
‘হর্ন অব আফ্রিকায়’ আধিপত্য বিস্তারের লড়াই অনেক পুরোনো। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই অঞ্চলটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সামরিক ঘাঁটি স্থাপন এবং ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের একটি প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সোমালিল্যান্ডকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলের স্বীকৃতি বিষয়টিকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
সম্প্রতি প্রথম কোনো দেশ হিসেবে সোমালিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী ভূখণ্ড সোমালিল্যান্ডকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ইসরায়েল। তেল আবিবের এ ঘোষণায় আবার সামনে এসেছে ‘হর্ন অব আফ্রিকা’ হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার বিষয়টি।
বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, ফিলিস্তিনের গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের উৎখাত করে সোমালিল্যান্ডে স্থানান্তরের ইসরায়েলি পরিকল্পনার অংশ এটি। আবার কেউ বলছেন, হর্ন অব আফ্রিকায় দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত উপস্থিতি নিশ্চিতের অংশ হিসেবে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এর অন্যতম লক্ষ্য এই অঞ্চলে তুরস্কের ক্রমবর্ধমান প্রভাব কমানো।
হর্ন অব আফ্রিকায় আধিপত্য বিস্তারের এই লড়াই অনেক পুরোনো। বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপথে বাণিজ্যের প্রায় ১৪ শতাংশ এবং বিশ্বব্যাপী কনটেইনারনির্ভর বাণিজ্যের ৩০ শতাংশ লোহিত সাগরের মধ্য দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা চলে আসছে। এতে অঞ্চলটি ইতিমধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে সামরিকায়ন করা একটি অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। হর্ন অব আফ্রিকায় বিশ্বের প্রায় সব কটি প্রভাবশালী দেশের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে।
‘হর্ন অব আফ্রিকা’ কী
মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, আফ্রিকা মহাদেশের উত্তর-পূর্ব অংশটি আরব সাগরের দিকে এমনভাবে প্রসারিত হয়েছে, যা দেখতে অনেকটা গন্ডারের শিংয়ের মতো। মূলত এই ভৌগোলিক আকৃতির কারণেই অঞ্চলটিকে ‘হর্ন অব আফ্রিকা’ বা ‘আফ্রিকার শিং’ বলা হয়।
ইথিওপিয়া, সোমালিয়া, জিবুতি ও ইরিত্রিয়ার মানচিত্রকে এক করে দেখলে শিংয়ের আকৃতির মতো দেখায়। প্রায় ২০ লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে এই অঞ্চল গঠিত। অবশ্য বৃহৎ পরিসরে কেনিয়া, উগান্ডা, দক্ষিণ সুদান ও সুদানকেও এই অঞ্চলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
নিরাপত্তার প্রশ্নে হর্ন অব আফ্রিকা সেখানকার দেশগুলোর মতোই বৈচিত্র্যময় ও জটিল। সামগ্রিকভাবে এসব পরিস্থিতি এই অঞ্চলকে বিশ্বের অন্যতম অস্থির একটি ভূরাজনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত করেছে।
জিবুতির মতো ক্ষুদ্র রাষ্ট্র থেকে শুরু করে সুদানের মতো বিশাল রাষ্ট্র—সব দেশই এখানে নিজেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ হিসেবে মনে করে এবং একে অপরের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালায়। তার ওপর রয়েছে বিদেশি শক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব।
ভূরাজনৈতিক আধিপত্যের লড়াই
লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের তীর ঘেঁষে আফ্রিকা, এশিয়া ও ইউরোপের সংযোগস্থলে হর্ন অব আফ্রিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। সুয়েজ খালের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চল বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ, জ্বালানি তেলের রুট এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ করে।
এই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই অঞ্চলটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সামরিক ঘাঁটি স্থাপন এবং ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের একটি প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
