
যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান যখন নিজেকে প্রতিষ্ঠা করছে, তখন ভারতকে কি মাঠের বাইরে ঠেলে দেওয়া হয়েছে? দিল্লিতে এ গুঞ্জন এখন বেশ স্পষ্ট।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে আগ্রাসন শুরুর পর ইসলামাবাদ কূটনৈতিকভাবে দারুণ তৎপরতা দেখিয়েছে এবং নিজেকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
খবর অনুসারে, গত সপ্তাহে ইসলামাবাদ যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে ১৫ পয়েন্টের একটি শান্তি পরিকল্পনা প্রস্তাব ইরানের কাছে পৌঁছে দিয়েছে এবং আলোচনার আয়োজক দেশ হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের ওই শান্তি পরিকল্পনা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।
এ নিয়ে ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস পার্টি সরকারকে আক্রমণ করে বলেছে, পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেওয়ার খবর ভারতের কূটনীতির জন্য ‘বিব্রতকর’।
প্রতিবেশী ও প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের এমন তৎপরতা ভারতের জন্য কিছুটা অস্বস্তিকর। বিশেষ করে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্কের তুলনামূলক উত্থান–পতনের এ সময়ে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় ভারতের অস্বস্তি আরও বেড়ে গেছে।
এটাই মনে হচ্ছে, পাকিস্তান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আবার যোগাযোগের পথ তৈরি করছে।
এই পরিস্থিতি ভারতের নীতিনির্ধারক গোষ্ঠীর মধ্যে চেনা একটি মতভেদকে নতুন করে উসকে দিয়েছে।
বিরোধী দল ও কয়েকজন বিশ্লেষকের যুক্তি, ওই অঞ্চলের সঙ্গে দিল্লির নিজস্ব বহুমুখী সম্পর্ক রয়েছে। তাই দিল্লির অন্তত একজন মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া উচিত ছিল, যাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের এই মুহূর্তে তাঁদের একেবারে অনুপস্থিত মনে না হয়।
এ নিয়ে ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস সরকারকে আক্রমণ করে বলেছে, পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেওয়ার খবর ভারতের কূটনীতির জন্য ‘বিব্রতকর’।
খবর অনুযায়ী, গত সপ্তাহে একটি সর্বদলীয় বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর পাকিস্তানের ভূমিকাকে ‘দালালি’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তারা ১৯৮১ সাল থেকে এমন ভূমিকা পালন করছে, এমনকি যুক্তরাষ্ট্র–তালেবান আলোচনাকালে তাদের এমন ভূমিকাই ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
কৌশলগত সম্পর্কবিষয়ক বিশ্লেষক ব্রহ্ম চেলানি খুদে ব্লগ লেখার সাইট এক্সে এক পোস্টে লিখেছেন, ‘যুদ্ধের বয়ান তৈরিতে (ওয়ার অব ন্যারেটিভস) অধিক তৎপর এবং আগ্রাসী ভূমিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে পাকিস্তান প্রায়ই কূটনৈতিকভাবে ভারতকে ছাড়িয়ে যায়।’
তবে অনেকে মনে করেন, কেবল উপস্থিতি দেখিয়ে খুব একটা লাভবান হওয়া যায় না; বরং তাঁরা সতর্ক করে বলেছেন, কোনো স্বার্থ ছাড়া অথবা বিনা আমন্ত্রণে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিতে যাওয়া হিতে বিপরীত হতে পারে। তাঁদের মতে, নীরব থাকার কূটনীতি ও কৌশলগত দূরত্ব বজায় রেখে বরং ভারতের স্বার্থ অধিক সুরক্ষিত থাকে।
ভারত সরকারও প্রায় একই সুরে কথা বলছে। খবর অনুযায়ী, গত সপ্তাহে একটি সর্বদলীয় বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর পাকিস্তানের ভূমিকাকে ‘দালালি’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তারা ১৯৮১ সাল থেকে এমন ভূমিকা পালন করছে, এমনকি যুক্তরাষ্ট্র–তালেবান আলোচনাকালে তাদের এমন ভূমিকাই ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
জয়শঙ্কর বলেন, ‘আমরা এদিক–ওদিক দৌড়ে কী কী দালালি করতে পারি, অন্যান্য দেশকে এমনটা জিজ্ঞাসা করে বেড়াই না।’
কিন্তু কয়েকজন বিশ্লেষক মনে করেন, দিল্লিতে মূল আলোচনা নীতির চেয়ে দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বেশি হচ্ছে।
শিব নাদার বিশ্ববিদ্যালয়ের হ্যাপিমন জ্যাকব যুক্তি দেন, মূলত সমস্যাটি কৌশলগত নয়; বরং মনস্তাত্ত্বিক।
জ্যাকব একটি সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করেন, ভারতে এই প্রতিক্রিয়ার একটি কারণ প্রতিযোগিতামূলক উদ্বেগ। তাদের মনে হয়েছে, যদি পাকিস্তান পারে, তাহলে আমরা কেন পারব না?
