তিন বন্ধুর হাত ধরে সবুজ প্রকল্পে এগোচ্ছে মালয়েশিয়া

প্লাস এক্সনার্জির সিইও চুয়ান ঝেন কো।
ছবি: প্লাস এক্সনার্জির ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া

মালয়েশিয়ার জ্বালানি খাতে একজন সফল উদ্যোক্তা চুয়ান ঝেন কো। প্রায় ১৫ বছর আগে তিনি নবায়নযোগ্য শিল্প প্রতিষ্ঠা করেছেন। ১২টিরও বেশি দেশে সবুজ প্রকল্প নিয়ে সফলভাবে কাজ করেছেন তিনি। এরপর নিজ দেশ মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে থিতু হয়েছেন। সেখানেই এখন সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছেন ৩৯ বছর বয়সী কো।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুরু থেকেই চুয়ান ঝেন কোর বিশুদ্ধ জ্বালানি ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কাজ করার ঝোঁক ছিল। এ কাজে তাঁকে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন তাঁরই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রভাষক। তাঁর উৎসাহে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট আল গোরের জলবায়ু উষ্ণতা নিয়ে সচেতনতামূলক প্রচারণার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত ২০০৬ সালের অস্কারজয়ী তথ্যচিত্র ‘অ্যান ইনকনভিনিয়েন্ট ট্রুথ’ দেখে এই ঝোঁক আরও বেড়ে যায় কোর।

২০১২ সালে কো তাঁর দুই স্কুল বন্ধু রায়ান ওহঝি কাং ও পোহ তং হুয়েইকে সঙ্গে নিয়ে প্লাস এক্সনার্জি নামের একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তিনি বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানের গ্রুপ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)। এই প্রতিষ্ঠানটি শুরুতে বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ভবনে নিজস্ব সৌরবিদ্যুৎব্যবস্থা চালু করত। নানা জায়গা থেকে বিশুদ্ধ জ্বালানি সরবরাহ করত। সাত শতাধিক ভবনে এই প্রতিষ্ঠানটি বিশুদ্ধ জ্বালানি সরবরাহ করেছে।

পরে এই উদ্যোক্তারা খুচরা আসবাব বিক্রেতা আইকেআইএ, লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠান ডিএইচএল, সনির সঙ্গে কাজ করেছেন। পরে তাঁরা সারা দেশে ছয়টি সৌরশক্তিচালিত প্রতিষ্ঠান চালু করেন। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে সচেতনতা বাড়াতেই তাঁরা এই কাজ শুরু করেছেন বলে জানিয়েছেন চুয়ান ঝেন কো।

কোর বন্ধু পোহ তং হুয়েই।

কো ও অন্য জ্বালানিবিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়া বিশুদ্ধ জ্বালানি সম্প্রসারণে অনেক পিছিয়ে আছে। এর মূল কারণ আর্থিক প্রণোদনা ও বিনিয়োগের অভাব এবং লাল ফিতার দৌরাত্ম্য। এসব কারণে জলবায়ু লক্ষ্য পূরণে দেশটির উচ্চাভিলাষী বড় বড় প্রকল্পগুলো আটকে আছে।
চুয়ান ঝেন কো বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে কাজ করার ক্ষেত্রে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মালয়েশিয়ার অবস্থান গড়পড়তা।

এ অঞ্চলের অনেক দেশের মতোই মালয়েশিয়ায়ও নিয়মিত চরম আবহাওয়া, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার প্রভাব, দাবানল, কুয়াশা, খরা ও ভয়াবহ বন্যা আঘাত হানে। ২০২১ সালের শেষের দিকে হওয়া বন্যায় দেশটিতে প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আর বাস্তুচ্যুত হয়েছে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ।
একই বছর জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার জন্য মালয়েশিয়া কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণের হার শূন্য, ২০২৫ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার ৩১ শতাংশ ও ২০৩৫ সালের মধ্যে তা ৪০ শতাংশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দেশটি।

এরপর গত সেপ্টেম্বরে বিগত সরকার ২০৪০ সালের মধ্যে মোট জাতীয় সরবরাহকৃত জ্বালানির মধ্যে ১৭ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে একটি নীতিমালা প্রকাশ করে।

কোর বন্ধু রায়ান ওহঝি কাং।

ডেটা কোম্পানি গ্লোবালডেটা গত সপ্তাহে মালয়েশিয়ার জ্বালানি খাত নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই কোম্পানির জ্বালানিবিশেষজ্ঞ আত্তাউররহমান ওজিনদারম সাইবাসান বলেছেন, বর্তমানে মালয়েশিয়ার মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার মাত্র ৯ শতাংশ হচ্ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি। এ কারণে জ্বালানি নিয়ে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ‘খুবই অবাস্তব’ মনে হচ্ছে। দেশটির নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে জোরালো নীতির অভাব আছে।

সাইবাসান বলেন, ‘দেশটিতে বড় আকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কোনো প্রণোদনা নেই। মালয়েশিয়ার জ্বালানি খাতে বর্তমানে জলবায়ুর জন্য ক্ষতিকর কয়লা ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মিশ্রণ আছে প্রায় ৭৫ শতাংশ।’

