রোমের খোলা মঞ্চ কলোসিয়ামের বাইরে আবেবে বিকিলাকে নিয়ে উদ্‌যাপন
রোমের খোলা মঞ্চ কলোসিয়ামের বাইরে আবেবে বিকিলাকে নিয়ে উদ্‌যাপন

ফিরে দেখা

খালি পায়ে রোম জয়, যেভাবে ইতিহাস গড়েছিলেন আবেবে বিকিলা

রোম শহরে তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে। রাস্তার পাশে মশাল হাতে দাঁড়িয়ে আছেন ইতালীয় সেনারা। সেই মশালের আলোয় ছুটছেন ম্যারাথনের দৌড়বিদেরা। ৪২ কিলোমিটারের বেশি পথ পেরিয়ে দৌড় তখন শেষের দিকে। সবার সামনে দুই আফ্রিকান। একজন ইথিওপিয়ার আবেবে বিকিলা। অন্যজন মরক্কোর রাদি বেন আবদেসসালাম।

দুজনের মধ্যে ব্যবধান খুবই কম। দীর্ঘ পথ প্রায় পাশাপাশি দৌড়েছেন। কেউ কাউকে ছাড়তে পারেননি। ফিনিশিং লাইন থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে এসে হঠাৎ গতি বাড়ালেন বিকিলা। রাদি চেষ্টা করলেন তাঁর সঙ্গে থাকার। পারলেন না। একটু একটু করে ব্যবধান বাড়তে শুরু করল।

বিকিলা ছুটতে থাকলেন রোমের ঐতিহাসিক আর্চ অব কনস্টানটাইনের দিকে। তাঁর পায়ে কোনো জুতা নেই। কিছুক্ষণ পর ফিনিশিং লাইন পার করলেন তিনি। সময় নিলেন ২ ঘণ্টা ১৫ মিনিট ১৬ দশমিক ২ সেকেন্ড। দ্বিতীয় হওয়া রাদি তখনো পেছনে।

তারিখটি ছিল ১৯৬০ সালের ১০ সেপ্টেম্বর।

সেদিনের ওই দৌড় আবেবে বিকিলার জীবন তো বদলে দিয়েছিলই, একই সঙ্গে বদলে দিয়েছিল বিশ্ব অ্যাথলেটিকসে আফ্রিকাকে দেখার দৃষ্টিও। বিকিলার সময়টি ছিল তখনকার বিশ্বসেরা। আগের বিশ্বসেরা সময়ের চেয়ে শূন্য দশমিক ৮ সেকেন্ড কম সময় নিয়েছিলেন তিনি। একই সঙ্গে গড়েছিলেন অলিম্পিক রেকর্ড। আফ্রিকার কোনো দেশের প্রতিনিধিত্ব করে অলিম্পিক সোনা জেতা প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ অ্যাথলেটও হন তিনি।

প্রায় অচেনা একজন দৌড়বিদ

অথচ রোমে যাওয়ার আগে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বিকিলা খুব পরিচিত নাম ছিলেন না। আবেবে বিকিলার জন্ম ১৯৩২ সালের ৭ আগস্ট, ইথিওপিয়ায়। তাঁর বেড়ে ওঠা ছিল সাধারণ গ্রামীণ পরিবেশে। পরে তিনি ইথিওপিয়ার সম্রাট হাইলে সেলাসির ইম্পেরিয়াল গার্ডে যোগ দেন। সেনাবাহিনীতে থাকার সময়ই তাঁর দৌড়ানোর ক্ষমতা নজরে আসে।

তাঁর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন ফিনল্যান্ডে জন্ম নেওয়া সুইডিশ কোচ ওনি নিসকানেন। ইথিওপিয়ার অ্যাথলেটদের প্রশিক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন নিসকানেন। বিকিলার শারীরিক সক্ষমতা দেখে তাঁকে দূরপাল্লার দৌড়ের জন্য তৈরি করতে শুরু করেন তিনি।

