
পুলিশি রাষ্ট্র মানে জনগণের স্বাধীনতার ওপর কঠোর আঘাত। পুলিশি রাষ্ট্রে নাগরিকের ব্যক্তিস্বাধীনতার জলাঞ্জলি আর কঠোর নিয়ন্ত্রণ। আধুনিক প্রযুক্তি রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতে জনগণকে কঠোর নিয়ন্ত্রণ করার নানা সুবিধা তুলে দিয়েছে। এসব সুবিধা নিয়ে প্রযুক্তির সাহায্যে আস্ত দেশটাকে পুলিশি রাষ্ট্র বানিয়ে ছাড়ছে রাষ্ট্রযন্ত্র। উদাহরণ দেওয়া যায় চীনের জিনজিয়াংকে। সেখানকার সংখ্যালঘু উইঘুর সম্প্রদায়ের ওপর প্রযুক্তি ব্যবহার করে কঠোর নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। রাষ্ট্রযন্ত্র কীভাবে প্রযুক্তির সাহায্যে আস্ত দেশটাকে পুলিশি রাষ্ট্র বানিয়ে ছাড়ছে, তা নিয়ে এ লেখার দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব আজ:
চীনের জিনজিয়াং প্রদেশে উইঘুরদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থানে রয়েছে চীন। সেখানে প্রযুক্তি ব্যবহার করে যে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা গেছে, তা কিন্তু চীনের অন্যান্য প্রদেশে প্রয়োগ করা কঠিন। এর কারণ হচ্ছে এখানকার উইঘুর সম্প্রদায়কে পুরো জনগণের তুলনায় সহজে আলাদা করা যায়—এমন চাপ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ। এর ফলেই সেখানে কঠোর পুলিশি রাষ্ট্র করতে পেরেছে চীন। কিন্তু আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে চীনের এই ব্যাপক নজরদারির মডেলটিই এখন অনেক স্বৈরশাসকের পছন্দের বিষয় হয়ে উঠতে পারে। রাশিয়া থেকে রুয়ান্ডা কিংবা তুরস্কে এর প্রয়োগ দেখা দিতে পারে। তারা প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যার কিনে ব্যাপক নজরদারি শুরু করতে পারে। স্বৈরশাসকের পক্ষে ব্যাপক নজরদারি করা সম্ভব হলেও উদারতান্ত্রিক দেশগুলোতে এ মাত্রায় নজরদারি কঠিন হবে বলে ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ডিজিটাল নজরদারির বিষয়টি মানুষকে প্রথম হতবাক করেছিল ১৯৮৯ সালে পূর্ব জার্মানি ভেঙে যাওয়ার সময়েই। ওই সময় জার্মানির নিরাপত্তার সংস্থা স্ট্যাসির জোগাড় করা তথ্যের পরিমাণ দেখে মানুষ থ বনে গিয়েছিল। এরপর থেকে ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহের বিষয়টি নজরদারিতে রূপান্তরিত হয়েছে। তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের বিষয়টি ব্যাপক আকারে বেড়ে গেছে। স্ট্যাসি যা করত, তার তুলনায় এখনকার স্বৈরশাসকেরা আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।
ডিজিটাল নজরদারির ক্ষেত্রে শুধু চীন নয়, পশ্চিমাদেরও অবস্থান স্বচ্ছ নয়। তাদের নিজের দিকটা দেখা উচিত। পশ্চিমা দেশগুলোর গোয়েন্দা সংস্থা বা পুলিশ বাহিনীর হাতে স্ট্যাসির চেয়েও বিশাল তথ্যভান্ডার আছে। এখনকার কর্মকর্তারা চাইলে মানুষের যোগাযোগসংক্রান্ত সব তথ্য হাতে পেয়ে যান। মানুষ কোথায় যায়, কী করে, সব তাদের নখদর্পণেই থাকে। প্রশ্ন উঠছে এত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমান সফটওয়্যারগুলোর ব্যবহার নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে ‘আইজেওপি’র মতোই অপরাধী শনাক্তকরণ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ হচ্ছে। এতে সম্ভাব্য অপরাধী সম্পর্কে যেমন ধারণা করা যায়, তেমনই এটি অপব্যবহারের আশঙ্কাও আছে। কারণ, শত শত মার্কিন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে স্পর্শকাতর তথ্য হাতিয়ে অনৈতিক কাজের অভিযোগ রয়েছে।
