
বিবিসি এমন একটি ফাঁস হওয়া অডিও বার্তা হাতে পেয়েছে—যাতে শীর্ষ আফগান তালেবান নেতার সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাটি প্রকাশ পেয়েছে।
ফাঁস হওয়া অডিওটি শুনে বোঝা যাচ্ছে, বহির্বিশ্ব থেকে আসা কোনো হুমকির কারণে তালেবানের শীর্ষ নেতার মধ্যে ওই উদ্বেগ তৈরি হয়নি। বরং আফগানিস্তানের অভ্যন্তরেই সেই সংকট তৈরি হয়েছে।
২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনাদের প্রত্যাহার এবং আগেকার সরকারের পতনের পর দেশটির নিয়ন্ত্রণ নেয় তালেবান।
অডিও বার্তায় তালেবানের শীর্ষ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা সতর্ক করেছেন, দেশ পরিচালনার জন্য তালেবান আফগানিস্তানে যে ‘ইসলামি আমিরাত’ প্রতিষ্ঠা করেছে, সেখানে ‘সরকারের ভেতরের লোকজন’ একে অপরের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। তাঁকে আরও বলতে শোনা যায়, অভ্যন্তরীণ এই মতবিরোধ একসময় তাদের সবাইকে ডুবিয়ে দিতে পারে। এই বিভাজনের ফলে ইসলামি আমিরাত ভেঙে পড়বে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন আখুন্দজাদা।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দক্ষিণাঞ্চলের কান্দাহার শহরের একটি মাদ্রাসায় তালেবান সদস্যদের উদ্দেশে সংগঠনটির শীর্ষ নেতা বক্তৃতাটি দিয়েছিলেন। অডিওটি ফাঁস হওয়ার পর তালেবানের একেবারে শীর্ষ পর্যায়ে মতবিরোধ থাকার গুঞ্জনটি জোরালো হয়ে ওঠে। কয়েক মাস আগে থেকেই এ গুঞ্জন চলছিল।
তবে নিজেদের মধ্যে মতবিরোধ থাকার বিষয়টি তালেবান নেতৃত্ব সব সময়ই অস্বীকার করে এসেছে। বিবিসির প্রশ্নেও তালেবান নেতৃত্ব একই রকমের দাবি করেছিল।
তবে ওই গুঞ্জনকে ভিত্তি করে বিবিসির আফগান সার্ভিস অত্যন্ত গোপনীয়তা বজায় রাখা এই গোষ্ঠীকে নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়েছিল। এক বছরব্যাপী এ অনুসন্ধানের আওতায় ১০০টির বেশি সাক্ষাৎকার নিয়েছে বিবিসি। সাক্ষাৎকার দেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে আছেন তালেবানের বর্তমান ও সাবেক সদস্য, স্থানীয় সূত্র, বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক কূটনীতিকেরা।
বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বিবিসি কারও নাম প্রকাশ করেনি।
এবারই প্রথম বিবিসি তালেবানের একেবারে শীর্ষ পর্যায়ে দুটি বিভক্ত শিবিরকে চিহ্নিত করতে পেরেছে। তারা আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভিন্ন দুই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্বাস করে।
এর একটি অংশ পুরোপুরি আখুন্দজাদার অনুগত। কান্দাহার থেকে উঠে আসা এ আখুন্দজাদা আফগানিস্তানকে কঠোর অনুশাসনের ইসলামি আমিরাতে পরিণত করার লক্ষ্য বাস্তবায়নে এগিয়ে যাচ্ছেন। এটি আধুনিক বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন। সেখানে তাঁর প্রতি অনুগত ধর্মীয় ব্যক্তিরা সমাজের প্রতিটি দিক নিয়ন্ত্রণ করেন।
অন্য অংশটি মূলত রাজধানী কাবুলে অবস্থানরত প্রভাবশালী তালেবান সদস্যদের নিয়ে গঠিত। তাঁরা এমন একটি আফগানিস্তান গড়ার পক্ষে কথা বলেন—যা ইসলামকে কঠোরভাবে অনুসরণ করবে ঠিকই, তবে একই সঙ্গে বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে এবং দেশের অর্থনীতি গড়ে তুলবে।
কাবুলের অংশ চায়, মেয়ে বা নারীদের পড়াশোনার সুযোগ শুধু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখা হোক। বর্তমানে সে সুযোগ থেকে নারীরা বঞ্চিত।
তালেবানের অভ্যন্তরের এক ব্যক্তি এটিকে ‘কান্দাহার শিবির বনাম কাবুল শিবির’ বলে উল্লেখ করেছেন।