রোম অলিম্পিকের আগে ইথিওপিয়ায় বাছাই ম্যারাথনে বিকিলা সময় নেন ২ ঘণ্টা ২১ মিনিট ২৩ সেকেন্ড। ইথিওপিয়ার উচ্চভূমিতে করা সেই সময়টিও তখনকার অলিম্পিক রেকর্ডের চেয়ে ভালো ছিল। এই ফল তাঁকে অলিম্পিক দলে জায়গা করে দেয়।

তবে রোমে ম্যারাথনের সম্ভাব্য বিজয়ীদের তালিকায় বিকিলা ছিলেন না। সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের সের্গেই পোপভকে নিয়ে। ১৯৫৯ সালে পোপভ ২ ঘণ্টা ১৭ মিনিট ৪৫ দশমিক ২ সেকেন্ডে ম্যারাথন শেষ করে বিশ্বসেরা টাইমিং করেছিলেন। ফলে তাঁকেই সোনার অন্যতম দাবিদার মনে করা হচ্ছিল।

ফিনিশিং লাইন পেরিয়ে আবেবে বিকিলা

খালি পায়ে কেন

রোমে এসে বিকিলা আলোচনায় এলেন অন্য একটি কারণে। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, ম্যারাথনে দৌড়াবেন খালি পায়ে। ইথিওপিয়ায় বিকিলা জুতা পরেও অনুশীলন করতেন, আবার খালি পায়েও দৌড়াতেন। রোমে তাঁর ব্যবহারের জুতা নিয়ে সমস্যা হয়। নতুন জুতা পরে পায়ে ফোসকা পড়ে। ফলে ম্যারাথনের দিন নতুন জুতা পরে ঝুঁকি না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। খালি পায়ে দৌড়ানো তাঁর জন্য নতুন কিছু ছিল না। এভাবেই তিনি বহুবার অনুশীলন করেছিলেন।

অন্য রকম এক ম্যারাথন

১৯৬০ সালের রোম অলিম্পিকের ম্যারাথনটিও ছিল অন্য রকম। অলিম্পিকের ম্যারাথন সাধারণত স্টেডিয়ামকে কেন্দ্র করে আয়োজন করা হতো। রোমে সেই প্রথা ভাঙা হয়। এটিই ছিল প্রথম অলিম্পিক ম্যারাথন, যার শুরু বা শেষ—কোনোটিই মূল অলিম্পিক স্টেডিয়ামে হয়নি।

দৌড়ের দূরত্ব ছিল ৪২ দশমিক ১৯৫ কিলোমিটার। রোমের দিনের গরম এড়াতে প্রতিযোগিতা শুরু করা হয় বিকেল সাড়ে পাঁচটায়। ৩৫টি দেশের ৬৯ জন দৌড়বিদ অংশ নেন।

শুরুর জায়গা ছিল রোমের পিয়াজা দেল ক্যাম্পিদোলিও। সেখান থেকে পথ চলে যায় প্রাচীন রোমের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনার পাশ দিয়ে। দৌড়বিদেরা কারাকাল্লার স্নানাগার এলাকা পেরিয়ে যান। এরপর পথ চলে যায় প্রাচীন অ্যাপিয়ান ওয়ের দিকে। শেষ গন্তব্য রাখা হয়েছিল আর্চ অব কনস্টানটাইন।

দৌড় শুরু হয়েছিল দিনের আলোয়। কিন্তু ম্যারাথন শেষ হওয়ার আগেই রোমে অন্ধকার নেমে আসে। পথের শেষ অংশ আলোকিত করার জন্য রাস্তার পাশে ইতালীয় সেনাদের দাঁড় করানো হয়েছিল। তাঁদের হাতে ছিল মশাল। সেই মশালের আলোয় শেষ কয়েক কিলোমিটার দৌড়ান প্রতিযোগীরা।