জ্যাকব বলেন, ‘সবচেয়ে ভালোভাবে বলতে গেলে, এটি হলো সুযোগ হারানোর ভয়। আর সবচেয়ে খারাপ করে বললে, এটি হলো নিজেদের চেয়ে ছোট একজন প্রতিবেশীর প্রতি হিংসা। যে প্রতিবেশী এমন মনোযোগ আকর্ষণ করেছে, আমাদের নীতিনির্ধারকদের একাংশ মনে করে, এটাই ভারতের প্রাপ্য।’
তবে সুযোগ হারানোর ভয় হোক বা হিংসা—দুটিই ভালো বৈদেশিক নীতি গড়ার ক্ষেত্রে ভালো ভিত্তি নয় বলে মনে করেন জ্যাকব।
আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া–বিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান যুক্তি দেন, ভারত কখনো সত্যিই মধ্যস্থতার দৌড়ে ছিল না। আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ ছাড়া তাদের এসবে প্রবেশ করার সম্ভাবনাও কম।
কুগেলম্যানের মতে, মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতা সম্ভবত স্বল্প সময়ের জন্য এবং সীমিত ভূমিকাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কারণ, অবিশ্বাসের মধ্যে থাকায় যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সরাসরি আলোচনার সম্ভাবনা শিগগিরই নেই।
তবে অনেকের প্রশ্ন, যদি ভারত কখনো মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেওয়ার প্রতিযোগিতায় না নামে, তবে তারা কী ভূমিকা নিতে পারে বা নেওয়া উচিত হবে।
পাকিস্তানে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার অজয় বিসারিয়ার মতে, এই প্রশ্নের জবাব নিহিত রয়েছে ভারতের শক্তি ও সীমাবদ্ধতা—উভয়কেই স্বীকার করে নেওয়ার মধ্যে।
অজয় বলেন, যদিও নিজের স্বার্থ ও সম্পর্কের কারণে ওই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা পালনের সক্ষমতা ভারতের রয়েছে, তবে দেশটি এমন হাতিয়ার নয়, যাকে ওয়াশিংটন ইচ্ছেমতো পরিচালনা বা নির্দেশ দিতে পারে।
বিসারিয়া বলেন, এ কারণে ভারত এই ভূমিকায় উপযুক্ত নয়। তাঁর যুক্তি, দিল্লির উচিত শান্তির প্রচারে আরও বাস্তবসম্মত ও কার্যকর ভূমিকা অনুসরণ করা, তবে সেটা পাকিস্তানের মতো করে নয় এবং এই মঞ্চে নয়।
এ বিষয়ে ভিন্ন সুরে কথা বলেছেন ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিরুপমা রাও। খুদে ব্লগ লেখার সাইট এক্সে এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘এই যুদ্ধ প্রায় প্রতিটি ব্যবহারিক দিক থেকে ভারতের স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে… গভীরতর প্রশ্ন হলো, ভারত কি যথেষ্ট স্পষ্টভাবে তা নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছুক।’
দেশের ভেতরে সরকারের এই সংযমী ভূমিকার সমালোচনা চলছে। বিরোধী নেতারা নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেছেন, গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড ও ইরানের ওপর হামলার বিষয়ে সরকার স্পষ্টভাবে নীরব রয়েছে। এটি ভারতীয় কূটনীতিতে ইসরায়েলকে সমর্থনের প্রতি ঝোঁক বৃদ্ধি ও প্রচলিত সমন্বিত কূটনৈতিক ভারসাম্য থেকে বিচ্যুতির নির্দেশ করছে।
নিরুপমা রাও বলেন, ‘সংযমেরও একটি পর্যায় রয়েছে। যখন স্বাধীনতা, শক্তির সীমা ও নাগরিকদের সুরক্ষার মতো মৌলিক বিষয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন এই নীরবতা ভারতে গ্রহণযোগ্য হবে না।’
অজয় বিসারিয়া বিশ্বাস করেন, ভারতের উচিত সংবাদের শিরোনামনির্ভর কূটনীতি ছাড়িয়ে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি আরও বিস্তৃত করা। তিনি বলেন, ভারত শান্তি ও সংঘাত—দুটিরই অংশীদার। কারণ, যুদ্ধ দেশটির স্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যকে ব্যাহত করে।
অজয় বিসারিয়া আরও বলেন, মধ্যস্থতার ভূমিকায় ছুটে যাওয়ার পরিবর্তে দিল্লির উচিত শান্তি প্রতিষ্ঠার অদৃশ্য, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোয় বিনিয়োগ করা এবং দীর্ঘ মেয়াদে বিশেষজ্ঞ সক্ষমতা তৈরি করা; যেন তারা বাস্তবে বন্দর বিনিময়, গোপন সামরিক যোগাযোগ বা হরমুজ প্রণালির মতো সংকীর্ণ পথ দিয়ে নিরাপদ যাত্রার আলোচনা সফলভাবে পরিচালনা করতে পারে।