কাবুল শিবিরে আছে–তালেবান মন্ত্রিসভার সদস্য, শক্তিশালী যোদ্ধা এবং প্রভাবশালী ধর্মীয় আলেমরা। তাঁদের প্রতি হাজার হাজার তালেবান সদস্যের সমর্থন রয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে, এ কাবুল শিবির কি ক্রমাগত কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠা আখুন্দজাদাকে সত্যিকারের কোনো চ্যালেঞ্জ জানাবে? কারণ, এ শীর্ষ নেতার বক্তৃতাতেই কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে আখুন্দজাদা ইন্টারনেট ও টেলিফোন পরিষেবা বন্ধের নির্দেশ দেন। এতে আফগানিস্তান কার্যত বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তিন দিন পর ইন্টারনেট আবার চালু হয়। তবে কেন এমনটা করা হলো তার কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। তালেবানের ভেতরকার লোকজন বলেছেন, সংগঠনটির কাবুল শিবিরই আখুন্দজাদার আদেশ অমান্য করে ইন্টারনেট আবার চালু করে দেয়।
তালেবান সদস্যরা মনে করেন, আখুন্দজাদা হলেন আফগানিস্তানের চূড়ান্ত শাসক। তিনি শুধু আল্লাহর কাছেই জবাবদিহি করবেন। তালেবান সদস্যদের দৃষ্টিতে আখুন্দজাদা এমন একজন, যাঁকে চ্যালেঞ্জ করা যায় না। তবে এখন এমন এক পরিস্থিতি সামনে এসেছে, যা দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের মধ্যকার মতবিরোধকে সরাসরি মতাদর্শের সংঘাতে পরিণত করেছে।
গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে আখুন্দজাদা ইন্টারনেট ও টেলিফোন পরিষেবা বন্ধের নির্দেশ দেন। এতে আফগানিস্তান কার্যত বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তিন দিন পর ইন্টারনেট আবার চালু হয়। তবে কেন এমনটা করা হলো, তার কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
তালেবানের ভেতরকার লোকজন বলেছেন, সংগঠনটির কাবুল শিবিরই আখুন্দজাদার আদেশ অমান্য করে ইন্টারনেট আবার চালু করে দেয়।
আফগানিস্তান ও কাবুল বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা এক বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘তালেবান অন্য যেকোনো আফগান রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর তুলনায় ব্যতিক্রম। কারণ, তাদের মধ্যে বড় কোনো বিভাজন ছিল না। এমনকি খুব বেশি মতবিরোধও দেখা যায়নি। এ গোষ্ঠীর মূলে একজনের আধিপত্যের প্রতি আনুগত্যের নীতি রয়েছে। আর সে অনুযায়ী আমিরের (আখুন্দজাদা) প্রতি তাদের আনুগত্য দেখাতে হবে। তাঁর স্পষ্ট আদেশের বিরুদ্ধে গিয়ে ইন্টারনেট আবার চালু করাটা ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত এবং অত্যন্ত উল্লেখজনক ঘটনা।’
তালেবানের অভ্যন্তরীণ একটি সূত্রের মতে, এটি বিদ্রোহের চেয়ে কম কিছু ছিল না।
একজন ধর্মবিশ্বাসী ব্যক্তি
হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার নেতৃত্বের শুরুটা এমন ছিল না।
বরং সূত্রগুলো বলছে, ২০১৬ সালে তাঁকে তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে বেছে নেওয়ার পেছনে একটি কারণ ছিল। সেটি হলো, সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে তাঁর মতৈক্য তৈরি করতে পারার সক্ষমতা।
তবে আখুন্দজাদার সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা ছিল না। এ জন্য তিনি তাঁর ডেপুটি হিসেবে সিরাজউদ্দিন হাক্কানিকে বেছে নেন, যিনি তালেবানের একজন শক্তিশালী যোদ্ধা। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সন্ধান চাওয়া ব্যক্তিদের একজন হাক্কানি। তাঁর মাথার জন্য ১ কোটি ডলার মূল্যের পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল।
