
কঙ্গোর রাজধানী কিনশাসার প্রতিবেশী বিনজা ডেলভ্য শহরের বাসিন্দারা গত মাসে স্থানীয় একটি মার্কেটে বিশাল আকৃতির পোস্টার দেখে চমকে উঠেছেন। পোস্টারে দেশটির প্রেসিডেন্ট জোসেফ কাবিলার ছবি। নিচে লেখা ‘আমাদের প্রার্থী’। প্রায় একই সময় মিস্টার কাবিলা দেশের জন্য কতটা ‘অপরিহার্য’, তা তুলে ধরে তাঁর প্রশংসা করে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে বিজ্ঞাপন প্রচার শুরু হয়। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন শহরে তাঁর দল পিপলস পার্টি ফর রিকনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসি (পিপিআরডি) আয়োজিত মুক্ত কনসার্টে প্রেসিডেন্টের ছবিসংবলিত টি-শার্ট বিতরণ করা হয়।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আট কোটি মানুষের দেশ কঙ্গো। দেশটির জনগণ এখন নির্বাচনী জ্বরে আক্রান্ত। আর এটা অস্বাভাবিক। ২০০১ সালে বাবার হত্যাকাণ্ডের পর থেকে কাবিলা কঙ্গোর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দেশটির সংবিধান অনুযায়ী কাবিলা তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করতে পারবেন না। ২০১৬ সালে তাঁর ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা ছিল। কিন্তু তিনি এটা না করে ক্ষমতায় থাকার পথ বেছে নিয়েছেন।
নির্দিষ্ট মেয়াদের পর দুই বছর পার করে এখন মনে হয় সংবিধান যা-ই বলুক, তিনি নির্বাচনের আয়োজন করবেন এবং তাতে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করবেন। চলতি বছরের ২৩ ডিসেম্বর এই নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। এই নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নাও হতে পারে। তবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে—এমনটাই মনে করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের প্রধান কর্নেইলি নানগা বলেন, ‘সবকিছু ভালোভাবেই এগোচ্ছে।’ তিনিই নির্বাচন সম্পর্কে সন্দেহবাদীদের বোঝানোর জন্য ইউরোপের বিভিন্ন দেশের রাজধানী ও ওয়াশিংটন ডিসিতে দৌড়ঝাঁপ করছেন।
কাবিলার সদয় হওয়া ও এখন নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে চাওয়ার কারণ হলো তিনি নিজেকে প্রার্থী করার একটা পথ হয়তো পেয়েছেন। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য তিনি এখনো পরিষ্কার করে বলছেন না যে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। পিপিআরডির মুখপাত্র প্যাট্রিক এনকানগা বলেন, পোস্টার ও বিজ্ঞাপনে কাবিলার প্রশংসার অর্থ এই নয় যে তিনি (প্রেসিডেন্ট) আবার নির্বাচনে দাঁড়াবেন। এগুলো সবই উৎসাহী সমর্থকদের ‘মনের ভাব’ প্রকাশমাত্র। তবে তিনি সম্ভাবনার কথা উড়িয়েও দেননি। এনকানগা বলেন, ‘দেশ পরিচালনায় যে প্রেসিডেন্টের বেশ অভিজ্ঞতা আছে—এ কথা আপনারা অস্বীকার করতে পারেন না।’
প্রেসিডেন্টর তৃতীয় মেয়াদের দিকে যাওয়া সাংবিধানিক আদালতের ওপর অনেকটা নির্ভর করে। এই আদালতই ২০১৬ সালে রায় দিয়েছেন যে পরবর্তী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত কাবিলা ক্ষমতায় থাকবেন। গত কয়েক মাসে বেশ কয়েকজন বিচারক অবসরে যাওয়ায় প্রেসিডেন্ট কাবিলাও পছন্দের নতুন কাউকে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। দেশটির অনেক রাজনীতিবিদ আশঙ্কা করছেন যে আদালত শিগগিরই রায় দিতে পারেন যে দেশটির কাউন্ট ব্যবস্থা আবার চালু করা হবে। আর এটা হলে কাবিলা আরেক মেয়াদের সুযোগ পেয়ে যেতে পারেন। প্রতিবেশী দেশ বুরুন্ডির প্রেসিডেন্ট পিয়েরে এনকুরুনজিজা ২০১৫ সালে অনুরূপ পদক্ষেপ গ্রহণ করে সুবিধা নিয়েছিলেন।
