
আফ্রিকার সবচেয়ে বড় হ্রদ লেক ভিক্টোরিয়া। উগান্ডার রাজধানী কাম্পালার লুজিয়ারা এলাকার কাছে এর অবস্থান। হ্রদটিতে গেলে দেখা মিলবে একটি ভাসমান রেস্তোরাঁ ও বারের। একটি কাঠের নৌকার ওপর গড়ে তোলা হয়েছে এই রেস্তোরাঁ ও বার। এই ভাসমান রেস্তোরাঁয় গড়ে তোলা হয়েছে সবুজের সমারোহ। নৌকার কাঠের কাঠামোতে আছে নানা ফুলের গাছ। দেখলে মনে হবে একখণ্ড সবুজ ভূখণ্ড। সবুজেঘেরা ভাসমান এ রেস্তোরাঁ গড়ে তোলা হয়েছে অভিনব কায়দায়। হাজারো পরিত্যক্ত প্লাস্টিক বোতলকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে পাটাতন তৈরি করা হয়েছে। হ্রদে সব সময় নোঙর করা থাকে নৌকাটি।
একসময় ভ্রমণ গাইড হিসেবে কাজ করতেন জেমস কাতিবা। তিনি দেখলেন, ভারী বৃষ্টির পর হ্রদে অনেক প্লাস্টিক বর্জ্য জমা হয়। সেগুলো সরাতে অভিনব এক উদ্যোগ নেন তিনি। কাতিবা ২০১৭ সালে নৌকা নির্মাণের কাজ শুরু করেন। তিনি বুঝতে পারেন, এ নৌকা দিয়ে লেক ভিক্টোরিয়ার তীরে তিনি টেকসই একটি ব্যবসা গড়ে তুলতে পারবেন। ভাসমান রেস্তোরাঁ ও বারটিতে অনেক ভ্রমণপিপাসু আনন্দ খুঁজে পাবেন।
উগান্ডার রাজধানী কাম্পালার উপকণ্ঠে অবস্থিত লুজিরা এলাকায় যাঁরা বেড়াতে আসেন, তাঁদের অনেকেই নৌকাটি তৈরির পেছনের ইতিহাস জানেন না। কাতিবা বলেন, আফ্রিকার সবচেয়ে বড় হ্রদগুলোর একটিকে রক্ষা করাই তাঁর এই নৌকা বানিয়ে ব্যতিক্রমী ব্যবসা পরিচালনার মূল লক্ষ্য।
ভিক্টোরিয়া হ্রদটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাধু পানির হ্রদ। এটি তিন দেশে বিস্তৃত। বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ও দূষিত পদার্থে হ্রদটি ছেয়ে গেছে। জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে সেখানকার পানির স্তরও নেমে গেছে। বর্ষা মৌসুমে প্লাস্টিকের প্রচুর বর্জ্য তীরে জমা হয়। দূষণের এ দৃশ্যমান চিহ্ন জেলে সম্প্রদায়ের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, জীবিকার জন্য তাঁরা প্রচণ্ডভাবে এই হ্রদের ওপর নির্ভরশীল।
কাতিবা বলেন, ‘আমাদের দেশে দূষণের বিষয়টি মাথায় রেখে তা মোকাবিলায় সাধারণ জিনিস দিয়ে কিছু একটা তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তিনি আশপাশের এলাকার জেলেদের বলেছিলেন, প্লাস্টিকের বোতল সংগ্রহের বিনিময়ে তাঁদের কিছু অর্থ দেওয়া হবে। ছয় মাসের মধ্যে তিনি ১০ টনের বেশি বোতল সংগ্রহ করেন।
নৌকা নোঙর করার পাটাতনে গাছপালাও বেড়ে উঠছে। কাতিবা বলেন, নৌকাটি এখন ‘ভাসমান দ্বীপ’ হিসেবে খ্যাতি পেয়েছে। এক শ দর্শনার্থী এক সঙ্গে এই রেস্তোরাঁয় বসে খাওয়াদাওয়া করতে পারেন। নৌকাটিকে ‘সকাল বেলার প্রশান্তি’ বলেও উল্লেখ করেন কাতিবা।
গ্রিস থেকে ‘ভাসমান দ্বীপে’ ঘুরতে এসেছেন জারো মাতুসিয়েউইকজ। তিনি বলেন, এমন জায়গা তিনি কখনো দেখেননি। নৌকার ভেতরের পরিবেশেরও প্রশংসা করেন তিনি।
মাতুসিয়েউইকজ বলেন, এটি খুব ভালো পরিকল্পনা। তিনি বোতল সংগ্রহ এবং ব্যবহার করছেন। এটি দারুণ কাজ! এটি যে শুধু পরিবেশকেই পরিষ্কার রাখছে, তা নয়। এতে ব্যতিক্রম কিছুও ঘটছে। খুব ব্যতিক্রম কিছু।’
২০১৮ সালে কেনিয়ার তীরে একই রকমের একটি প্রকল্প চালু করা হয়েছিল। সেখানে পুরোপুরি পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ব্যবহার করে ফ্লিপফ্লপি নামের একটি ছোট নৌকা তৈরি করা হয়েছিল। ভারত মহাসাগরের তীরবর্তী এলাকা থেকে ওই নবপ্লাস্টিক সংগ্রহ করা হয়েছিল।
দূষণ নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০২১ সালে লেক ভিক্টোরিয়ায় ফ্লিপফ্লপি নৌকাটি যাত্রা শুরু করে।
কাতিবার আশা, তাঁর নৌকাটি দৃষ্টান্ত তৈরি করবে। তিনি বলেন, ‘আমি নিশ্চিত, আমাদের এ কাজ দেখে অনেকে উদ্বুদ্ধ হবেন। এমন জিনিস তৈরিতে আমাদের অভিজ্ঞতাকে অনেকে কাজে লাগাবেন। লেক ভিক্টোরিয়ার প্লাস্টিক দূষণ মোকাবিলায় শুধু যে এ প্রক্রিয়াই অনুসরণ করতে হবে, তা নয়, আরও অন্য পদ্ধতিও ব্যবহার করা যেতে পারে।