মিসরে একটি সামিটে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মিসরে একটি সামিটে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হয়ে পাকিস্তান কি ভারতের অস্বস্তি বাড়িয়ে দিল

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মূল মধ্যস্থতাকারী হিসেবে হাজির হয়েছে পাকিস্তান, বিশেষ করে দেশটির সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ যুদ্ধবিরতি কার্যকরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

শাহবাজ ও আসিম যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে যেতে রাজি করিয়েছেন এবং দুই দেশের মধ্যে প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠক আয়োজনে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। আগামীকাল শুক্রবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের আলোচনায় বসার কথা রয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হবে শনিবার।

যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধে পাকিস্তানের এই ভূমিকা নিয়ে নয়াদিল্লিতে স্পষ্ট উদ্বেগ রয়েছে। তাদের মধ্যে এই ধারণা তৈরি হয়েছে, ‘মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (এ যুদ্ধ থেকে) বের হওয়ার পথ খুঁজছিলেন, পাকিস্তান দ্রুত এগিয়ে এসে সাহায্য করেছে।’

যদিও ঘটনাপ্রবাহ থেকে এটা পরিষ্কার—পাকিস্তান কৌশলে যোগাযোগ ও তৎপরতা চালিয়েছে এবং খুব হিসাব করে পা ফেলেছে। এর ফলে তারা নিজেদের সামর্থ্যের তুলনায় অনেক বেশি প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে।

এপ্রিলের ক্রিপ্টো চুক্তি এবং গত বছরের মে মাসে ভারতের সঙ্গে সংঘাতের পর হোয়াইট হাউসে নতুন করে প্রবেশাধিকার পায় পাকিস্তান। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইসলামাবাদ ট্রাম্প প্রশাসনের খুবই নিয়ন্ত্রিত উচ্চমহলে নিজের জন্য একটি জায়গা তৈরি করে নিয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি, উভয়ই পাকিস্তানের প্রশংসা করেছেন।

ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিকে ‘প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে কথোপকথনের ফলাফল’ বলে উল্লেখ করেছেন; আর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচিও যুদ্ধ শেষ করতে নিরলস প্রচেষ্টার জন্য আসিম মুনির ও শাহবাজ শরিফের প্রশংসা করেছেন এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তাঁদের ‘আমার প্রিয় ভাইয়েরা’ বলে সম্বোধন করেছেন।

অন্যদিকে শাহবাজ শরিফ তাঁর পক্ষ থেকে চীন, সৌদি আরব, তুরস্ক, মিসর ও কাতারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, একটি যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছাতে এই দেশগুলো ‘অমূল্য ও সর্বাত্মক সমর্থন’ দিয়েছে।

একই সঙ্গে শাহবাজ শরিফ ‘শান্তিকে একটি সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে অসাধারণ কৌশলগত দূরদৃষ্টি, প্রজ্ঞা এবং ধৈর্য প্রদর্শন করায়’ তিনি উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থার (জিসিসি) ‘ভ্রাতৃপ্রতিম দেশগুলো’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বকেও ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির

কোন কৌশলে এগিয়েছে পাকিস্তান

পাকিস্তানের দৈনিক ডন তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, কয়েক সপ্তাহের কূটনীতি, বিশেষ করে দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে আড়ালে থেকে পাকিস্তান মরিয়া হয়ে যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়েছে, তার ফলাফল এই যুদ্ধবিরতি।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পরপরই ইসলামাবাদ দ্রুত পদক্ষেপ নিতে শুরু করে বলেও ডনের প্রতিবেদনে বলা হয়।

প্রথম হামলার কয়েক দিনের মধ্যে পাকিস্তানের কর্মকর্তারা একাধিক রাজধানীতে নিজেদের কূটনৈতিক চ্যানেল সক্রিয় করতে শুরু করেন।

ডনের খবরে আরও বলা হয়, সর্বজনীনভাবে নিরপেক্ষতা বজায় রেখে পাকিস্তান নিঃশব্দে নিজেকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি সেতু হিসেবে উপস্থাপন করে। দুই শত্রু দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই।

পাকিস্তান ওয়াশিংটনের সামনে ইরানের স্বার্থগুলো উপস্থাপন করেছে এবং ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয়ের সামনে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরেছে।

পাকিস্তানের এ প্রচেষ্টা সবচেয়ে দৃশ্যমান হয়েছিল ২৯ ও ৩০ মার্চ। এ দুদিন পাকিস্তান, সৌদি আরব, মিসর ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইসলামাবাদে সাক্ষাৎ করেন।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের নেতৃত্বে ওই সাক্ষাতে সামরিক উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি রোধ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা শুরুর ক্ষেত্র তৈরি করার ওপর মূল মনোযোগ দেওয়া হয়।