আখুন্দজাদার আরেক ডেপুটি হিসেবে বেছে নেওয়া হয় তালেবানের প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা ওমরের ছেলে ইয়াকুব মুজাহিদকে। বয়সে তরুণ হলেও আন্দোলনকে ঐক্যবদ্ধ করার সম্ভাবনা তাঁর মধ্যে রয়েছে।
তালেবান যোদ্ধা ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর মধ্যে ২০ বছরের যুদ্ধের অবসান ঘটাতে চুক্তির জন্য দোহায় যে আলোচনা চলছিল, তার পুরো সময় তালেবানের এই ব্যবস্থাই অব্যাহত ছিল। ২০২০ সালে চুক্তির পর তালেবান ২০২১ সালে হঠাৎ এবং নাটকীয়ভাবে আবার পুরো দেশের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
বিবিসিকে অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলেছে, ২০২১ সালের আগস্টে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পরপরই আখুন্দজাদার দুই সহযোগীকে নীরবে মন্ত্রী পদমর্যাদায় নামিয়ে দেওয়া হয়। আর আখুন্দজাদা নিজেই হয়ে ওঠেন একক ক্ষমতার কেন্দ্র।
এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার নেতৃত্ব দেওয়া তালেবানের শক্তিশালী ও প্রভাবশালী সহপ্রতিষ্ঠাতা আবদুল গনি বারাদারও শেষ পর্যন্ত উপপ্রধানমন্ত্রীর পদেই থেকে যান। অথচ অনেকেই আশা করেছিলেন তিনি প্রধানমন্ত্রী হবেন।
আখুন্দজাদা রাজধানী কাবুল এড়িয়ে তালেবানের শক্ত ঘাঁটি কান্দাহারেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি নিজের চারপাশে বিশ্বাসযোগ্য মতাদর্শিক নেতা ও কট্টরপন্থীদের একজোট করতে শুরু করেন। দেশের নিরাপত্তা বাহিনী, ধর্মীয় নীতি এবং অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের নিয়ন্ত্রণ অন্য অনুগতদের দেওয়া হয়।
বিবিসিকে তালেবানের সাবেক এক সদস্য বলেন, ‘(আখুন্দজাদা) শুরু থেকেই নিজের নেতৃত্বাধীন একটি শক্তিশালী অংশ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। যদিও প্রথম দিকে তেমন সুযোগ ছিল না, কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর তিনি খুব দক্ষতার সঙ্গে তা করতে শুরু করেন। তিনি নিজের কর্তৃত্ব ও অবস্থান ব্যবহার করে ধীরে ধীরে নিজের বলয় বৃদ্ধি করতে থাকেন।
আখুন্দজাদা তার দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে একমত পোষণকারী ব্যক্তিদের দিয়ে তাঁর মন্ত্রিসভা পূর্ণ করেছেন। যাঁদের ‘কাবুল শিবির’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাঁরাও নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছেন।
কাবুলে থাকা তালেবান মন্ত্রীদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ ছাড়াই কান্দাহার থেকে বিভিন্ন ফরমান জারি হতে থাকে। ক্ষমতা গ্রহণের আগে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর প্রতিও খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। যেমন—মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ দেওয়া।
নারীদের শিক্ষা নিষিদ্ধ করা এবং নারীদের কাজ করার ওপর নিষেধাজ্ঞা—এই দুটিকে আফগান তালেবানের দুই শিবিরের মধ্যকার ‘উত্তেজনার প্রধান উৎস’ বলে একটি চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। গত ডিসেম্বরে জাতিসংঘের একটি পর্যবেক্ষক সংস্থা সেই চিঠি নিরাপত্তা পরিষদে পাঠিয়েছিল।
অভ্যন্তরীণ আরেক সূত্র বিবিসিকে বলেন, ১৯৯০–এর দশকে তালেবানের শরিয়াহ আদালতের বিচারক হিসেবে কাজ শুরু করা আখুন্দজাদা তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাস চর্চার ক্ষেত্রে ক্রমাগত কঠোর হয়ে উঠছেন।
