোটানো। আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, অত্যন্ত সাধারণ এই অভ্যাসের কারণে প্রতিদিন আমাদের শরীরে ঢুকে যাচ্ছে সূক্ষ্ম প্লাস্টিকের কণা। এই গবেষণা প্রমাণ করে, ঘরের প্লাস্টিক কেটলিগুলো মানুষের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়ানোর অন্যতম প্রধান উৎস।
বিভিন্ন গবেষণায় ফুটন্ত পানিতে টি-ব্যাগ ডোবানোর ফলে মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে সতর্ক করা হলেও প্লাস্টিকের ইলেকট্রিক কেটলি থেকে ঠিক কী পরিমাণ প্লাস্টিক ছড়ায়, তা এত দিন স্পষ্ট ছিল না। বিষয়টি নিশ্চিত হতে গবেষকেরা একটি প্লাস্টিকের কেটলিতে টানা ১৫০ বার পানি ফুটিয়ে পরীক্ষা করেন। দেখা গেছে, নতুন অবস্থায় কেটলি থেকে সবচেয়ে বেশি মাত্রায় প্লাস্টিক কণা নির্গত হয়। তবে কেটলিটি পুরোনো হওয়ার পরও এই ধারা পুরোপুরি বন্ধ হয় না। টানা ১৫০ বার পানি ফোটানোর পরও প্রতি মিলিলিটারে ৮ লাখ ২০ হাজার ন্যানোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। কেটলি পুরোনো হওয়ার পরেও প্রতি কাপ চায়ে প্রায় ২০ কোটি ৫০ লাখ প্লাস্টিক কণা রয়েই যায়। তবে পানিতে খনিজ উপাদান বেশি থাকলে প্লাস্টিক কণা কম ছড়ায়। বিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী, পানিতে থাকা খনিজ উপাদানগুলো কেটলির ভেতরের দেয়ালে একটি প্রতিরক্ষামূলক স্তর তৈরি করে। ফলে পানি ফোটানোর সময় প্লাস্টিক কণা নির্গত হওয়ার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
বিজ্ঞানীরা প্লাস্টিকের এই অতিক্ষুদ্র কণাগুলো মানুষের শরীরে নিয়মিত প্রবেশ করার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, এই কণাগুলো মানবদেহের কোষের ভেতরে প্রবেশ করে কোষের স্বাভাবিক কার্যকলাপে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটাতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ওপর এর প্রভাব হতে পারে সুদূরপ্রসারী, যা প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে বড় ধরনের শারীরিক জটিলতা তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাইক্রোপ্লাস্টিক মানুষের প্রজনন ক্ষমতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কার্ডিফ মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির বায়োমেডিক্যাল সায়েন্সের সিনিয়র লেকচারার রাচেল অ্যাডামসের মতে, এই কণাগুলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বিভ্রান্ত করে টিস্যুর ক্ষতি করতে পারে। তা ছাড়া মাইক্রোপ্লাস্টিক পানিকে প্রতিহত করে কিন্তু পারদ বা কীটনাশকের মতো অন্যান্য বিষাক্ত রাসায়নিককে নিজের গায়ে আটকে ফেলে। ফলে এই প্লাস্টিক কণা যখন শরীরে ঢোকে, তখন তা অন্যান্য মারাত্মক বিষাক্ত উপাদানকে চর্বিযুক্ত টিস্যুতে জমিয়ে ফেলতে সাহায্য করে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে গবেষকেরা নতুন কেটলি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন। বিজ্ঞানী ওকোফো বলেন, ‘সাধারণত নতুন কেটলি কিনে আমরা কেবল পানি দিয়ে একবার ধুয়ে নিই; কিন্তু তাতে প্লাস্টিক কণা দূর হয় না। নতুন কেটলি ব্যবহারের আগে তাই কয়েকবার পানি ফুটিয়ে ফেলে দিতে হবে।’
সূত্র: ডেইলি মেইল