চীনের দিকে দৃষ্টি ফেরালে দেখা যাবে, সবচেয়ে বেশি নজরদারি আর হয়রানির শিকার উইঘুর সম্প্রদায়ের মানুষ। ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড্যারেন বাইলার উইঘুর সম্প্রদায় নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি হাসান নামের এক উইঘুর যুবকের বক্তব্য রেকর্ড করেন। হাসান বলেন, ২০১৫ সালে তাঁর বয়স ছিল ২৩। চীনের সামাজিক মেসেজিং গ্রুপ উইচ্যাটে একটি ধর্মীয় বিষয় শেয়ার করেছিলেন তিনি। জিনজিয়াংয়ের ইয়ারকান্ড নামের একটি শহরে জন্ম তাঁর। পরে তিনি কাজের জন্য প্রাদেশিক রাজধানী উরুমচিতে চলে যান এবং ইসলাম নিয়ে আরও জানার চেষ্টা করেন। তিনি ধর্মভীরু যুবক। স্ত্রী ও শিশুকন্যাকে নিয়ে ছিল তাঁর সংসার। তিনি নাচ ও অমানবিক আচরণ সমর্থন করতেন না।
২০১৫ সালের ডিসেম্বরে প্রাদেশিক সরকারের পক্ষ থেকে সবাইকে স্থায়ী ঠিকানা থেকে নতুন পরিচয়পত্র সংগ্রহ করতে বলা হয়। হাসান বলেন, তাঁকে জোর করেই ফেরত পাঠানো হয়। ইয়ারকান্ডের পুলিশ তাঁকে ডেকে নেয়। তার বাবা-মাকে ডেকে পাঠায়। পরে পরিবারসহ একটি বাসে রওনা দেন তাঁরা। পথে বাসের সঙ্গে ট্রাকের সংঘর্ষে স্ত্রী ও কন্যাকে হারান তিনি। নিজে মারাত্মক আহত হন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ কখনো আর তাঁকে উরুমচিতে ফিরতে দেয়নি। স্ত্রী, কন্যার সঙ্গে স্বাধীনতাও হারান তিনি। দুর্ঘটনার কিছুদিন পরেই তাঁকে অনির্দিষ্ট কালের জন্য ‘পুনঃশিক্ষা ক্যাম্প’ বা বিশেষ শিবিরে রাখা হয়। তাঁর আত্মীয়রা জানেন, কোনো এক ক্যাম্পে তিনি আছেন।
লাখো ইউঘুর যুবকের কাহিনি হাসানের সঙ্গে মিলে যাবে। তুর্কি ভাষায় কথা বলা ইউঘুর সম্প্রদায়ের মানুষ জিনজিয়াং থেকে এভাবেই গায়েব হয়ে যান। তাঁদের পাঠানো হয় বহুদূরের কোনো এক ক্যাম্পে। এ ক্যাম্পগুলো মূলত ‘রি-এডুকেশন ক্যাম্প’ নামে পরিচিত। চীন সরকার এ রকম শত শত অজ্ঞাত রি-এডুকেশন ক্যাম্প তৈরি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব ক্যাম্পে মানবাধিকারহীন জীবন যাপন করতে হয় উইঘুরদের। তাদের কেন সেখানে পাঠানো হয়, উইঘুররা তা জানতেও পারে না। ওই ক্যাম্প থেকে মুক্তি পাওয়া একজনের অভিযোগ, ‘যতক্ষণ না পর্যন্ত চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংকে ধন্যবাদ জানানো হয়, ততক্ষণ খাবার পান না কেউ।’
উইঘুরদের বড় শহর কাশঘারে এ রকম চারটি বড় ক্যাম্প রয়েছে। ২০১৭ সাল থেকে ওই শহরের ক্যাম্পগুলোতে ১ লাখ ২০ হাজার জনকে ধরে এনে রাখা হয়েছে। কোরলা শহরের ক্যাম্পগুলোও এতটাই ভরে গেছে যে নিরাপত্তা কর্মকর্তারা সেখানে আর কাউকে না পুলিশকে নিষেধ করছেন। ফলে আরও নতুন নতুন ক্যাম্প তৈরি করতে হচ্ছে দেশটিতে। তবে, এ ধরনের কোনো ক্যাম্পের কথা স্বীকার করে না চীনের কর্তৃপক্ষ।
চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের চেয়ে ইয়ারকান্ড বাগদাদের বেশি কাছে। কিন্তু জিনজিয়াংয়ের এ অঞ্চল চীনের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এ অঞ্চল চীনের বৃহত্তম তেল ও গ্যাস উৎপাদন অঞ্চল। এ ছাড়া এটি চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের অংশ। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, এটি উইঘুরদের আবাসস্থল, সেটির মর্যাদা দিতে নারাজ রাষ্ট্রযন্ত্র।
