করোনার দিনগুলোতে বিয়ে...

সম্প্রতি ফিলিপাইনে আয়োজিত গণবিয়েতে করোনাভাইরাসের কারণে মুখে মাস্ক পরে একে অপরকে চুম্বন করেন বর-কনে। ছবি: রয়টার্স
সম্প্রতি ফিলিপাইনে আয়োজিত গণবিয়েতে করোনাভাইরাসের কারণে মুখে মাস্ক পরে একে অপরকে চুম্বন করেন বর-কনে। ছবি: রয়টার্স

কথা পাকাপাকি। দিনক্ষণও চূড়ান্ত। বর-কনের কেনাকাটা শেষ। নির্দিষ্ট দিনে সাজবেন তাঁরা। রাঙা মাথায় চিরুনি দেওয়া শেষে বরের অপেক্ষায় থাকবেন কনে। চারদিকে বাজবে বিয়ের বাদ্য। আসবে অতিথিরাও। কিন্তু না, ওই কেনাকাটা পর্যন্তই থেমে যেতে হয়েছে তাঁদের। বর-কনে সাজা ও বিয়ের বাদ্য বাজা এখন অনেকটাই অনিশ্চিত।

এত আয়োজনের বিয়ে হঠাৎ করে বন্ধ হচ্ছে কেন? কারণ করোনাভাইরাস। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবেই বিয়ের ঠিক আগ মুহূর্তে এমন সিদ্ধান্ত বর-কনে ও তাঁদের পরিবারের।

বিবিসি অনলাইনের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাজ্যে থাকা হোলি ইয়াসন ও তাঁর বাগ্‌দত্তা মাসাকাজু ইয়ামামোতো; আসছে এপ্রিলেই তাঁরা বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সেরে ফেলবেন বলে ঠিক করেছেন। অনুষ্ঠান হবে জন্ম শহর জাপানের টোকিওতে। কিন্তু সারা বিশ্বে যেভাবে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে আর মৃতের সংখ্যা বাড়ছে—তাতে তাঁরা আপাতত এই বিয়ে বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

হোলি ইয়াসন পেশায় শিক্ষক। তিনি এই করোনার দিনগুলোতে বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজন করে অতিথিদের অযথা ঝুঁকিতে ফেলতে চাননি। তিনি বলেন, ‘যদি আমাদের অনুষ্ঠানে এসে কোনো অতিথি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে পড়েন, তাহলে আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না। এ ছাড়া পরিস্থিতি এমন থাকলে ওই সময় আমার বাবা ও ভাই জাপানে ঢুকতে পারবেন না। এই চিন্তাও আছে। এই পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে, তা আমরা ঠিক বলতে পারছি না। এ কারণে হতাশ লাগছে। তবে সবার আগে নিরাপত্তার দিকটি নিয়েই ভাবতে হবে।’

গত বছরের ডিসেম্বরে চীন থেকে করোনাভাইরাসের উৎপত্তি। কিন্তু তা এখন বৈশ্বিক মহামারিতে রূপ নিয়েছে। দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এই ভাইরাস। এর কারণে বিভিন্ন দেশ সীমান্ত বন্ধ করে দিচ্ছে, ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করছে। এসব কারণেই বাধ্য হয়ে হোলি ইয়াসন ও মাসাকাজু ইয়ামামোতোর পরিবার এই বিয়ে আপাতত বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বিয়ের অনুষ্ঠান হবে কিনা তা নিয়ে সংশয়ে আছেন সাভান নাথবানি ও রিশা মোদি। ছবি: বিবিসি থেকে নেওয়া

হোলি ইয়াসনের বাবা মাইক বলেন, ‘আমার নিজের বয়স ৬০ পেরিয়েছে। এ কারণে মেয়ে আমাকে নিয়ে ভয় করছে। তাই বিয়ে স্থগিতের সিদ্ধান্ত। তবে এ কারণে খরচ হওয়া অর্থ উদ্ধারে দুই পরিবারকেই বেগ পেতে হবে। সব অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে না। ফ্লাইট ও হোটেল খরচ ফেরত পাওয়া যাবে না।’

সাভান নাথবানি ও রিশা মোদির পরিকল্পনা ছিল জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় দিন বিয়ের অনুষ্ঠানটি করবেন ইতালিতে। রিশা থাকেন লন্ডনে। কিন্তু ইতালিতে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় অবস্থা ভয়াবহ হয়েছে। সেখানেও সবকিছু বন্ধ হয়ে গেছে। তাই এই বিয়ের অনুষ্ঠান হবে কিনা, তা নিয়ে সাভান ও রিশা চিন্তায় পড়ে গেছেন।

