
বিশ্বশান্তির নতুন মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেদের অবস্থান গড়ে তুলতে জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে পাকিস্তান। একদিকে তারা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মতপার্থক্য কমানোর চেষ্টা চালাচ্ছে, অন্যদিকে নিজেদের কূটনৈতিক অবস্থান নতুনভাবে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে বিনিয়োগ আকর্ষণেও তারা সচেষ্ট।
ইরান যুদ্ধ বন্ধে পাকিস্তানি কর্মকর্তারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তেহরানের কট্টরপন্থী গোষ্ঠীর মধ্যে মধ্যস্থতা করছেন। চলতি সপ্তাহে ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফা আলোচনায় বসার মতো উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে দুই পক্ষকে রাজি করানোর জন্য গতকাল সোমবার পাকিস্তানের কর্মকর্তারা চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিল হরমুজ প্রণালিতে চলমান অচলাবস্থা কিছুটা শিথিল করা।
পাকিস্তান এ বিষয়ে আশাবাদী। তাদের ধারণা, ইরানের পক্ষ থেকে জানানো আপত্তি কিংবা ট্রাম্পের হুমকির বড় অংশই কৌশলগত। সে কারণে প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও বৈঠকটি শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে বলে মনে করছে ইসলামাবাদ। তবে ইসলামাবাদের এই উদ্যোগের গুরুত্ব শুধু আঞ্চলিক শান্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি ইসলামাবাদের নিজস্ব নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে তাতে পাকিস্তানের জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানি করা জ্বালানির ওপর ইসলামাবাদে নির্ভরশীলতাও বড় এক বিবেচ্য বিষয়।
দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘সমস্যা সংকুল’ দেশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে পাকিস্তান। সেখানে ধর্মীয় উগ্রবাদের হুমকি রয়েছে এবং অর্থনীতি প্রায়ই অনিশ্চয়তার মুখে থাকে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বর্তমান সংকটে তুলনামূলক নিরপেক্ষ অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তান নিজেকে ‘দায়িত্বশীল পক্ষ’ হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ নিয়েছে।
এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে গত সপ্তাহে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির তেহরান সফর করেন। তাঁর তিন দিনের এই সফর কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এনে দেয়। লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ রাখতে ১০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাঁর এ সফর ভূমিকা রেখেছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইরানও কিছু সময়ের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে দিয়েছিল। যদিও পরে তা আবার বন্ধ করে দেওয়া হয়।
পাকিস্তানি কর্মকর্তারা আশা করছেন, দুই পক্ষ থেকেই কিছু ছাড় পাওয়া যাবে। এর মধ্যে সবচেয়ে জটিল বিষয় হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। তাঁদের ধারণা, একটি চুক্তি হলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ইসলামাবাদে এসে চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে পারেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে দ্বিতীয় দফার সম্ভাব্য আলোচনাকে ঘিরে গত রোববার থেকেই কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেয় পাকিস্তান। ইসলামাবাদের কেন্দ্রীয় এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয় এবং রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ ছাড়া ওই এলাকার দুটি বড় হোটেল ফাঁকা করে দেওয়া হয় যেন প্রয়োজন হলে সেগুলোতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলকে রাখা যায়।
পাকিস্তান বিশ্বের একমাত্র মুসলিম পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। প্রায় ছয় লাখ সেনাসমৃদ্ধ একটি সেনাবাহিনী থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তান মনে করে আন্তর্জাতিক পরিসরে তারা এখনো তাদের প্রকৃত সক্ষমতার তুলনায় কম প্রভাব বিস্তার করছে। এমন অবস্থায় তারা নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করতে চাইছে। সামরিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে তারা দুর্বল অর্থনীতি ও অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির সীমাবদ্ধতাকে কিছুটা হলেও ভারসাম্যের মধ্যে আনতে চায়।
পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক উদ্যোগের সূচনা ঘটে মূলত গত বছর ইরানের সঙ্গে মধ্যস্থতার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের একজন মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন থেকে। ২০২৫ সালের জুনে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে আকস্মিক বৈঠকের পর পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির এ দায়িত্ব নিয়েছিলেন।
