প্রতিবছরের ন্যায় এ বছরও দ্য ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) গ্লোবাল লাইভেবিলিটি ইনডেক্স বা বসবাসের জন্য সেরা শহরের তালিকা প্রকাশ করেছে। ইআইইউ পাঁচটি মূল সূচকের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবছর ১৭৩টি শহরের তালিকা তৈরি করে থাকে। যে সূচকের ওপর ভিত্তি করে এই তালিকা তৈরি করা হয়, সেগুলো হচ্ছে স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা এবং অবকাঠামো। ২০২৬ সালে বসবাসের জন্য কোন কোন শহর সেরা ১০-এ জায়গা করে নিয়েছে, তা দেখে নেওয়া যাক।

টানা দ্বিতীয় বছর ইআইইউ গ্লোবাল লাইভেবিলিটি ইনডেক্স বা বসবাসের জন্য সেরা শহরের সূচকে ১ নম্বরে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন। এ বছর স্থিতিশীলতা, শিক্ষা ও অবকাঠামোতে শহরটি পূর্ণ নম্বর পেয়েছে। পাশাপাশি সংস্কৃতি ও পরিবেশ সূচকে অন্য যেকোনো শহরের তুলনায় সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়েছে। শহরের বাসিন্দারা দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট আনন্দগুলো সহজাতভাবে উপভোগ করেন।
কোপেনহেগেনের বাসিন্দা লরা আমিরা কাসেম বলেন, ‘আপনি সাইকেলে করে কর্মস্থলে যেতে পারেন, কাজ শেষে বন্দরের পানিতে সাঁতার কেটে আবার রাতের খাবারের জন্য বাড়ি ফিরতে পারেন। এটি কোনো বিশেষ দিন নয়, এ তো স্রেফ একটি মঙ্গলবার।’
লরা এমডি ও পিএইচডি শিক্ষার্থী। আট বছর ধরে তিনি কোপেনহেগেনে বসবাস করছেন।
এই শহরে সামাজিক বন্ধন অত্যন্ত দৃঢ়। এখানে কেউ চাপে বা তাড়াহুড়াতে নেই। উন্মুক্ত বাজার আর পার্কে শিশুদের ছোটাছুটি ও কোলাহল দেখে এই শহরে সময় কাটিয়ে দেওয়া যায়। এখানকার বাসিন্দারা বলেন, এ শহর কখনো নিজেকে জাহির করে না। কিন্তু সব সময়ই প্রত্যাশা পূরণ করে।
অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা গত বছরই সবচেয়ে বাসযোগ্য শহরের তালিকায় কোপেনহেগেনের কাছে প্রথম স্থানটি হারায়। তবে স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা ক্ষেত্রে নিখুঁত স্কোর করার কারণে শহরটি এবারও দ্বিতীয় স্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। বাসিন্দাদের কাছে ভিয়েনার বসবাসযোগ্যতার মূল আকর্ষণ হলো সহজে চলাফেরা করার সুবিধা—হোক তা গণপরিবহনে কিংবা পায়ে হেঁটে।
ভিয়েনার বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবন কেমন হয়, তা ফ্রানৎসিস্কা হখমুলার কথাতেই উঠে এসেছে। ভিয়েনা ট্যুরিস্ট বোর্ডের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমার প্রতিদিনের অভ্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো রিংস্ট্রাস ধরে কর্মস্থলে যাতায়াত করা। আমি শহরের ঐতিহ্যবাহী ট্রামগুলোর একটিতে চড়ে কর্মস্থলে যাতায়াত করি। ট্রামে বসে ফোনে স্ক্রল করার পরিবর্তে আমি বই পড়তে ভালোবাসি, অথবা শুধু জানালার বাইরে দিয়ে চলে যাওয়া সুন্দর সুন্দর ভবনগুলো দেখি। আমি এটা উপভোগ করি। এটি এমন একটি ছোট্ট বিষয়, যা আমাকে প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়—ভিয়েনায় সাধারণ বিষয়গুলোও আসলে কতটা অসাধারণ।’
তৃতীয় স্থানে আছে অস্ট্রেলিয়ার শহর মেলবোর্ন। শহরটি সংস্কৃতি ও পরিবেশের সম্মিলিত সূচকে সর্বোচ্চ ৯৬ নম্বর পেয়েছে। মেলবোর্নের বাসিন্দা অ্যান মেরি লেনন বলেন, ‘মেলবোর্ন একটি বড় শহর, কিন্তু এটি যেকোনোভাবে হোক, গ্রামের মতো আচরণ করে।’
ক্রাউন প্লাজা কার্লটনের জেনারেল ম্যানেজার অ্যান মেরি এর আগে যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন শহরে কাজ করেছেন। তিনি বলেন, ‘এখানকার মানুষ সত্যিই আপনার সম্পর্কে জানতে আগ্রহী। আর তার ওপর রয়েছে এখানকার সংস্কৃতি, খাবার, সংগীত, ফ্যাশন ও শিল্প। প্রতিটি উপশহরের নিজস্ব আলাদা আবহ ও পরিচয় রয়েছে।’
মেলবোর্নের মতো অস্ট্রেলিয়ার আরেক শহর সিডনিও এই তালিকায় রয়েছে। এই নগর স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষায় শহরটি শতভাগ নম্বর পেয়েছে।
