স্যাটেলাইট ছবিতে নাইজারের নিয়ামে বিমানবন্দর দেখা যাচ্ছে। ২৯ জানুয়ারি ২০২৬
স্যাটেলাইট ছবিতে নাইজারের নিয়ামে বিমানবন্দর দেখা যাচ্ছে। ২৯ জানুয়ারি ২০২৬

নাইজারের বিমানবন্দরে সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলা, ১১ সেনাসহ ৩৫ জন নিহত

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ নাইজারের সবচেয়ে বড় বিমানবন্দরে গতকাল বৃহস্পতিবার বন্দুকধারীরা হামলা চালিয়েছে। এ ঘটনায় হামলাকারীসহ ৩৫ জন নিহত হয়েছেন। পাঁচ মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ওই বিমানবন্দরে এ নিয়ে দ্বিতীয় হামলার ঘটনা ঘটল।

স্থানীয় বাসিন্দারা বিবিসিকে বলেন, ফজরের নামাজ শেষ করার পরপরই তাঁরা দিয়োরি হামানি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দ শুনতে পান। রাজধানী নিয়ামেতে বিমানবন্দরটির অবস্থান।

নাইজারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, হামলায় ১১ জন সেনাসদস্য ও ২ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া এ ঘটনায় ২২ জন হামলাকারীও নিহত হয়েছেন।

গতকাল সন্ধ্যায় আল-কায়েদাসম্পৃক্ত সংগঠন জামাত নুসরাত আল-ইসলাম ওয়াল-মুসলিমিন (জেএনআইএম) এ হামলার দায় স্বীকার করেছে।

নাইজারে এক দশক ধরে সশস্ত্র জঙ্গিগোষ্ঠীর ইসলামপন্থীদের বিদ্রোহ চলছে। জানুয়ারিতে সশস্ত্র গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটসম্পৃক্ত একটি সংগঠন একই বিমানবন্দরে হামলার দায় স্বীকার করেছিল।

গতকালের সহিংসতা শেষ হওয়ার পর নিরাপত্তা বাহিনী বেঁচে থাকা হামলাকারীদের ধরতে অভিযান শুরু করেছে।

বিমানবন্দরের কাছে বসবাসকারী লাওয়ালি তসালহা গতকালের হামলার ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বিবিসিকে বলেন, ‘আমরা ভোর ৫টা ৫০ মিনিটের দিকে নামাজ শেষ করি। এর কিছুক্ষণ পরই একটি বিকট শব্দ শুনতে পাই—যেন কিছু বিস্ফোরিত হয়েছে। ভেবেছিলাম হয়তো টায়ার ফেটে গেছে। কিছুক্ষণ পরই আমরা বুঝতে পারলাম আসলে কী ঘটছে।’

কর্তৃপক্ষ বলেছে, এ ঘটনায় ২২ জন হামলাকারী নিহত হওয়া ছাড়াও চারজন আহত হয়েছে। এ ছাড়া ২০ জন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

আমরা ভোর ৫টা ৫০ মিনিটের দিকে নামাজ শেষ করি। এর কিছুক্ষণ পরই একটি বিকট শব্দ শুনতে পাই—যেন কিছু বিস্ফোরিত হয়েছে। ভেবেছিলাম হয়তো টায়ার ফেটে গেছে। কিছুক্ষণ পরই আমরা বুঝতে পারলাম আসলে কী ঘটছে
লাওয়ালি তসালহা, প্রত্যক্ষদর্শী

এ ছাড়া নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রও জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে আরপিজি–৭ লঞ্চার, একে–৪৭ রাইফেল, বিস্ফোরক, গ্রেনেড, যোগাযোগ সরঞ্জাম এবং কয়েক হাজার গুলি।

সশস্ত্র স্থানীয় বাসিন্দারাও তল্লাশি অভিযানে অংশ নেন। তবে প্রত্যক্ষদর্শীরা বিবিসিকে বলেছে, নিরাপত্তা বাহিনী সাধারণ মানুষকে এতে জড়িত হতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, ‘হামলাকারীরা স্থানীয় জনগণের মধ্যে মিশে গিয়েছিল। তাই তাদের খুঁজে বের করাটা সহজ কাজ ছিল না। সাধারণ মানুষ নিজেদের রক্ষা করতে এবং সামনে সন্দেহজনক কাউকে দেখলে আক্রমণ করার জন্য দা ও লাঠি নিয়ে প্রস্তুত হয়েছিল।’

গতকাল দুপুরে বিমানবন্দর এলাকার আশপাশ সম্পূর্ণ লকডাউন করে দেওয়া হয়। নিরাপত্তা বাহিনী এলাকায় প্রবেশ করা ও সেখান থেকে বের হয়ে যাওয়া যানবাহনে তল্লাশি চালায়।

আফ্রিকান ইউনিয়ন কমিশনের চেয়ারপারসন মাহমুদ আলী ইউসুফ এ হামলার তীব্র নিন্দা জানান। তিনি নাইজারের নিরাপত্তা বাহিনীর প্রশংসা করেন। ইউসুফ বলেন, তাদের পদক্ষেপের কারণে হামলা প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে এবং বিমানবন্দরের স্থাপনা সুরক্ষিত রাখা গেছে।

দিয়োরি হামানি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নাইজারের অন্যতম সংবেদনশীল নিরাপত্তা স্থাপনা। এটি একটি বেসামরিক বিমান চলাচল কেন্দ্র হওয়ার পাশাপাশি একটি সামরিক ঘাঁটিও।

এ ছাড়া এখানে সাহেল রাষ্ট্রগুলোর জোটের (এইএস) সঙ্গে সম্পর্কিত স্থাপনাও আছে। নাইজার, মালি ও বুরকিনা ফাসো এ জোটের অন্তর্ভুক্ত। এ তিনটি দেশেই জান্তার শাসন চলছে।

নাইজারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, গত জানুয়ারিতে একই বিমানবন্দরের হামলার ঘটনায় চার সেনা আহত এবং ২০ জন হামলাকারী নিহত হন। তখন দেশের সামরিক সরকারের প্রধান আবদুরাহমানে তিয়ানি রাশিয়াকে হামলা প্রতিহত করতে সহায়তার জন্য ধন্যবাদ জানান।

একই সঙ্গে তিয়ানি অভিযোগ করেন, ফ্রান্স, বেনিন ও আইভরি কোস্টের প্রেসিডেন্টরা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দিচ্ছেন। তবে তিনি তাঁর অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি। রাশিয়া কী ধরনের সহায়তা দিয়েছে, সে বিষয়েও বিস্তারিত কিছু বলেননি।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় কর্তৃপক্ষ সন্ত্রাসী ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে বিমানবন্দর এলাকার কাছে কিছু স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এ ছাড়া বিমানবন্দরের চারপাশের নিরাপত্তাবেষ্টনী সম্প্রসারণ করা হয়েছে এবং ৩৫০টির বেশি নজরদারি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।