দৌড় প্রতিযোগিতায় আবেবে বিকিলা (১১ নম্বর)

সামনে এলেন দুই আফ্রিকান

দৌড়ের শুরুতে বিকিলা একাই সামনে চলে যাননি। প্রথম দিকে এগিয়ে ছিলেন বেলজিয়ামের অরেল ভানদেন্দ্রিসে। সামনের দলে আরও কয়েকজন ইউরোপীয় দৌড়বিদ ছিলেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন বিকিলা এবং মরক্কোর রাদি বেন আবদেসসালাম।

১০ কিলোমিটার পার হতে সময় লাগে ৩১ মিনিট ৭ সেকেন্ড। তখনো কয়েকজন দৌড়বিদের মধ্যে লড়াই চলছিল। ২০ কিলোমিটারের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। বিকিলা ও রাদি অন্যদের থেকে বেরিয়ে আসেন। এরপর কার্যত রোমের ম্যারাথনটি পরিণত হয় ইথিওপিয়া ও মরক্কোর দুই দৌড়বিদের লড়াইয়ে।

২০ কিলোমিটার তাঁরা পার করেন ১ ঘণ্টা ২ মিনিট ৩৯ সেকেন্ডে। ২৫ কিলোমিটারে দুজনের সময়ই ছিল ১ ঘণ্টা ২০ মিনিট ৪৭ দশমিক ৬ সেকেন্ড। ৩০ কিলোমিটারেও তাঁরা একসঙ্গে। সময় ১ ঘণ্টা ৩৪ মিনিট ২৯ সেকেন্ড।

৩৫ কিলোমিটার পার হওয়ার পরও কেউ কাউকে ছাড়তে পারেননি। তখন তাঁদের সময় ১ ঘণ্টা ৫০ মিনিট ২৭ সেকেন্ড। ৩৭ কিলোমিটারেও দুজন পাশাপাশি। সময় ১ ঘণ্টা ৫৭ মিনিট ৫৮ সেকেন্ড।

পেছনের দৌড়বিদেরা ততক্ষণে অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছেন। ফলে সোনার পদক কার হবে, সেটি নির্ভর করছিল বিকিলা ও রাদির শেষ কয়েক কিলোমিটারের ওপর।

শেষ ৫০০ মিটারে বদলে গেল সব

দুজন পাশাপাশি ছুটতে ছুটতে রোমের পিয়াজা দি পোর্তা কাপেনার কাছে পৌঁছান। ফিনিশিং লাইন তখন প্রায় ৫০০ মিটার দূরে। ঠিক এই জায়গাতেই গতি বাড়িয়ে দেন বিকিলা।

এতক্ষণ রাদি তাঁর সঙ্গে তাল রাখতে পেরেছিলেন। এবার আর পারলেন না। বিকিলা ব্যবধান বাড়িয়ে একা এগিয়ে গেলেন আর্চ অব কনস্টানটাইনের দিকে।

ফিনিশিং লাইন পার করার সময় বিকিলার ঘড়িতে ২ ঘণ্টা ১৫ মিনিট ১৬ দশমিক ২ সেকেন্ড। রাদি বেন আবদেসসালাম দ্বিতীয় হন ২ ঘণ্টা ১৫ মিনিট ৪১ দশমিক ৬ সেকেন্ডে।

নিউজিল্যান্ডের ব্যারি ম্যাগি তৃতীয় হন। তাঁর সময় ছিল ২ ঘণ্টা ১৭ মিনিট ১৮ দশমিক ২ সেকেন্ড। আর প্রতিযোগিতার অন্যতম ফেবারিট সের্গেই পোপভ হন পঞ্চম।

১৯৬০ সালের অলিম্পিক ম্যারাথনে জয়ের পর আবেবে বিকিলাকে ‘স্টার অব ইথিওপিয়া’ পদক দিচ্ছেন সম্রাট হাইলে সেলাসি