ডনের খবরে বলা হয়, পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইসলামাবাদে গঠনমূলক আলোচনার পরিকল্পনা করেন, যদিও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আলোচনা হয়নি।

কিন্তু ইসলামাবাদ তাতে হাল ছেড়ে না দিয়ে বরং তাদের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টার গতি আরও জোরদার করে।

যদিও ঘটনাপ্রবাহ থেকে এটা পরিষ্কার যে পাকিস্তান কৌশলে যোগাযোগ ও তৎপরতা চালিয়েছে এবং খুব হিসাব করে পা ফেলেছে। এর ফলে তারা নিজেদের সামর্থ্যের তুলনায় অনেক বেশি প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে।

আসিম মুনির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন।

অন্যদিকে শাহবাজ শরিফ ও ইসহাক দার ওয়াশিংটন, মস্কো, বেইজিং, ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ রাজধানী, জিসিসির সদস্যদেশ, তুরস্ক, মিসর ও সৌদি আরবসহ এক ডজনের বেশি বিশ্বনেতা ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে গেছেন।

এর উদ্দেশ্য ছিল ‘সব পক্ষকে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে রাজি করানো, যা আনুষ্ঠানিক আলোচনার প্রথম ধাপ হিসেবে কাজ করবে।’

পাকিস্তানের কর্মকর্তারা ইরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সব সময় যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন। তাঁরা ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছেন। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ একেবারে সীমিত থাকার সময়েও যেন কূটনৈতিক চ্যানেলগুলো খোলা থাকে, পাকিস্তান তা নিশ্চিত করতে চেয়েছে।

ডন জানায়, এপ্রিলের শুরুতে ‘যুদ্ধবিরতির রূপরেখা’ প্রস্তুত হয়। ইসলামাবাদ যু্দ্ধবিরতির ওই রূপরেখা সবাইকে পাঠিয়ে শত্রুতা স্থগিতের প্রস্তাব দেয়। ওই প্রস্তাবে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথে উত্তেজনা কমানোর পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

যদিও বিশেষ করে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও সমুদ্রপথে প্রবেশাধিকার নিয়ে তখনো তীব্র মতপার্থক্য ছিল; কিন্তু সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে পাহাড়সম চাপের কারণে একটি সমঝোতার ক্ষেত্র তৈরি হয়।

সময় যত গড়াতে থাকে, বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার ভয়ও বাড়তে থাকে। এ পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের সাময়িক যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে এবং তার ওপর ভিত্তি করে ৭ এপ্রিল মঙ্গলবার একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।

এর পরের ধাপ, ১০ এপ্রিল ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদলের আলোচনা। অবশ্য আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হবে ১১ এপ্রিল শনিবার।

নয়াদিল্লিতে উদ্বেগ

গত বছরের মে মাসে ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধের সময় ট্রাম্প নিজেই টুইট করে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছিলেন। ট্রাম্প সে সময় নিজেকে ওই যুদ্ধের মধ্যস্থাকারী দাবি করেন—পাকিস্তান তাঁর ওই দাবিতে সমর্থন দেয়। তারপর থেকে নয়াদিল্লি সতর্ক অবস্থানে চলে গেছে।

এখন নয়াদিল্লির উদ্বেগের কারণ, যে পাকিস্তানকে তারা কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করেছিল, সে পাকিস্তানই এখন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ক্ষমতার মূল প্রবাহে নিজেদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তান যখন মধ্যস্থতাকারী হওয়ার প্রস্তাব দেয়, তখন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এ নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে পাকিস্তানকে ‘দালাল’ বলেছিলেন। এখন অনেকে প্রতিবেশী দেশকে নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন ভাষা ব্যবহারের কঠোর মূল্যায়ন করছেন। তাদের মতে, জয়শঙ্কর উপযুক্ত ভাষা ব্যবহার করেননি।

গালফ অঞ্চলে কাজ করা একজন সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক বলেন, ‘যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা এগিয়ে যায় এবং অত্যন্ত জটিল এই পথে যদি কিছুটা অগ্রগতিও হয়, যেখানে আমাদের মিত্ররাও জড়িত, তাহলে ভারতের পক্ষে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করা এবং দোষী হিসেবে দেখানো কঠিন হবে। কারণ, আমরা জ্বালানি ও অন্যান্য কারণে ওই অঞ্চলের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল।’

এ পরিস্থিতিতে ভারত সরকার আগামী কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসে ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে কিছুটা অগ্রগতি অর্জনের উপায় খুঁজবে।

ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র গেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর ১১ ও ১২ এপ্রিল সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর করবেন।