রিশা বলেন, ‘ছয় মাস আগে থেকেই আমরা বিয়ের অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করেছি। অর্থ রোজগারে দুজনে অনেক পরিশ্রম করেছি। আমাদের বিয়েতে সারা বিশ্ব থেকে শিশু ও বৃদ্ধসহ ১৫০ জন অতিথি আসার কথা। কিন্তু তাঁরা সবাই এই মুহূর্তে ভ্রমণ করতে ভয় পাচ্ছেন। এ ছাড়া নানা দেশ ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞাও জারি করেছে।’

লরেন মাইটল্যান্ড ও শার্লট আর্মিতেজের কেবল আংটি বদল হয়েছে। আসছে মে মাসে তাঁদের বিয়ের অনুষ্ঠান হওয়ার কথা। ভেন্যু ঠিক করাই আছে, ইয়র্কশায়ারের দ্য হুইটবি অ্যাবেতে। কিন্তু তাঁরাও পড়েছেন মহা ফ্যাসাদে। এই করোনার কালে আদৌ সেই অনুষ্ঠান করতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে সংশয়ে তাঁরা।

বিয়ের অনুষ্ঠান বাতিল করায় অনেক ভেন্যুই ফাঁকা পড়ে আছে। ছবি: সংগৃহীত

লরেন মাইটল্যান্ড বলেন, ‘সম্প্রতি আমার মায়ের অস্ত্রোপচার হয়েছে। সেরে উঠছেন তিনি। আমার দাদার বয়স ৯০। শার্লটেরও একই দশা। এই অবস্থায় বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজন করে জনসমাগম করা ঠিক হবে না। অনেক মানুষ নিজেই কোয়ারেন্টিনে আছে। এ ছাড়া আমাদের বন্ধু ও পরিবারের অনেক সদস্য অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, জার্মানি ও আমেরিকা থেকে আসবেন। কিন্তু এ সময় ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে অনেক দেশ। তাই তাঁরাও সাহস পাচ্ছেন না বিয়ের অনুষ্ঠানে আসতে। বাধ্য হয়ে হয়তো বিয়ে বাতিল করতে হবে।’

লরেন ও শার্লট ফ্লোরিডায় মধুচন্দ্রিমার ১০ দিনের জন্য রয়্যাল ক্যারিবিয়ান ক্রুজ বুক করে রেখেছেন। লরেন বলেন, করোনার কারণে বর্তমান সময়ে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা, পার্ক বন্ধ ও ক্রুজ বাতিল করা হয়েছে। এ কারণে আমরা বেশ উদ্বিগ্ন। তবে এসবের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো নিরাপত্তা। পরিবার, বন্ধু ও স্বজনেরা যেন সুস্থ থাকে, সেটাই আগে ভাবতে হবে। এই ভাবনা থেকে হয়তো বিয়ের অনুষ্ঠান ও মধুচন্দ্রিমার পরিকল্পনা বাতিল করতে হবে।

লন্ডনের আরেক যুগল এলিশা দেওল ও রনক শাহ। তাঁদের বিয়ের অনুষ্ঠানের আর কয়েক সপ্তাহ বাকি। তাঁদের বিয়ে হবে হিন্দু রীতিতে। আগামী মাসে বিয়ের জন্য পটার্স বারে ওশওয়াল সেন্টার বুক করা হয়ে গেছে। অতিথি সংখ্যা ৫০০। বিয়ের পরদিন রিসেপশন দ্য স্যাভয় হোটেলে। পুরো দুই অনুষ্ঠানের খরচ হবে প্রায় ১ কোটি চার লাখ ৮৪ হাজার ৩৪৭ টাকা।

এলিশা দেওল বলেন, বিয়ে নিয়ে আমাদের নানা পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে করোনাভাইরাসের কারণে সব বাতিল করতে হলো। কারণ আমাদের পরিবারের সদস্য ও অতিথিদের নিরাপত্তাটা আগে দেখতে হবে। এ ছাড়া অনেকেই অন্য দেশ থেকে আসবেন। কিন্তু ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা থাকায় সেটাও সম্ভব হবে না। কানাডা, কেনিয়া ও আমেরিকার অতিথিরা নিজেরাই অনুষ্ঠানের আসার পরিকল্পনা বাতিল করেছেন।

এলিশা দেওল ও রনক শাহ। তাঁদের বিয়ে হবে হিন্দু রীতিতে। আগামী মাসে বিয়ের জন্য খরচ হবে প্রায় ১ কোটি চার লাখ ৮৪ হাজার ৩৪৭ টাকা। ছবি: সংগৃহীত

