উয়েনো চিড়িয়াখানায় চার বছর বয়সী পান্ডা শাও শাও বাঁশ খাচ্ছে। ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫, টোকিও
উয়েনো চিড়িয়াখানায় চার বছর বয়সী পান্ডা শাও শাও বাঁশ খাচ্ছে। ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫, টোকিও

শেষ পান্ডাজোড়া ফেরত নিচ্ছে চীন, চোখের পানিতে বিদায় জানাচ্ছেন জাপানিরা

জাপানের একটি চিড়িয়াখানায় গতকাল রোববার কয়েক হাজার মানুষ ভিড় করেছিলেন। তাঁরা কান্নাভেজা চোখে জাপানের শেষ দুটি জায়ান্ট পান্ডাকে বিদায় জানিয়েছেন। আগামীকাল মঙ্গলবার সেখানে থাকা পান্ডা দুটি চীনে ফেরত যাচ্ছে।

টোকিওর উয়েনো চিড়িয়াখানায় থাকা যমজ পান্ডাশাবকের নাম শাও শাও এবং লেই লেই। তাদের বিদায় জানাতেই রোববার আবেগঘন ওই পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল। দর্শনার্থীরা প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে পান্ডাশাবক দুটিকে শেষবারের মতো দেখেন।

চীনের এই পান্ডা ফেরত নেওয়া দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের চরম অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সম্প্রতি জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির একটি মন্তব্যের জের ধরে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সম্পর্কের এই অবনতি ঘটেছে। তাকাইচি বলেছিলেন, চীন তাইওয়ানে আক্রমণ করলে টোকিও সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করবে।

জাপানের প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পর দ্রুত বেইজিং ও টোকিওর মধ্যে সম্পর্ক তলানিতে নেমে যায়।

ধারণা করা হচ্ছে, এর জেরে চীন জাপানকে দেওয়া তাদের পান্ডা ফেরত নিচ্ছে। এই পান্ডাশাবক দুটি চলে গেলে ১৯৭২ সালের পর প্রথমবারের মতো জাপান পান্ডাশূন্য হয়ে যাবে। ১৯৭২ সালে চীন ও জাপান নিজেদের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছিল। তখন চীন জাপানে পান্ডা পাঠিয়েছিল।

১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে চীন নিজের আন্তর্জাতিক মিত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রতি সদিচ্ছার প্রতীক হিসেবে জায়ান্ট পান্ডা উপহার পাঠায়, এটি ‘পান্ডা কূটনীতি’ নামে পরিচিত।

উয়েনো চিড়িয়াখানায় লেই লেইয়ের ছবি তুলছেন দর্শনার্থীরা। ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫, টোকিও

তবে চীনের এই উপহার আদতে ধার হিসেবে থাকে। অর্থাৎ চীন উপহার পাঠানো পান্ডার মালিকানা বিদেশি রাষ্ট্রকে দেয় না। দেশটি পান্ডার মালিকানা নিজের হাতে রাখে, এমনকি বিদেশে জন্মানো পান্ডাশাবকও এ নিয়মের অন্তর্ভুক্ত। শুধু তা–ই নয়, পান্ডা গ্রহণকারী দেশগুলো প্রতি জোড়ার জন্য বছরে প্রায় ১০ লাখ ডলার ফি দেয়।

টোকিও মেট্রোপলিটন সরকারের তথ্যানুযায়ী, উয়েনো চিড়িয়াখানায় প্রিয় পান্ডাগুলোকে শেষবার দেখার জন্য প্রায় এক লাখ আট হাজার মানুষ প্রতিযোগিতা করেছেন। অথচ মাত্র ৪ হাজার ৪০০ দর্শনার্থী প্রবেশের সুযোগ ছিল, তাই ইচ্ছা থাকার পরও সবাই পান্ডা দেখার সুযোগ পাননি।

ছেলেকে নিয়ে চিড়িয়াখানায় আসা এক নারী বিবিসিকে বলেন, ‘আমি আমার ছেলেকে তার ছোটবেলা থেকে এখানে নিয়ে আসছি। আশা করি, এটি তার জন্য একটি ভালো স্মৃতি হয়ে থাকবে। তাদের মনে রাখতে আজ এখানে আসতে পারায় আমরা খুবই খুশি।’

অন্য এক নারী বলেন, তিনি পান্ডাগুলোকে একেবারে ছোট বয়স থেকে বড় হতে দেখছেন, যা সত্যিই আনন্দের অভিজ্ঞতা।

কয়েকটি ছবিতে চিড়িয়াখানায় দর্শনার্থীদের কাউকে কাউকে পান্ডাশাবকদের বিদায় জানাতে গিয়ে কাঁদতে দেখা গেছে। শাও শাও এবং লেই লেই ২০২১ সালে উয়েনো চিড়িয়াখানায় জন্মে। সেগুলোর মায়ের নাম শিন শিন এবং বাবা রি রি। এই দুটি পান্ডাকে প্রজনন গবেষণার জন্য জাপানে ধার দেওয়া হয়েছিল।

সম্প্রতি চীনের পান্ডা ধার দেওয়ার কার্যক্রম বড় বড় বাণিজ্যচুক্তির সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে।

২০১১ সালে স্কটল্যান্ডের সঙ্গে চীনের স্যামন মাছ, ল্যান্ড রোভার গাড়ি এবং জ্বালানি প্রযুক্তি সরবরাহ চুক্তি নিয়ে আলোচনার সময় এডিনবরা চিড়িয়াখানাকে দুটি পান্ডা ধার দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।

গত কয়েক বছরে অনেক পান্ডা চীনে ফেরত এসেছে। সাধারণত একটি পান্ডা ধার চুক্তি ১০ বছর মেয়াদি হয়, যদিও হরহামেশাই চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি পায়।

দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় চীনের নতুন করে জাপানে পান্ডা ধার দেওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রীর তাইওয়ান–সংক্রান্ত মন্তব্য বেইজিংকে ক্ষুব্ধ করেছে।

চীন-জাপানের কূটনীতির কেন্দ্রে কেন পান্ডা

বেইজিং স্বশাসিত দ্বীপ তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ মনে করে এবং আবার চীনের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে একত্র করতে শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনাও বাতিল করেনি।

তাকাইচির মন্তব্যের পর চীন ও জাপানের মধ্যে শত্রুতাপূর্ণ কর্মকাণ্ড ও বক্তব্য বেড়ে গেছে। এই মাসের শুরুতে চীন প্রতিবেশী জাপানে বিরল খনিজ–সম্পর্কিত পণ্যের রপ্তানিতে কড়াকড়ি আরোপ করেছে।