
জর্জিয়ার রাজধানী তিবিলিসিতে ‘ট্রাম্প টাওয়ার’ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি নথিপত্র অনুযায়ী, এই প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত জমিটির আংশিক মালিকানা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত এক নেতার ছেলের হাতে।
প্রস্তাবিত এই আকাশচুম্বী ভবনটি স্থানীয় একটি কনসোর্টিয়াম (কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের জোট) এবং ট্রাম্প অর্গানাইজেশনের যৌথ উদ্যোগ। ট্রাম্পের দুই ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র এবং এরিক ট্রাম্প বর্তমানে পারিবারিক এই প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন। ভবনটির জন্য যে জমি নির্বাচন করা হয়েছে, সেটির বর্তমান নিবন্ধিত মালিক হচ্ছে ‘ইন্টারন্যাশনাল চ্যারিটি ফান্ড কার্টু’।
সরকারি নথিপত্র অনুযায়ী, কার্টু ফান্ডের একক মালিক হলো কার্টু গ্রুপ জেএসসি। এই প্রতিষ্ঠানের ৩৫ শতাংশ শেয়ারের মালিক উতা ইভানিশভিলি। তিনি জর্জিয়ার ক্ষমতাসীন দলের অনারারি চেয়ারম্যান এবং বিলিয়নিয়ার রাজনীতিবিদ বিডজিনা ইভানিশভিলির বড় ছেলে।
বিডজিনা ইভানিশভিলি জর্জিয়া সরকারের ‘প্রকৃত নেতা’ হিসেবে পরিচিত। ২০২৪ সালে বাইডেন প্রশাসন তাঁর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। রাশিয়ার স্বার্থে জর্জিয়ার গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ ব্যাহত করার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
উতা ইভানিশভিলি ব্যক্তিগতভাবে নিষেধাজ্ঞার আওতায় নেই। ২০২৪ সাল পর্যন্ত কার্টু গ্রুপের শতভাগ মালিকানা তাঁর ছিল। তবে জর্জিয়ার শীর্ষ ধনী তাঁর বাবার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আসার পর তিনি নিজের শেয়ার কমিয়ে ৩৫ শতাংশে নামিয়ে আনেন।
তবে কার্টু গ্রুপের বাকি ৬৫ শতাংশ শেয়ারের মালিক কারা, তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী, ৫ শতাংশের নিচে শেয়ার থাকলে মালিকের নাম গোপন রাখা যায়।
ট্রাম্প অর্গানাইজেশন ও ইভানিশভিলি পরিবারের এই যোগসূত্র নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের নাম ব্যবহার করে আবাসন ও অবকাশযাপন কেন্দ্রের প্রকল্প গড়ে তোলার এ উদ্যোগকে ‘স্বার্থের সংঘাত’ হিসেবে দেখছেন অনেকে।
এর আগে ওমান ও সৌদি আরবের বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গেও ট্রাম্প অর্গানাইজেশনের একই ধরনের চুক্তির খবর এসেছিল। তবে হোয়াইট হাউস সব সময়ই দাবি করে আসছে, প্রেসিডেন্ট বা তাঁর পরিবার কখনোই কোনো স্বার্থের সংঘাতে জড়াননি এবং জড়াবেন না।
গত এপ্রিলে তিবিলিসিতে ৭০ তলা ভবন নির্মাণের ঘোষণা দেয় ট্রাম্প অর্গানাইজেশন। প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট এরিক ট্রাম্প এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান, জর্জিয়ায় বিশ্বমানের এই প্রকল্প আনতে পেরে তাঁরা গর্বিত। এ প্রকল্পে দক্ষ ডেভেলপারদের সঙ্গে কাজ করতে পেরে তাঁরা বিশেষভাবে আনন্দিত।
আর্কি গ্রুপ, বায়োগ্রাফি লিভিং, ব্লক্স গ্রুপ ও ফিনভেস্ট জর্জিয়া—এই চার স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ট্রাম্প অর্গানাইজেশনের সঙ্গে কাজ করছে। জর্জিয়ার সবচেয়ে উঁচু এই ভবন নির্মাণে আরও থাকছে যুক্তরাষ্ট্রের সাপির অর্গানাইজেশন। তবে এই কোম্পানি বা এদের পরিচালকদের বিরুদ্ধে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
আর্কি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ইলিয়া সুলাইয়া জর্জিয়ার ক্ষমতাসীন দলের সাবেক সংসদ সদস্য। অন্যদিকে বায়োগ্রাফি লিভিংয়ের মালিক পাখাকাদজে ভাইয়েরা। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
তিবিলিসির যে জমিতে টাওয়ারটি নির্মাণ করা হবে, সেটি আগে সোভিয়েত আমলের ঘোড়দৌড়ের মাঠ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে এর মালিক কার্টু। তবে ২০২৩ সালে জমিটি সেন্ট্রাল পার্ক অ্যাভিনিউ এলএলসি নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রির চুক্তি হয়েছে।
ইভানিশভিলির আইনজীবী তেমো সিকাভাদজে বলেন, ‘বিডজিনা ইভানিশভিলির পরিবারের ওই এলাকায় মোট ৫ লাখ ১১ হাজার বর্গমিটার জমি ছিল। এর বড় অংশ তিনি রাষ্ট্রকে দান করেছেন। সেখানে তিনি নিজ খরচে একটি পাবলিক পার্ক তৈরি করে দিচ্ছেন।’
জর্জিয়ায় ইভানিশভিলির সমালোচকদের ভাষ্য, মার্কিন প্রেসিডেন্টের সুদৃষ্টি পাওয়ার চেষ্টা থেকেই এসব করেছেন তিনি। তবে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা একে জর্জিয়ার অর্থনীতি ও সুশাসনের ওপর ট্রাম্পের আস্থার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।
জর্জিয়ার পার্লামেন্টের স্পিকার শালভা পাপুয়াশভিলি বলেন, ‘ট্রাম্পের প্রতিষ্ঠান এখানে ব্যবসা করতে আসার অর্থ হলো, তারা এ দেশের পরিবেশ সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখে।’
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল জর্জিয়ার দুর্নীতিবিরোধী কর্মসূচির ব্যবস্থাপক সান্দ্রো কেভখিশভিলি বলেন, জর্জিয়ায় ট্রাম্প টাওয়ার নির্মাণের এই পরিকল্পনা কেবল ব্যক্তিগত ব্যবসা নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক প্রকল্প। সরকারপন্থীরা এই ব্যবসাকে রাজনৈতিক জয় হিসেবে প্রচার করছে।
এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করে হোয়াইট হাউস বিষয়টি ট্রাম্প অর্গানাইজেশনের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। তবে এ বিষয়ে ট্রাম্প অর্গানাইজেশনের পক্ষ থেকেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।