গত এক দশকে হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলটি দ্রুত সামরিকীকরণ এবং নিরাপত্তা অবকাঠামোর ব্যাপক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। বিশ্বশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা, ভূমধ্যসাগরে চলমান বিরোধ, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সংকট—এই প্রতিটি বিষয়ই এই অঞ্চলে নিজ নিজ প্রভাববলয় তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। এর ফলে এমনিতেই ভঙ্গুর এই অঞ্চল একটি জটিল যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
শুধু জিবুতির মতো ২৩ হাজার বর্গকিলোমিটারের ছোট্ট একটি দেশে সামরিক ঘাঁটি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেনের। সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের বিষয়ে আলাপ চালিয়ে যাচ্ছে সৌদি আরবও। ইরিত্রিয়ায় সামরিক ঘাঁটি আছে ইসরায়েল ও আরব আমিরাতের। ঘাঁটি স্থাপনের আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে রাশিয়া।
সোমালিয়ায় সামরিক ঘাঁটি আছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, আরব আমিরাত ও তুরস্কের। সোমালিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চল সোমালিল্যান্ডে সামরিক স্থাপনা আছে আরব আমিরাতের। প্রথম দেশ হিসেবে সোমালিল্যান্ডকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়ে ইসরায়েল এই ভূখণ্ডে সামরিক উপস্থিতির পরিকল্পনা নিয়েছে।
এ ছাড়া কেনিয়ায় সামরিক ঘাঁটি আছে যুক্তরাষ্ট্রের। সুদানে সমুদ্রবন্দর নির্মাণে চুক্তি করেছে তুরস্ক ও রাশিয়া। সর্বোপরি আরব সাগর ও লোহিত সাগরজুড়ে রয়েছে বিশ্বের সব পরাশক্তির পাশাপাশি প্রভাবশালী দেশগুলোর নৌবাহিনীর উপস্থিতি।
মুখোমুখি তুরস্ক-ইসরায়েল
গত ডিসেম্বরে বিচ্ছিন্নতাবাদী ভূখণ্ড সোমালিল্যান্ডকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ইসরায়েল। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সোমালিল্যান্ড স্বাধীনতা ঘোষণা করলেও ইসরায়েল ছাড়া আর কোনো দেশ এখন পর্যন্ত তাদের স্বীকৃতির দাবি মেনে নেয়নি।
তুরস্কসহ অনেক আঞ্চলিক দেশ ইসরায়েলের এই পদক্ষেপের সমালোচনা করেছে। ১৩ বছর ধরে সোমালিয়ায় তুরস্কের বড় ধরনের বিনিয়োগ রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত বাদে অধিকাংশ আরব ও আঞ্চলিক দেশ ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর এই সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়েছে।
ইসরায়েলের এই পদক্ষেপের পেছনে বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। কেউ মনে করছেন, এটি গাজা থেকে ১০ লাখ ফিলিস্তিনিকে হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে স্থানান্তরের একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ। আবার কেউ কেউ মনে করেন, গাজায় ইসরায়েলি অভিযানের জবাবে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের (আনসারুল্লাহ) পক্ষ থেকে যে হুমকি তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলাই এর মূল লক্ষ্য।
হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলের বিষয়ে অভিজ্ঞ তুরস্কের সাবেক রাষ্ট্রদূত কানি তোরুন বলেন, ‘সোমালিল্যান্ড সরাসরি ইয়েমেনের বিপরীতে অবস্থিত। এটি ইসরায়েলকে সেখানে সামরিক স্থাপনা তৈরির সুযোগ দেবে, যার মাধ্যমে তারা বাবেলমান্দেব প্রণালি ও লোহিত সাগরে প্রবেশের সুযোগ পাবে এবং পূর্ব আফ্রিকায় প্রভাব বিস্তার করতে পারবে।’
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম আই২৪-এর সাংবাদিক আমিচাই স্টেইনও এই মতের সঙ্গে একমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত হুতিদের মোকাবিলায় ইসরায়েল কোনো স্পষ্ট কৌশল তৈরি করতে পারেনি। এই পদক্ষেপ ইসরায়েলি সরকারকে এ অঞ্চলে প্রভাব বাড়াতে সাহায্য করতে পারে, বিশেষ করে যখন ইসরায়েলগামী কার্গো জাহাজের জন্য সুয়েজ খাল অনেকটা অবরুদ্ধ।’
