
১৯৪৭ সালে ভারতজুড়ে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে। জন্ম হয় দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানের । বেশির ভাগ হিন্দু থেকে যান ভারতে আর মুসলিমরা পাকিস্তানে। বিশ্বে এ পর্যন্ত বড় ধরনের যত দেশান্তরের ঘটনা ঘটেছে, এর মধ্যে ৭০ বছর আগে ভারত-পাকিস্তান ভাগের ঘটনা অন্যতম। দেশ বিভাগের সেই অগ্নিগর্ভ সময়ে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বা দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। মারা যায় ১০ লাখের বেশি মানুষ। কয়েক কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। এমন অনেকে পাড়ি দেয় পশ্চিমা বিশ্বে। যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী এমন কয়েকজনের অভিজ্ঞতা নিয়ে বিবিসি অনলাইনের একটি প্রতিবেদন এখানে তুলে ধরা হলো:
‘মানুষ খুব দ্রুত পাল্টে যায়’
করম
(ভারতের জালান্দারের আদি বাসিন্দা)
দেশ ভাগ হওয়ার আগে হিন্দু, মুসলিম ও শিখ—আমরা সবাই একটি পরিবারের মতো ছিলাম। আমরা কখনো ভাবিনি আমাদের মধ্যে বিভেদ ঘটবে। আমি এখনো ধন্দে ঘুরপাক খাই, মানুষ কেন এত দ্রুত পাল্টে যায়।
বাইরে থেকে মুসলিমরা এসে আমাদের গ্রামে হামলা চালায়। বিষাক্ত একটি বল্লম আমার হাতে গেঁথে গেল। মৃত্যুর জন্য আমাকে ফেলে রাখা হলো। তবে আমার বোনকে একটি মুসলিম পরিবার নিজেদের ঘরে নিয়ে লুকিয়ে রেখে প্রাণে বাঁচিয়েছিল। কিন্তু আমার বাবা ওই হামলা থেকে বাঁচতে পারেননি। এখনো আমি ওই সময়ের ঘটনা নিয়ে দুঃস্বপ্ন দেখি। জেগে উঠে কাঁপতে থাকি।
‘আমার বান্ধবীকে ধর্ষণ করা হয়েছিল’
খুরশিদ
(দিল্লি ও শিমলাতে বেড়ে ওঠা, এরপর পাকিস্তানের করাচিতে স্থানান্তর)
দেশভাগের কয়েক বছর আগে হিন্দু, শিখ, মুসলিম, খ্রিষ্টান—সব ধর্মের শিশুরা একসঙ্গে স্কুলে গলা মিলিয়ে বিদ্রোহ করেছি। বলেছি, ‘আমরা স্বাধীনতা চাই—ভারত আমাদের।’
কিন্তু যখন দিল্লিতে অনেক মুসলমানকে হত্যা করা হলো, তখন আমরা বুঝলাম আমাদের পক্ষে ভারতে থাকার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের পাকিস্তানে যেতে হবে। আমার দুই ঘনিষ্ঠ বান্ধবী ছিল হিন্দু। আমরা প্রায়ই একে অপরের বাড়িতে বেড়াতে যেতাম। কিন্তু দেশভাগের পর তারা আমাকে একটি চিঠি লিখেছিল। জানিয়েছিল, আমাদের স্কুলের এক মুসলিম বান্ধবী যে ভারতে রয়ে গেছে, তাকে আমাদেরই এক শিক্ষক ধর্ষণ করেছেন। আমার যে তখন কেমন লেগেছে, তা বলে বোঝাতে পারব না।
‘ট্রেনের সবাইকে জবাই করা হয়েছিল’
মহিন্দ্র
লিয়ালপুর (পাকিস্তানের ফয়সালাবাদ) থেকে দিল্লি
আমি যে বাড়িটি ছেড়ে এসেছি, সেখান থেকে এই ইটটি নিয়ে এসেছি। এটি দেখলেই ফেলে আসা সুদিনগুলোর কথা মনে পড়ে। আমার বাবা কখনো নিজের দেশ ছাড়তে চাননি। তিনি সেই জায়গাটা খুব পছন্দ করতেন।
আমার ১৯৪৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বরের কথা মনে পড়ে। সেদিন আমরা ষষ্ঠ জন্মদিন ছিল। অথচ সেদিন পাকিস্তানে আমাদের বাড়িটি ছেড়ে আসি আমরা। ভারতে যাওয়ার ট্রেন ধরতে আমাদের ২৫ মাইল হাঁটতে হয়েছিল। ট্রেনটি যেই না চলতে শুরু করল, তখন আমার বাবা বললেন, ‘হয়েছে, সবাই নেমে পড়ো।’ কারণ, সেখানে আমার বড় ভাইয়ের ওঠার জায়গা ছিল না। পরের দিন আমরা দেখলাম ওই ট্রেনে যারা ছিল, তাদের সবাইকে মেরে ফেলা হয়েছে।
‘আমাকে ভারতে ছাড়তে বলল’
পামেলা
(কলকাতায় বেড়ে ওঠা)