আখুন্দজাদার সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেওয়া দুই ব্যক্তি বিবিসিকে বলেছেন, তাঁরা এমন এক মানুষের মুখোমুখি হয়েছিলেন, যিনি খুব কম কথা বলেন। তিনি মূলত ইশারার মাধ্যমে যোগাযোগ করেন এবং ওই কক্ষে থাকা বয়স্ক আলেমদের একটি দল সেই ইশারার ব্যাখ্যা করে দেন।
অন্য প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, জনসমক্ষে তিনি নিজের মুখ আড়াল করে রাখেন। পাগড়ির ওপর ঝোলানো কাপড় দিয়ে চোখ ঢেকে রাখেন এবং শ্রোতাদের উদ্দেশে কথা বলার সময় প্রায়ই কাত হয়ে দাঁড়ান। আখুন্দজাদার ছবি তোলা বা ভিডিও করা নিষিদ্ধ। তার মাত্র দুটি ছবিই আছে বলে জানা যায়।
আখুন্দজাদার সাক্ষাৎ পাওয়াও এখন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। আরেকজন তালেবান সদস্য বিবিসিকে বলেন, আখুন্দজাদা আগে ‘নিয়মিত পরামর্শ সভা’ করতেন। কিন্তু এখন বেশির ভাগ তালেবান মন্ত্রীকে দিনের পর দিন বা সপ্তাহের পর সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হয়।
আরেকটি সূত্র বিবিসিকে বলেছেন, সরকারি আমন্ত্রণ পেলেই কেবল কান্দাহারে যেতে হবে বলে কাবুলের মন্ত্রীদের বলা হয়েছে।
একই সময়ে, আখুন্দজাদা গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলো কান্দাহারে সরিয়ে নিচ্ছেন। এর মধ্যে অস্ত্র বিতরণ কার্যক্রমও রয়েছে, যা আগে তাঁর ডেপুটি হাক্কানি ও ইয়াকুবের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
ডিসেম্বরে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক দল তাদের এক চিঠিতে উল্লেখ করেছে, আখুন্দজাদার ক্ষমতা সংহত করার প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাহিনীকে ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী করার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত। কান্দাহারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে এটা করা হচ্ছে।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আখুন্দজাদা কাবুলের মন্ত্রীদের পাশ কাটিয়ে স্থানীয় পুলিশ ইউনিট পর্যন্ত সরাসরি আদেশ জারি করেন।
একজন বিশ্লেষকের মতে, এর ফল হলো প্রকৃত কর্তৃত্ব কান্দাহারে স্থানান্তরিত হয়েছে।
তবে তালেবানের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ বিবিসির কাছে এ কথা অস্বীকার করেছেন।
মুজাহিদ বলেন, ‘সব মন্ত্রীর ক্ষমতা তাঁদের নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের কাঠামোর মধ্যে রয়েছে। তাঁরা দৈনন্দিন কাজ করেন এবং সিদ্ধান্ত নেন। সব ক্ষমতাই তাঁদের কাছে অর্পিত এবং তাঁরা নিজেদের দায়িত্ব পালন করেন।’
জাবিউল্লাহ মুজাহিদ আরও বলেন, ‘শরিয়াহর দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি (আখুন্দজাদা) নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী। আল্লাহ কর্তৃক নিষিদ্ধ বিভাজন এড়াতে তাঁর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।’
কাবুল শিবির কী চায়
তালেবানের কাবুল শিবিরের ভেতরে অসন্তোষ বাড়ছে। একই সঙ্গে জোটও শক্তিশালী হচ্ছে।
এক বিশ্লেষক বিবিসিকে বলেন, কাবুল শিবিরের লোকজন এমন মানুষ যারা দুনিয়া দেখেছে। তাই তারা মনে করে, বর্তমান কাঠামোতে চলছে তালেবান সরকার দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারবে না।
কাবুল শিবির চায় আফগানিস্তান যেন ধীরে ধীরে উপসাগরীয় দেশগুলোর মতো একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে এগোয়।