যে জায়গায় গতি বাড়ালেন, সেখানেও ইতিহাস

বিকিলা যে জায়গায় রাদিকে পেছনে ফেলে গতি বাড়িয়েছিলেন, সেই জায়গাটিরও আলাদা ইতিহাস ছিল। পিয়াজা দি পোর্তা কাপেনার কাছে তখন দাঁড়িয়ে ছিল ইথিওপিয়ার প্রাচীন আকসুম নগরী থেকে নিয়ে আসা একটি ওবেলিস্ক। এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল ইথিওপিয়ার বেদনাদায়ক ইতিহাস।

বেনিতো মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট ইতালি ১৯৩৫ সালে ইথিওপিয়া আক্রমণ করে। পরের বছর ইতালীয় বাহিনী আদ্দিস আবাবা দখল করে। ইতালির দখলদারত্বের সময় আকসুমের প্রাচীন একটি ওবেলিস্ক খুলে রোমে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে সেটি পোর্তা কাপেনার কাছে স্থাপন করা হয়েছিল।

দুই দশকের কিছু বেশি সময় পর সেই ওবেলিস্কের পাশ দিয়েই ছুটে গেলেন একজন ইথিওপীয়। আর ঠিক সেই এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বীকে পেছনে ফেলে অলিম্পিক সোনার দিকে এগিয়ে গেলেন বিকিলা।

এই ঘটনাকে তাই পরে শুধু ক্রীড়ার দৃষ্টিতে দেখা হয়নি। এর সঙ্গে ইথিওপিয়ার ইতিহাসও যুক্ত হয়ে যায়। যে দেশের সেনাবাহিনী ইথিওপিয়া দখল করেছিল, সেই দেশের রাজধানীতে দাঁড়িয়ে একজন ইথিওপীয় অলিম্পিকের সবচেয়ে কঠিন ইভেন্টগুলোর একটি জিতলেন। যে ওবেলিস্ক বিজয়ের স্মারক হিসেবে ইথিওপিয়া থেকে রোমে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তার পাশ দিয়েই তিনি সোনার পথে শেষ আক্রমণটি করলেন।

আফ্রিকার বছর, আফ্রিকার জয়

সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬০ সাল বিশ্ব ইতিহাসে ‘আফ্রিকার বছর’ হিসেবে পরিচিত। ওই বছর ১৭টি আফ্রিকান দেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। ঔপনিবেশিক শাসন ভেঙে আফ্রিকার রাজনৈতিক মানচিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। ঠিক সেই সময় বিশ্ব ক্রীড়ার সবচেয়ে বড় মঞ্চে আবির্ভূত হলেন আবেবে বিকিলা।

তাঁর আগে আফ্রিকার অ্যাথলেটরা অলিম্পিকে অংশ নিয়েছেন, পদকও জিতেছেন। কিন্তু বিকিলাই ছিলেন আফ্রিকার কোনো দেশের হয়ে অলিম্পিক সোনা জেতা প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ অ্যাথলেট। ফলে তাঁর সাফল্যের তাৎপর্য ইথিওপিয়ার সীমা ছাড়িয়ে যায়।

বিশ্ব অ্যাথলেটিকসে তখনো পূর্ব আফ্রিকার বর্তমান আধিপত্য শুরু হয়নি। এখন ইথিওপিয়া বা কেনিয়ার দৌড়বিদদের ম্যারাথন কিংবা পাঁচ ও দশ হাজার মিটারে ফেবারিট হিসেবে দেখা স্বাভাবিক। ১৯৬০ সালে পরিস্থিতি এমন ছিল না। বিকিলা সেই ধারণা বদলে দেওয়ার প্রথম বড় নাম।