তবে এখানকার বাসিন্দারা বলেছেন, প্রকৃতির সহজলভ্যতা, বহু সাংস্কৃতিক মানুষ এবং ঘরের বাইরে জীবনকে উপভোগ করার সুযোগই শহরটিকে এত বেশি বসবাসযোগ্য করে তুলেছে।
নিউ সাউথ ওয়েলসের কর্মসংস্থান ও পর্যটনমন্ত্রী স্টিভ ক্যাম্পার বলেন, ‘সিডনি জীবনকে সহজ করে তোলে। আপনি শহরের যেখানেই থাকুন না কেন, দারুণ কোনো দৃশ্য থেকে কখনোই খুব বেশি দূরে থাকবেন না—তা সে বন্দর হোক, নীল পর্বতমালা হোক কিংবা সমুদ্রসৈকত।’
স্টিভ ক্যাম্পার আরও বলেন, ‘ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির মেলবন্ধন, শহরতলী, অসাধারণ খাবার এবং জীবনযাপনের ধরন—এ সবকিছু সিডনিকে বিশেষ করে তুলেছে। এটি একটি বৈশ্বিক শহর। তবু মনে হয়, যেন এটি অনেকগুলো স্থানীয় সম্প্রদায়ের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি শহর।’
যদিও ২০২৫ সালে যৌথভাবে দ্বিতীয় স্থানে থাকা জুরিখ এ বছর পঞ্চম স্থানে নেমে গেছে। কিন্তু শহরের বাসিন্দারা বলছেন, শহরটির দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং প্রকৃতির কাছে সহজে পৌঁছানোর সুযোগই এখানকার অসাধারণ জীবনমানের মূল ভিত্তি।
জুরিখের স্থানীয় বাসিন্দা ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর মানুয়েলা লিওনহার্ড বলেন, ‘হ্রদ ও নদীগুলো ছাড়া জুরিখকে কল্পনা করা যায় না। প্রতিদিনই আমি হয় জুরিখ হ্রদ, লিমাট নদী কিংবা সিল নদীর পাশ দিয়ে যাই এবং নিজের জন্য কিছুটা সময় বের করি।
‘এখানকার পানিগুলো সতেজ ও স্বচ্ছ, আর পুরো শহরজুড়ে আমাদের ১ হাজার ২০০ এর বেশি ঝরনা রয়েছে, যেগুলোর পানি পান করা যায়।’
জনকল্যাণমূলক নীতি ও সুশৃঙ্খল অবকাঠামোর কারণে সুইজারল্যান্ড ধারাবাহিকভাবে জীবনযাত্রার মানের দিক থেকে প্রথম সারির দেশ। সুইজারল্যান্ডের দুটি শহর বসবাসের জন্য সবচেয়ে ভালো শহরের তালিকায় প্রথম ১০-এ স্থান পেয়েছে।
জেনেভা শহরটি পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও সহজে চলাচলের উপযোগী। তবে জেনেভার বাসিন্দারা মনে করেন, তাঁদের শহরের পরিবেশ অন্যান্য শহর থেকে কিছুটা আলাদা। এটি আয়তনে ছোট ও ঘনিষ্ঠভাবে বিন্যস্ত। এখানে নির্ঝঞ্ঝাট থাকা যায় এবং একটি বৈশ্বিক কেন্দ্রে যেসব সুযোগ-সুবিধা থাকে, এর সবই রয়েছে এ শহরে।
সুইজারল্যান্ডের অন্যতম বৈচিত্র্যপূর্ণ শহরও জেনেভা। এখানে বাসিন্দাদের ৪০ শতাংশের বেশি বাসিন্দার জন্ম বিদেশে।
জেনেভার বাসিন্দা জেমস এফ রয়্যাল বলেন, এ বৈচিত্র্যের সুফল ভোগ করেন এখানকার মানুষ। বিভিন্ন ধরনের খাবার থেকে শুরু করে নানা সাংস্কৃতিক পটভূমি থেকে আসা মানুষের সংস্পর্শে আসার সুযোগ এখানে মেলে।
জাপানের ছোট্ট শহর ওসাকা গতবছরের মতো এ বছরও সবচেয়ে বসবাসযোগ্য শহরের তালিকায় নিজের সপ্তম স্থান ধরে রেখেছে। জাপানের রাজধানী টোকিওর মতো ওসাকা অতটা আলো-ঝলমলে নয়। কিন্তু শহরটির নিজস্ব একটি ছন্দ রয়েছে। জীবনধারার সেই ছন্দই ওসাকার বাসিন্দাদের কাছে সবচেয়ে প্রিয়।
সবচেয়ে বসবাসযোগ্য শীর্ষ ১০ শহরের তালিকায় অস্ট্রেলিয়ার তৃতীয় শহর অ্যাডিলেড। গত বছরের তুলনায় এ বছর শহরটি একধাপ এগিয়ে ৮ নম্বরে উঠে এসেছে। ২০২৪ সালে ছিল ১১ নম্বর। অর্থাৎ শহরটি দিন দিন নিজেদের অবস্থার উন্নতি করছে এবং আরও বেশি বাসযোগ্য হয়ে উঠছে।
অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডের মতো কানাডার শহর ভ্যাঙ্কুভারও গত বছরের চেয়ে এ বছর এক ধাপ এগিয়েছে। সবচেয়ে বসবাসযোগ্য শহরের তালিকায় এবার ভ্যাঙ্কুভারের অবস্থান নবম। একসঙ্গে এটি তালিকায় স্থান পাওয়া উত্তর আমেরিকার একমাত্র শহর।
জাপানের রাজধানী টোকিও এ বছর তিন ধাপ এগিয়ে সবচেয়ে বসবাসযোগ্য শহরের তালিকায় শীর্ষ ১০-এ উঠে এসেছে। ২০২৬ সালে টোকিওর সামগ্রিক স্কোর হচ্ছে-৯৬। শহরটি স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষায় পূর্ণ নম্বর ১০০ পেয়েছে। এ ছাড়া সংস্কৃতি ও পরিবেশে ৮৯ এবং অবকাঠামোতে ৯৩ নম্বর পেয়েছে।