যা-ই হোক, এত কিছু সত্ত্বেও কাবিলাকে অনাকাঙ্ক্ষিত বিরোধিতার মোকাবিলা করতে হবে। হেগের কারাগারে ১০ বছর বন্দী থাকার পর ৮ জুন ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট (আইসিসি) সেনাপতি জ্যঁ-পিয়েরে বেমবাকে মুক্তি দিয়েছেন। মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য বেমবা ২০১৬ সালে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। কিন্তু আপিল করার পর আদালত ওই রায় বাতিল করে দেন। রায়ে বলা হয়, তাঁর বাহিনীর দ্বারা ধর্ষণ ও গণহারে হত্যার দায় সম্পূর্ণভাবে তিনি একা নিতে পারেন না। ২০০৬ সালের নির্বাচনে কঙ্গোর প্রথম নির্বাচনে তিনি কাবিলার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দ্বিতীয় হয়েছিলেন। দেশে তাঁর আগমন বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারে। ‘কঙ্গোস ভায়োলেন্ট পিস’ বইয়ের লেখক ক্রিস বেরৌতস বলেন, বেমবা হলেন ‘কাবিলাবিরোধী আইকন’। রাস্তায় রাস্তায় প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করার জন্য তিনি অধিকাংশ সমর্থককে পাবেন।
কাবিলা যদি নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করেন, তিনি কি জিতবেন? তিনি এখন খুবই অজনপ্রিয় একজন প্রেসিডেন্ট। তাঁর সম্পর্কে কেউ ভালো কথা বলা মানুষ কঙ্গোতে খুঁজে পাওয়া যায় কদাচিৎ। নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে কঙ্গো রিসার্চ গ্রুপের এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, দেশটির মাত্র ১৭ শতাংশ মানুষ ক্ষমতাসীন দলকে ভোট দেওয়ার পক্ষপাতি। তাও এঁরা আবার সবাই দলের নেতার নেতৃত্বের প্রতি সম্পূর্ণভাবে ঐক্যবদ্ধ নন। তবে নির্বাচনে কারচুপি কিংবা ভোট কেনা হতে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে। প্রধান বিরোধী প্রার্থী কাবিলার একসময়ের ঘনিষ্ঠজন সাবেক গভর্নর ধনাঢ্য মো সে কাতুম্বি তাঁর সমর্থকদের নিয়ে ৯ জুন কিনশাসায় বিশাল সমাবেশ করেছেন। ২০১৬ সাল থেকে তিনি নির্বাসনে ছিলেন এবং দেশের জনগণের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যোগাযোগ রেখেছেন। তিনি যে বেমবার সঙ্গে জোট বাঁধবেন, এটা পরিষ্কার। তবে প্রার্থীদের বাদ দেওয়া ও বিরোধীদের বিভক্ত করার মাধ্যমে কাবিলা ভোট চুরি না করেই জয়লাভ করতে পারেন।
যদি তিনি তা-ই করেন, পশ্চিমা কূটনীতিকদের বেশির ভাগই তা মেনে নেবেন। কারণ তারা সবকিছুর ওপর স্থিতিশীলতাকে মূল্যায়ন করেন। তবে কঙ্গোর অধিকাংশ বাসিন্দা এর বেশি কিছু ঘটলেও বিস্মিত হবেন না। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে দেশটির ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষের জন্য জরুরি মানবিক সাহায্য প্রয়োজন। উর্বর মাটির এই দেশে এখন ২০ লাখের বেশি শিশু প্রায় দুর্ভিক্ষের কাছাকাছি। অপ্রয়োজনীয় একজন প্রেসিডেন্টের জন্য তৃতীয় মেয়াদ এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে কোনো সাহায্য করবে বলে মনে হয় না।