১৯৬৪ সালের টোকিও অলিম্পিকে ম্যারাথনে দৌড়াচ্ছেন আবেবে বিকিলা

চার বছর পর আরও বড় বিস্ময়

চার বছর পর তিনি দেখিয়ে দেন, রোমের সাফল্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। ১৯৬৪ সালের অলিম্পিক হয়েছিল টোকিওতে। সেখানে বিকিলা গেলেন বর্তমান অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন হিসেবে। কিন্তু প্রতিযোগিতার মাত্র ৪০ দিন আগে তাঁর অ্যাপেন্ডিক্সে অস্ত্রোপচার হয়। ফলে তিনি ম্যারাথনে নামতে পারবেন কি না, তা নিয়েই সংশয় তৈরি হয়েছিল।

শেষ পর্যন্ত তিনি নামলেন। এবার অবশ্য খালি পায়ে নয়। জুতা পরে দৌড়ালেন।

১৫ কিলোমিটারের পর গতি বাড়াতে শুরু করেন বিকিলা। এরপর একসময় অন্য সবাইকে পেছনে ফেলে একাই সামনে চলে যান। রোমের মতো শেষ ৫০০ মিটার পর্যন্ত তাঁকে অপেক্ষা করতে হয়নি।

টোকিওর অলিম্পিক স্টেডিয়ামে যখন তিনি ঢুকলেন, নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী তখন অনেক পেছনে। বিকিলা ম্যারাথন শেষ করেন ২ ঘণ্টা ১২ মিনিট ১১ দশমিক ২ সেকেন্ডে। আবারও বিশ্বসেরা সময়। দ্বিতীয় হওয়া ব্রিটেনের ব্যাসিল হিটলির সময় ছিল ২ ঘণ্টা ১৬ মিনিট ১৯ দশমিক ২ সেকেন্ড। অর্থাৎ চার মিনিটের বেশি ব্যবধানে জিতেছিলেন বিকিলা।

টোকিওর জয় তাঁকে আরও একটি ইতিহাসের মালিক করে। তিনিই প্রথম পুরুষ দৌড়বিদ, যিনি অলিম্পিক ম্যারাথনে পরপর দুই আসরে সোনা জেতেন।

১৩ ম্যারাথনের ১২টিতেই জয়

১৯৬০ থেকে ১৯৬৬ সালের মধ্যে বিকিলা যে ১৩টি ম্যারাথন শেষ করেছিলেন, তার ১২টিতেই জিতেছিলেন। একমাত্র হার ১৯৬৩ সালের বোস্টন ম্যারাথনে। সেখানে তিনি পঞ্চম হয়েছিলেন।

১৯৬৮ সালে মেক্সিকো সিটি অলিম্পিকে আবার নামেন বিকিলা। লক্ষ্য ছিল টানা তৃতীয় সোনা। কিন্তু এবার শরীর সঙ্গ দেয়নি। পায়ের সমস্যা নিয়ে দৌড় শুরু করেছিলেন। প্রায় ১৭ কিলোমিটার যাওয়ার পর প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়াতে হয়।

তবে ম্যারাথনের সোনা ইথিওপিয়ার হাতছাড়া হয়নি। বিকিলার স্বদেশি মামো ওলদে সেবার চ্যাম্পিয়ন হন।

এরপর পূর্ব আফ্রিকার উত্থান

এরপর বিশ্ব দূরপাল্লার দৌড়ে পূর্ব আফ্রিকার উত্থান আর থামেনি। ইথিওপিয়া ও কেনিয়া হয়ে ওঠে এই খেলার দুই বড় শক্তি। পরের কয়েক দশকে এই অঞ্চল থেকে এসেছেন কিপ কেইনো, মিরুটস ইফটার, হাইলে গেব্রেসেলাসি, পল টারগাট, কেনেনিসা বেকেলে, তিরুনেশ দিবাবা ও এলিউড কিপচোগের মতো দৌড়বিদেরা।