গত বছর ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনের সংঘাত চলাকালে কূটনৈতিক সহায়তা দিয়ে পাকিস্তান তাদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করে। তাদের সে অভিজ্ঞতাটাই বর্তমান মধ্যস্থতায় পাকিস্তানের অবস্থানকে শক্ত করেছে।
ইসলামাবাদের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের প্রধান এবং সাবেক কূটনীতিক আলী সারওয়ার নাকভি বলেন, জেনেভা বা ভিয়েনার মতো ঐতিহ্যবাহী ইউরোপীয় কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্মের ওপর আস্থা রাখে না ইরান।
নাকভির মতে, পাকিস্তান এমন একটি দেশ, যাকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের সবাই বিশ্বাস করে, আবার ইরানও আস্থা রাখে। পাকিস্তান বড় দেশ, তারা পারমাণবিক শক্তিধর এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তান একদিকে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও ভারসাম্যপূর্ণ অংশীদারত্ব ধরে রেখেছে। এ অবস্থান ব্যবহার করেই তারা ইরানকে আলোচনায় আনার ব্যাপারে চীনের কাছ থেকে আশ্বাস আদায় করতে সক্ষম হয়েছে।
সাবেক পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত জামির আকরাম বলেন, ইরানে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে দেশটির স্বার্থ রক্ষায় ওয়াশিংটনে অবস্থিত পাকিস্তানের দূতাবাস ভূমিকা রেখে আসছে। তা ছাড়া ১৯৭১ সালে পাকিস্তান গোপন আলোচনার আয়োজন করেছিল, যা পরবর্তী সময় চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে সহায়ক ভূমিকা রেখেছিল।
জামির আকরাম মনে করেন, পাকিস্তানের বর্তমান ভূমিকাটা আকস্মিক নয়। তাঁর মতে, ‘এখন পাকিস্তানের কাজ হলো দুই পক্ষকে এমনভাবে আস্থা দেওয়া, যেন তারা মনে করে, তারা একটি সম্মানজনক সমাধান নিয়ে বের হতে পারবে।’ তবে এ উচ্চপর্যায়ের কূটনীতির মধ্যেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুর্বলতা স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। ব্যয় কমাতে দেশজুড়ে দৈনিক বিদ্যুৎ–বিভ্রাট চলছে। একই সঙ্গে সৌদি আরব থেকে জরুরি ভিত্তিতে ৩০০ কোটি ডলারের ঋণ নিতে হয়েছে।
তবুও ইসলামাবাদ আশা করছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মর্যাদা বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ তৈরি হবে। তবে এর জন্য অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রয়োজন হবে, যেমন করহার কমানো এবং আইনকানুন আরও শক্তিশালী করা।
হোয়াইট হাউসের সাবেক কর্মকর্তা ও জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জশুয়া হোয়াইট বলেন, ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় আগে থেকেই পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ককে জটিল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তারা বুঝে গিয়েছিল, সেখানে তাদের প্রভাব খাটানোর ক্ষমতা সীমিত।
তবে জশুয়া মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। হোয়াইটের মতে, পাকিস্তান ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে অত্যন্ত কৌশলী এবং অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত আনুগত্যপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে।
জশুয়া বলেন, বর্তমানে ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া অত্যন্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিক। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিজস্ব ধারণা ও প্রবণতা বড় ভূমিকা রাখে। এই সুযোগকে দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়েছে পাকিস্তানের নেতৃত্ব।
দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক পরিচালক এবং সাবেক মার্কিন কূটনীতিক এলিজাবেথ থ্রেলকেল্ড মনে করেন, গত বছর ভারতের সঙ্গে সংঘাতে ভূমিকা, মধ্যপ্রাচ্যে সক্রিয় কূটনৈতিক অবস্থান এবং ট্রাম্পের শান্তি পর্ষদের উদ্যোগে অংশগ্রহণ—এসব কারণে ওয়াশিংটনে পাকিস্তানের প্রভাব বেড়েছে।
এ ছাড়া গত বছর সৌদি আরবের সঙ্গে স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা চুক্তিও পাকিস্তানের অবস্থানকে আরও শক্ত করেছে বলে হোয়াইট উল্লেখ করেন।
থ্রেলকেল্ডের মতে, পাকিস্তান আলোচনার ফলাফল নিয়ে অবাস্তব প্রত্যাশা না করলে এবং কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ছাড়াই বৈঠক আয়োজন করতে পারলেই কেবল দুই পক্ষকে এক টেবিলে আনার সুযোগ তৈরি করেই তারা লাভবান হতে পারে। তাঁর ভাষায়, এ প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের হারানোর কিছু নেই।