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সুন্দর বাগানে আমরা ছোট্ট বন্ধুরা খেলা করতাম। পুতুল নিয়ে বেড়াতে যেতাম। আয়ারা সব সাদা পোশাক পরত। সেখানে আমাদের সময়টা ছিল খুব সুন্দর। আমি কলকাতায় যেখানে খুশি নিজের মতো যেতে পারতাম। নিরাপত্তা নিয়ে কোনো ঝুঁকি ছিল না। কিন্তু একদিন যখন আমি চৌরঙ্গিতে সাইকেল চালাচ্ছিলাম, তখন আচমকা একজন ভারতীয় পুরুষ আমার সাইকেলে জোরে ধাক্কা দেন এবং বলেন, ভারত ছেড়ে যাও। আমি ধাক্কায় রাস্তায় ছিটকে পড়ি। দেখি, চারপাশে অসংখ্য গাড়ি, রিকশা। এটা খুব ভয়াবহ ছিল। আমি মারাও যেতে পারতাম।
‘আমার দাদি সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন’
খুরশীদ
(ভারতের ফাগওয়ারাতে বেড়ে ওঠা, পরে পাকিস্তানের ফয়সালাবাদে গমন)
তারা দল বেঁধে আমাদের হত্যা করতে এসেছিল। আমরা শুনেছিলাম নারীদের ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমার চাচা প্রায়ই বলতেন, ‘আমাদের লোকজন দরকার হলে আমাদের মেয়েদের মেরে ফেলবে, দুর্বৃত্তদের সঙ্গে আমৃত্যু লড়ে যাবে, তবু এ জায়গা ছেড়ে নড়ব না।’
কিন্তু আমার দাদি ছিলেন সাহসী। তিনি বোঝাতে পেরেছিলেন যে মেয়েদেরও একটা কথা আছে। অন্যত্র যে যেতে হবে, তা তিনি বোঝাতে সক্ষম হন।
‘আমরা হাঁটছি আর গ্রামের পর গ্রাম যুক্ত হচ্ছিল’
হারচিত
(পাকিস্তানের ওকারা জেলা থেকে ভারতের ফাগওরাতে আসার অভিজ্ঞতা)
আমাদের মালবাহী গাড়ির পিছু পিছু হাঁটতে বলা হলো। দুই ষাঁড়ের পিঠে চেপে সেই গাড়ি চলছিল। সেখানে ছিল প্রচুর খাবার, কাপড় ও পশুর খাবার।
আমরা বুঝিনি যে ভারতে যাচ্ছি। হাঁটা যাত্রীদের বহর শুধু বাড়ছিল। গ্রামের পর গ্রাম আমাদের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছিল। একপর্যায়ে মানুষের এই লাইন মাইল ছাড়িয়ে যায়। আমরা নিজেরা বলাবলি করছি, পরিস্থিতি শান্ত না হওয়া পর্যন্ত আমরা ভারতে থেকে যাব। কিন্তু যখন চোখের সামনে মানুষকে খুন হতে দেখলাম, তখন ভাবলাম, আমরা কীভাবে ফিরব। আমি সেই মর্মান্তিক স্মৃতি আজও ভুলতে পারিনি। তারা বলল, আমরা এখন স্বাধীন। কিন্তু আপনার যখন সব হারিয়ে যায়, তখন এই ভালোর আর কী মূল্য থাকে? অনেক মানুষকে হারিয়ে আমরা এই স্বাধীনতা পেয়েছি।
‘এক প্রতিবেশী আমরা মায়ের জীবন বাঁচিয়েছিল’
পুনম
(মায়ের পরিবার পাকিস্তানের লাহোর থেকে ভারতের জালানধারে যাচ্ছিল)
আমার নানির প্রতিবেশী এক মুসলিম পরিবার একদিন এক বৈঠক থেকে ফিরে এসে বলল, তারা চলে যাচ্ছে এবং পরের দিন মেয়েদেরও নিয়ে গেল। এরপর আমার নানির পরিবার পাকিস্তান ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আমরা মা সব সময় এই প্রতিবেশীর কথা বলতেন। বলতেন, তাঁরা আমাদের বাঁচিয়েছে। এ জন্য তিনি তাঁদের কাছে ঋণী। এই দেশভাগ আমার মায়ের জীবনে প্রগাঢ় ছাপ ফেলা অভিজ্ঞতা। অবাক কাণ্ড যে এটি আমার জীবনেও তেমনই অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
‘ক্ষতের ওপর প্রলেপ পড়েছে কিন্তু এখনো তাড়িয়ে বেড়ায়’
রাজিয়া
(তাঁর পরিবার মুম্বাই থেকে)
দেশভাগ একটি স্পর্শকাতর বিষয়। এ বিষয়ে কথা বলাটা খুব কষ্টের। আমার মায়ের পরিবার পাকিস্তান চলে গেল। কিন্তু বাবার পরিবার দেশভাগের বিরুদ্ধে, তাই তাঁরা ভারতে থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন। এটি তাঁর জন্য খুব কষ্টের ছিল। তিনি তাঁর আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগও করতে পারতেন না। আমি মনে করি, এটি কাটিয়ে ওঠা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেই মানসিক ক্ষতের ওপর হয়তো প্রলেপ পড়েছে, কিন্তু এখনো যাঁরা ভারতীয় উপমহাদেশে ও প্রবাসে আছেন, তাঁদের সেই ক্ষত কুড়ে কুড়ে খায়। এই দেশভাগের প্রতিধ্বনি আমি আমার জীবনে প্রতিনিয়ত শুনতে পাই।
বিবিসি অবলম্বনে লিপি রানী সাহা