আমিচাই স্টেইন আরও বলেন, ‘এর দ্বিতীয় লক্ষ্য হলো আফ্রিকায় তুরস্কের প্রভাবকে প্রতিহত করা। এ অঞ্চলে তুরস্কের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। আঙ্কারা ছাড়াও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ঘাঁটি আছে এবং আরও বেশ কিছু দেশ এই কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পথে নিজেদের প্রভাব ও উপস্থিতি নিশ্চিত করার সুযোগ খুঁজছে।’
আঞ্চলিক স্বার্থ নিয়ে সংঘাত
২০২৩ সাল থেকে তুরস্ক ও ইসরায়েলের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের দ্রুত অবনতি ঘটেছে। গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা চালিয়েছে বলে অভিযোগ আঙ্কারার। এর জেরে গত বছর ইসরায়েলের ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তুরস্ক।
গত ডিসেম্বরে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর এই সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়েছে। ইসরায়েল একটি বিভক্ত সিরিয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, যা তুরস্কের স্বার্থবিরোধী। মূলত সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে কুর্দিদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আঙ্কারার উদ্বেগের কারণেই এই বিরোধ।
নাইরোবিভিত্তিক আফ্রো-এশিয়া ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক আবদিওয়াহাব শেখ আবদিসামাদ বলেন, ‘সোমালিল্যান্ডকে ইসরায়েলের এই স্বীকৃতি মূলত হর্ন অব আফ্রিকা এবং লোহিত সাগর অঞ্চলে তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরও তীব্র করবে।’
সোমালিয়ায় তুরস্ক ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। দেশটিতে তুরস্কের বিশ্বের বৃহত্তম দূতাবাস, একটি সামরিক প্রশিক্ষণ একাডেমি ও সমুদ্রবন্দর রয়েছে। এ ছাড়া মোগাদিসু বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনা এবং মহাকাশ, জ্বালানি, বাণিজ্য ও শিক্ষা খাতে তুরস্কের বিভিন্ন প্রকল্প চালু আছে।
আবদিসামাদ বলেন, সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতির বিষয়ে ইসরায়েলের পদক্ষেপ তুরস্কের ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এটি ইসরায়েলকে বাবেলমান্দেব প্রণালির উভয় পাশে শক্ত অবস্থান তৈরি করে দেবে এবং তুর্কি প্রভাবকে প্রতিহত করবে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তুরস্ক ও সোমালিয়া দীর্ঘদিন ধরে লাস কোরাই এলাকায় আরেকটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। লাস কোরাই নবঘোষিত খাতুমো রাজ্যের একটি বন্দর, যেখান থেকে সরাসরি লোহিত সাগরে প্রবেশ করা যায়।
সোমালিল্যান্ড যে অঞ্চলটি নিজেদের বলে দাবি করে, খাতুমো তার প্রায় ৪৫ শতাংশ এলাকাজুড়ে অবস্থিত।
২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত মোগাদিসুতে দায়িত্ব পালন করা তুরস্কের রাষ্ট্রদূত কানি তোরুন জানান, ওই এলাকায় একটি ঘাঁটি ও কাছাকাছি ছোট বন্দর স্থাপনের বিষয়ে আঙ্কারার সঙ্গে সোমালিয়া সরকারের একটি মৌখিক চুক্তি হয়েছিল, যদিও প্রকল্পটি বাস্তবে রূপ নেয়নি।
ইসরায়েল ২৬ ডিসেম্বর সোমালিল্যান্ডকে স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ৩০ ডিসেম্বর আঙ্কারায় সোমালিয়ার প্রেসিডেন্ট হাসান শেখ মোহামুদের সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এই স্বীকৃতিকে ‘বেআইনি ও অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান।
৬ জানুয়ারি সোমালিল্যান্ড সফরে যান ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সার। এই প্রথম ইসরায়েলের কোনো উচ্চপর্যায়ের কূটনীতিক বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চলটি সফরে গেল। রাজধানী হারগেইসায় তিনি প্রেসিডেন্ট আবদিরহমান মোহামেদ আবদুল্লাহির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
এখন দেখার বিষয়, তুরস্ক ও ইসরায়েলের এই কূটনৈতিক লড়াই শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়?
তথ্যসূত্র: সিএসআইএস, মিডল ইস্ট আই, আল-জাজিরা