কান্দাহারে ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত করা, তথাকথিত ‘নৈতিকতা আইন’-এর ধরন ও প্রয়োগ, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে তালেবানের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত এবং নারীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মতো বিষয়গুলো নিয়ে তাঁরা উদ্বিগ্ন।
আফগান নারীদের জন্য আরও বেশি অধিকার নিশ্চিত করার কথা বললেও কাবুল শিবিরকে ‘সংস্কারপন্থী’ বলা হয় না।
বরং অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো তাঁদের দেখেন ‘বাস্তববাদী’ হিসেবে। কাবুল শিবিরকে অনানুষ্ঠানিকভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তালেবানের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য বারাদার। তাঁর প্রতি এখনো অনেকের আনুগত্য আছে। যিনি এখনো ব্যাপক আনুগত্য ধরে রেখেছেন।
কাবুল শিবিরের অবস্থান বদলের বিষয়টি অনেকের চোখ এড়ায়নি।
এক বিশ্লেষক বলেন, ‘আমাদের মনে পড়ে, একসময় তাঁরা (কাবুলে থাকা তালেবান নেতারা) টেলিভিশন ভেঙে দিত। অথচ এখন তারা নিজেরাই টিভিতে হাজির হচ্ছেন।’
তালেবান নেতারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের শক্তি সম্পর্কেও ভালো ধারণা রাখে।
বিশ্লেষক ও ও তালেবানের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বারবার বিবিসিকে বলেছেন, সর্বোচ্চ নেতা আখুন্দজাদার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়া অসম্ভব।
আখুন্দজাদার ফরমানগুলোর বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দৃশ্যমান বিরোধিতাগুলোর ধরন ছিল ছোট আকারের ও সীমিত। যেমন, কাবুল শিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় দাড়ি কামানোর ওপর নিষেধাজ্ঞার মতো নিয়মগুলো কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়নি। তবে বড় ধরনের বিদ্রোহকে সব সময়ই অকল্পনীয় বলে মনে করা হয়েছে।
সাবেক এক তালেবান সদস্য বিবিসিকে দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘(আখুন্দজাদার) প্রতি আনুগত্য বাধ্যতামূলক বলে বিবেচিত হয়।’
নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সিরাজউদ্দিন হাক্কানি নিজেও প্রকাশ্য বিভক্তির সম্ভাবনাকে নাকচ করে দেন।
হাক্কানি বলেন, ‘একটি শান্তিপূর্ণ দেশ গড়ে তুলতে বর্তমানে আফগানিস্তানের জন্য ঐক্য জরুরি।’
সংকটে মোড়
তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা ইন্টারনেটের ব্যাপারে গভীর অবিশ্বাস বা নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। তাঁর বিশ্বাস, ইন্টারনেটের বিষয়বস্তু ইসলামি শিক্ষার পরিপন্থী। তাঁর এই বিশ্বাস এতটাই দৃঢ় যে, প্রতিদিন সকালে একজন সহকারী তাঁকে সর্বশেষ খবর ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট পড়ে শোনান। তাঁর একজন মুখপাত্র বিবিসিকে এসব কথা বলেছেন।
অন্যদিকে তালেবানের কাবুল শিবিরের বিশ্বাস, ইন্টারনেট ছাড়া কোনো আধুনিক দেশ টিকে থাকতে পারে না।
সর্বোচ্চ নেতার ইন্টারনেট বন্ধের আদেশটি প্রথমে আখুন্দজাদার মিত্রদের নিয়ন্ত্রিত প্রদেশগুলোতে কার্যকর হয়েছিল। এরপর তা পুরো দেশে বিস্তৃত করা হয়।
কাবুল শিবিরের ঘনিষ্ঠ সূত্র এবং তালেবান সরকারের ভেতরের সূত্রগুলো বিবিসিকে বলেছে, এরপর যা ঘটেছিল তা ছিল তালেবানের ইতিহাসে প্রায় নজিরবিহীন এক ঘটনা।