শুধু যে করোনাভাইরাসের সময় বিয়ে বাতিল বা বন্ধ করতে হচ্ছে তা নয়। এর আগেও ঘটে যাওয়া মহামারির সময় একই ঘটনা ঘটেছিল।

জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব বনের আইজেডএ ইনস্টিটিউট অব লেবার ইকনোমিকসের এক গবেষণা প্রতিবেদনও একই কথা বলছে। গবেষক নিনা বোবার্গের নেতৃত্বে ‘ডিজিজ অ্যান্ড ফার্টিলিটি: এভিডেন্স ফ্রম দ্য ১৯১৮ ইনফ্লুয়েঞ্জা প্যানডেমিক ইন সুইডেন’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯১৮ সালে স্প্যানিশ ফ্লুতে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হয়। এই স্প্যানিশ ফ্লুকে বৈশ্বিক মহামারি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল।

ওই গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ১৯১৮ থেকে ১৯ সাল পর্যন্ত সন্তান জন্মের হার ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। রোগের প্রকোপ মানুষকে সে সময় সন্তান জন্মদানে নিরুৎসাহিত করেছে। এমনকি বিয়েতেও সে সময় মানুষ নিরুৎসাহিত হয়েছিল। এ কারণে ওই বছরে সন্তান জন্মের হার ব্যাপক কমে যায়। শঙ্কা কাটার পর ১৯২০ সালে জন্মহারে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটে।

বিয়ে কেন্দ্র করে নিউইয়র্কভিত্তিক প্রায় এক লাখ ইভেন্ট প্ল্যানার ক্ষতির মুখে পড়েছে। ছবি: সংগৃহীত

এবিসি নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনাভাইরাস বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ায় শুধু ব্যক্তি ও পারিবারিকভাবে বিয়ে বাতিল করতে হচ্ছে, তা কিন্তু নয়। বরং এই ভাইরাসের কারণে সারা বিশ্বে বিয়েকে কেন্দ্র করে বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ক্ষতির মুখে পড়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

নিউইয়র্ক টাইমস–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিয়ে কেন্দ্র করে নিউইয়র্কভিত্তিক প্রায় এক লাখ ইভেন্ট প্ল্যানার ক্ষতির মুখে পড়েছে। কারণ এই প্রতিষ্ঠানগুলো বর-কনের বেশির ভাগ পোশাক চীন থেকে নিয়ে আসে। এ ছাড়া গন্তব্য বিয়ে ও মধুচন্দ্রিমার জন্য তারা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে দেয়। করোনাভাইরাসের কারণে গ্রাহকেরা এখন এসব বাতিল করছেন। আর বিপদে পড়ছেন এ সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

জোয়ান গ্রেগলি নামের একজন ইভেন্ট প্ল্যানার বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে এখন সবাই বিয়ের সব ধরনের অনুষ্ঠান একেবারে বাতিল করে দিচ্ছেন। কিন্তু আমরা অনুরোধ করছি, পরিস্থিতি বিবেচনায় অনুষ্ঠান বাতিল না করে আপাতত স্থগিত করুন। কিন্তু সত্য এই যে, বিয়ের জন্য বিমা এই বৈশ্বিক মহামারিতে কার্যকর হবে না।’

জোয়ান গ্রেগলি বলেন, বর-কনে যদি অনুষ্ঠান স্থগিত করেন, তাহলে তাঁরা কেবল ডিপোজিট অর্থ হারাবেন। কিন্তু ঠিক করা অনুষ্ঠান একেবারে বাতিল করে দিলে কোনো অর্থই আর ফেরত পাবেন না।

করোনাভাইরাসের কারণে হোলি ইয়াসন ও মাসাকাজু ইয়ামামোতোর পরিবার এই বিয়ে আপাতত বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ছবি: বিবিসি থেকে নেওয়া

আমেরিকার ব্রাইডাল অ্যান্ড প্রম ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ও মনচেরি ব্রাইডালের প্রধান নির্বাহী স্টিভ ল্যাং বলেন, প্ল্যানিং বিয়েতে বর-কনের ৮০ শতাংশের পোশাক চীন থেকে আনা হয়। সেটা এই সময় আর সম্ভব হচ্ছে না। সঠিক সময়ে অর্ডার করেও অনেক পোশাক এখনো আসেনি। তবে ভিয়েতনাম ও মিয়ানমারে একই পোশাক পাওয়া গেলেও নানা নিষেধাজ্ঞায় তা আনা যাচ্ছে না। করোনাভাইরাসের কারণে শুধু এমন ব্যবসায়ীরাই নন, বিশ্বের পুরো স্টক মার্কেটে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।