বিশ্ব অ্যাথলেটিকসও বিকিলার রোমের জয়কে পরবর্তী পূর্ব আফ্রিকান দূরপাল্লার দৌড়ের উত্থানের পথ দেখানো ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করে।

১৯৬৮ সালে আবেবে বিকিলা

জীবনের শেষ লড়াই

তবে বিকিলার নিজের জীবনের শেষ অংশ ছিল কঠিন। ১৯৬৯ সালে গাড়ি দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন তিনি। তাঁর ঘাড় ও মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাত লাগে। চিকিৎসার পর অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও তিনি আর স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারেননি।

তারপরও খেলাধুলা ছাড়েননি। হুইলচেয়ারে বসে তিরন্দাজিসহ বিভিন্ন খেলায় অংশ নেন। ১৯৬৯ সালের স্টোক ম্যান্ডেভিল গেমসেও অংশ নিয়েছিলেন তিনি। প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদদের এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা পরবর্তী সময়ে প্যারালিম্পিক আন্দোলনের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১৯৭৩ সালের ২৫ অক্টোবর মারা যান আবেবে বিকিলা। বয়স হয়েছিল মাত্র ৪১ বছর। গাড়ি দুর্ঘটনার আঘাতের পরবর্তী জটিলতার সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর সম্পর্ক ছিল। ইথিওপিয়ায় জাতীয় বীরের মর্যাদা পাওয়া বিকিলার শেষকৃত্যে হাজারো মানুষ অংশ নেন।

যে দৌড় শেষ হয়নি

১৯৬০ সালের রোম অলিম্পিক এমনিতেই ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। সেই আসরে যুক্তরাষ্ট্রের উইলমা রুডলফ তিনটি সোনা জিতেছিলেন। বক্সিংয়ে সোনা জিতেছিলেন ১৮ বছরের ক্যাসিয়াস ক্লে। কয়েক বছর পর যাঁকে বিশ্ব চিনেছে মোহাম্মদ আলী নামে।

তারপরও রোম অলিম্পিকের সবচেয়ে স্মরণীয় ছবিগুলোর একটি হয়ে আছে অন্য একজনের। রাতের রোম। রাস্তার দুই পাশে জ্বলছে মশাল। প্রাচীন শহরের পথ ধরে ছুটছেন রোগা-পাতলা এক ইথিওপীয়। তাঁর পায়ে জুতা নেই। তাঁর সেই দৌড়ের প্রভাব সেখানেই শেষ হয়নি।

আজ বিশ্ব ম্যারাথন বা দূরপাল্লার দৌড়ের ইতিহাস লিখতে গেলে ইথিওপিয়া ও কেনিয়াকে বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। রোমের মশালের আলোয় খালি পায়ে ছুটে যিনি শুধু একটি অলিম্পিক সোনা জেতেননি, বিশ্বকে প্রথম বড় করে দেখিয়েছিলেন আফ্রিকার দূরপাল্লার দৌড়ের শক্তি।

তথ্যসূত্র:

১. ‘রিমেম্বারিং বিকিলাস ১৯৬০ অলিম্পিক ম্যারাথন ভিক্টরি অন ইটস ৬০থ অ্যানিভার্সারি’ স্টিভ ল্যান্ডেলস, ওয়ার্ল্ড অ্যাথলেটিকস, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২০।

২. ‘হল অব ফেম প্রোফাইল—আবেবে বিকিলা (ইথিওপিয়া)’ওয়ার্ল্ড অ্যাথলেটিকস, ৮ মার্চ ২০১২।

৩. ‘অ্যান অলমোস্ট মিস্টিক্যাল এক্সপেরিয়েন্স—৬০ ইয়ার্স সিন্স বিকিলা কমপ্লিটেড ব্যাক-টু-ব্যাক অলিম্পিক ভিক্টরিজ’ ওয়ার্ল্ড অ্যাথলেটিকস হেরিটেজ, ২১ অক্টোবর ২০২৪।