সংক্ষেপে বলা যায়, কাবুল শিবির ঘেঁষা সবচেয়ে ক্ষমতাধর মন্ত্রীরা একত্র হয়ে কাবুলভিত্তিক প্রধানমন্ত্রী মোল্লা হাসান আখুন্দকে ইন্টারনেট সচল করার নির্দেশ দিতে রাজি করান।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর সোমবার সর্বোচ্চ নেতার পক্ষ থেকে সরাসরি টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে নির্দেশ আসে যে, সবকিছু বন্ধ করে দিতে হবে। আর এর পরবর্তী বুধবার সকালে বারাদার, হাক্কানি, ইয়াকুবসহ কাবুল শিবিরের একদল মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জড়ো হন। তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন টেলিযোগাযোগমন্ত্রীও। সেখানে তারা কান্দাহারঘনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রীকে দায়িত্ব নেওয়ার এবং আদেশটি বাতিল করার আহ্বান জানান। এক সূত্রের মতে, তারা প্রধানমন্ত্রীকে বলেন যে এর সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁরাই নেবেন।
এটিতে কাজ হয়। ইন্টারনেট সচল হয়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কয়েক মাস আগে আখুন্দজাদা তালেবানের ঐক্য হুমকিতে পড়ার যে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তা যেন বাস্তব রূপ নিতে শুরু করে।
ইন্টারনেট চালু হওয়ার পর, কী ঘটতে পারে তা নিয়ে ব্যাপক জল্পনা শুরু হয়।
কাবুল শিবিরঘেঁষা একটি সূত্র বলেছে, ধীরে ধীরে এসব মন্ত্রীকে সরিয়ে দেওয়া বা পদাবনমন করা হবে।
তবে কান্দাহার উলামা কাউন্সিলের এক সদস্য বলেন, সম্ভবত সর্বোচ্চ নেতাই পিছু হটেছিলেন। কারণ, তিনি এমন বিরোধিতাকে ভয় পান।
ডিসেম্বরের মাঝামাঝি আবারও ‘মতপার্থক্য’ প্রকাশ পায়। এক ভিডিওতে দেখা যায়, হাক্কানি তার নিজ প্রদেশ খোস্তে এক বক্তব্যে বলছিলেন, ‘জাতির আস্থা, ভালোবাসা ও বিশ্বাসের মাধ্যমে ক্ষমতায় গিয়ে কেউ যদি পরে সেই জাতিকেই ভুলে যায় বা পরিত্যাগ করে, সে সরকার নয়।’
একই দিনে, আখুন্দজাদার অনুগত উচ্চশিক্ষামন্ত্রী নেদা মোহাম্মদ নাদেম পাশের একটি প্রদেশের মাদ্রাসায় স্নাতক শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন।
নাদেম বলেন, ‘শুধু একজনই নেতৃত্ব দেন, বাকিরা আদেশ পালন করেন। এটাই প্রকৃত ইসলামি সরকার। যদি অনেক নেতা থাকে, তাহলে সমস্যা তৈরি হবে এবং আমরা যে সরকার অর্জন করেছি, তা ধ্বংস হয়ে যাবে।’
তালেবান সরকারের জ্যেষ্ঠ মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ কোনো বিভাজনের কথা অস্বীকার করেছেন।
২০২৬ সালের জানুয়ারির শুরুতে মুজাহিদ বিবিসিকে বলেন, ‘আমরা কখনোই নিজেদের বিভক্ত হতে দেব না। সব কর্মকর্তা ও নেতৃত্ব জানেন যে বিভাজন সবার জন্য ক্ষতিকর, আফগানিস্তানের জন্য ক্ষতিকর, ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ এবং আল্লাহ কর্তৃক নিষিদ্ধ।’
তবে মুখপাত্র এটাও স্বীকার করেন, তালেবানের ভেতরে মতের ‘পার্থক্য’ আছে। কিন্তু সেটিকে তিনি ‘একটি পরিবারের ভেতরের মতভেদের’ সঙ্গে তুলনা করেন।
একদিকে ইন্টারনেট নিয়ে বিরোধ, এরপর এসব সাম্প্রতিক মন্তব্য। আর এগুলো ২০২৫ সালের শুরুতে ফাঁস হওয়া অডিওতে আখুন্দজাদা যে সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন, তার সঙ্গে ভিন্ন এক মাত্রা যোগ করেছে।
২০২৬ সাল কি সেই বছর হবে, যখন কি না কাবুল শিবির আফগানিস্তানের নারী ও পুরুষদের জন্য অর্থবহ পরিবর্তনের পথে হাঁটবে?—সেটা এখনো বিতর্কের বিষয়।
এক বিশ্লেষক বলেছেন, ইসলামি আমিরাতের শীর্ষপর্যায়ে স্পষ্ট মতবিরোধ দেখা দিলেও, সেই কথাগুলো কখনো বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নেবে কি না, তা নিয়ে এখনো প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
তবে ওই বিশ্লেষক আরও বলেন, ‘এখন পর্যন্ত এমন কিছু হয়নি।’