চীনের এ প্রদেশটি প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেলে পূর্ণ হওয়ায় চীনা সরকার কিছুতেই তা হাতছাড়া করতে নারাজ। কিন্তু এ অঞ্চলে হাজার বছর ধরে বসবাস করে আসা মুসলমানদের মৌলিক অধিকার পূরণ করতেও তারা রাজি নয়। এমনকি তেল-গ্যাসসমৃদ্ধ ভূমিটুকুর নিরঙ্কুশ মালিকানা মজবুত করে রাখতে হাজার বছর ধরে এ এলাকায় বসবাস করে আসা উইঘুর মুসলিমদের বিভিন্ন কৌশলে তাদের বাপ-দাদার ভিটা থেকে উচ্ছেদ করে সেখানে চীনা ‘হান’দের প্রতিষ্ঠিত করছে। যেখানে ১৯৪৯ সালেও জিংজিয়াংয়ের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৫ শতাংশ ছিল ‘হান’ আর ৯৫ শতাংশই ছিল উইঘুর মুসলিম, সেখানে চীন কর্তৃক উইঘুর দখলের পর অন্যান্য স্থান থেকে ‘হান’দের এখানে এনে থাকতে দেওয়ায় এবং উইঘুর মুসলিমদের বাপ-দাদার ভিটা ছেড়ে অন্যত্র যেতে বাধ্য করায় সেখানে বর্তমানে প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে ‘হান’দের সংখ্যা।
উইঘুরদের সহিংসতার ইতিহাস শুরু ২০০৯ সালে। ৫ জুলাই উরুমচিতে মুসলিম উইঘুর ও হান চীনাদের মধ্যে দাঙ্গার সূত্রপাত হয়। এতে চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে বেশ কিছু উইঘুর মানুষ নিহত হন। কিছু সন্ত্রাসী ঘটনা শাসক যন্ত্রের দমনমূলক প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। ২০১৬ সালে চেন কুয়ানগো নতুন দলের প্রধান হিসেবে উঠে আসেন। প্রাদেশিক সরকার অর্থ খরচ করে আরও নিয়ন্ত্রণ বাড়ায়। এটি এখন পুরোপুরি পুলিশি রাজ্য। তাই সবচেয়ে বেশি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো ঘটেছে এখন।
চীন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, জিনজিয়াংয়ে সবার জন্য নিরাপত্তাব্যবস্থা সমান। তবে সেখানকার বাস্তবতা ভিন্ন। সেখানে বর্ণবাদী আচরণের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশিটির দক্ষিণ পশ্চিমে যেখানে উইঘুরদের বাস সেখানে নিরাপত্তার সরঞ্জাম বেশি স্থাপন করা হয়েছে। তুলনামূলকভাবে হানদের বসবাস করা শিহেজিতে পুলিশি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এতটা কঠোর নয়।
চীনের কমিউনিস্ট শাসকেরা মনে করেন, তাঁদের নিয়ন্ত্রিত পুলিশি রাষ্ট্রব্যবস্থায় মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ দূর হয়েছে এবং সহিংসতা কমিয়েছে। ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর বাস্তবচিত্র উল্টো। বাস্তবে তা হান ও উইঘুরদের মধ্যে মধ্যে বিভক্তি টেনে এবং একদিকে বেশি খরচ করে উত্তেজনা আরও বাড়ানো হয়েছে। এতে দুই পক্ষ আরও বেশি সহিংসতায় জড়াচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন উইঘুর জনগণ।
প্রশ্ন হচ্ছে স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য রাখা যাবে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল দুনিয়াতে প্রাইভেসি থাকতে হবে। উদারপন্থী গণতন্ত্রের মতো উল্লেখযোগ্য কারণ ছাড়া নজরদারি করা যাবে না। স্মার্টফোনের ক্ষেত্রেও এনক্রিপশন থাকবে, যাতে কেউ ব্যক্তিগত তথ্যে উঁকি দিতে না পারে। জনগণের তথ্যে কেউ অনুমতি ছাড়া সংগ্রহ করলে তার জন্য শাস্তির বিধান রাখতে হবে। এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারের ওপরেও নজরদারি করতে হবে। সফটওয়্যারের মাধ্যমে অপরাধী সম্পর্কে আগাম পূর্বাভাসের যে পুলিশি পদ্ধতি আছে, তা নিখুঁত নয়। এর ওপর ভরসা না করে প্রকৃত অপরাধীকে খুঁজে বের করতে হবে। নজরদারির ক্ষেত্রে সতর্কতা এবং স্বচ্ছতা অবশ্যই রাখতে হবে।
২০১৫ সালে উইচ্যাটে উইঘুর যুবক হাসান লিখেছিলেন, ‘উইঘুর হওয়াটা কঠিন। আমি কোনো অভিযোগে অভিযুক্ত তা জানি না। কিন্তু তাদের বিচার মানতে হবে। এ ছাড়া কোনো পথ খোলা নেই। যেখানে স্বাধীনতা নেই, সেখানে দুশ্চিন্তা। যেখানে দুশ্চিন্তা, সেখানেই কোনো ঘটনা। যেখানে ঘটনা সেখানেই পুলিশ। আর যেখানে পুলিশ, সেখানেই পরাধীনতা।’
প্রথম পর্বের লিংক: উইঘুরদের জিনজিয়াংকে পুলিশি রাষ্ট্র বানানোর অভিযোগ