বিনিয়োগে ধীরগতি

মালয়েশিয়ায় গত জাতীয় নির্বাচনে পরিবেশ ইস্যু খুব বেশি গুরুত্ব পায়নি। পুরো নির্বাচনকে প্রভাবিত করেছে মূলত অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়।

সাইবাসান বলেন, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের চেয়েও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে পিছিয়ে আছে মালয়েশিয়া। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক সংকট ও বিশুদ্ধ জ্বালানি নিয়ে শক্তিশালী নীতির অভাবে সরকার বড় আকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগে করতে হিমশিম খাচ্ছে। যদিও নবায়নযোগ্য জ্বালানি জীবাশ্ম জ্বালানির চেয়েও আকর্ষণীয়।

প্লাস এক্সনার্জি সারা দেশে ছয়টি সৌরশক্তিচালিত প্রতিষ্ঠান চালু করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মালয়েশিয়া এর আগে সৌরশক্তিতে বিনিয়োগের জন্য প্রণোদনা দিয়েছে। সে সময় এই খাতে ব্যাপক সম্ভাবনা ছিল। মালয়েশিয়ার জন্য অন্য বিকল্পগুলোর মধ্যে ছিল পাম তেল শিল্প থেকে পাওয়া জৈবশক্তি ও জলবিদ্যুৎ।

কুয়ালালামপুরে বোস্টন কনসালটিং গ্রুপের অংশীদার জোয়েল কোয়াং বলেছেন, পাওয়ার গ্রিডের আধুনিকীকরণ, জ্বালানি সঞ্চয় ও বড় আকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের জন্য এই দশকের শেষের দিকে বড় আকারের বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে।

কোয়াং আরও বলেন, দেশটির উত্তরাঞ্চল সৌরশক্তির জন্য সবচেয়ে উপযোগী এলাকা। এ ছাড়া দক্ষিণে শিল্প এলাকা ক্লাং উপত্যকায়ও এর চাহিদা বেড়ে যাবে। এই এলাকা রাজধানী কুয়ালালামপুরের সঙ্গে সংযুক্ত।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, নিজস্ব নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প চালু হলে বা প্রতিবেশী অন্যান্য দেশের সঙ্গে যৌথভাবে চালু করলেও বোর্নিও দ্বীপের সাবাহ এবং সারাওয়াক রাজ্যগুলোও এ থেকে দারুণ উপকৃত হবে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়া বিশুদ্ধ জ্বালানি সম্প্রসারণে অনেক পিছিয়ে আছে। এর মূল কারণ আর্থিক প্রণোদনা ও বিনিয়োগের অভাব এবং লাল ফিতার দৌরাত্ম্য।

জোয়েল কোয়াং উল্লেখ করেন, ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণের হার শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা উন্নয়নশীল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি দেশের জন্য ইতিবাচক। তবে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সম্প্রসারণ করতে অন্যান্য লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ করতে হবে।

এ ব্যাপারে মালয়েশিয়ার জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কাছে জানতে চাইলে মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।

ব্যয়বহুল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র

সাম্প্রতিক মাসগুলোয় ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনাম কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র শিগগিরই বন্ধ করার জন্য ধনী দেশগুলোর সঙ্গে বড় অঙ্কের অর্থ চুক্তি করেছে। এ ছাড়া গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর চুক্তিও করেছে তারা।

কোর জ্বালানি প্রতিষ্ঠান প্লাস এক্সনার্জি দেশটিতে সৌরশক্তি সরবরাহ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি নানা কাজে যুক্ত হয়েছে।

জোয়েল কোয়াং কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র পর্যায়ক্রমে বন্ধের উদ্যোগ নিতে স্পষ্ট অঙ্গীকার করার জন্য মালয়েশিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘কয়লা ব্যয়বহুল। বর্তমানে দেশের সব কয়লা আমদানি করতে হয়।’ বন্ধের উদ্যোগে বাণিজ্যিক অবস্থান উন্নত হবে বলেন তিনি। কয়লার জন্য মালয়েশিয়া মূলত ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার ওপর নির্ভরশীল।

সিঙ্গাপুরের এনার্জি ইনস্টিটিউটের প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পিটার গডফ্রে বলেছেন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ ত্বরান্বিত করে অনুরূপ জ্বালানি রূপান্তর চুক্তি নিয়ে দাতাদের সঙ্গে মালয়েশিয়া আলোচনা করবে বলে তিনি আশাবাদী। তিনি বলেন, আধুনিক বা তুলনামূলক নতুন কয়লা খুব ব্যয়বহুল একটা ব্যাপার। এর জন্য বিপুল অর্থ কে দেবে?’

কোর নানা উদ্যোগ

জ্বালানি উদ্যোক্তা চুয়ান ঝেন কো বলেছেন, মালয়েশিয়া নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি দেশটির জন্য অনিবার্য।

এক সাক্ষাৎকারে কো বলেছেন, ব্যবসা খাত শ্রমিক ও কাঁচামালের ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধির কারণে ব্যাপক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। সৌরশক্তির ব্যবহার এ ক্ষেত্রে কিছুটা সহায়তা করতে পারে। এ ছাড়া এর ব্যবহার দেশের বিশুদ্ধ জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে যে বাস্তবের বিশাল ব্যবধান তা–ও কমাতে সহায়তা করবে। তবে সরকার এ ক্ষেত্রে নিয়মিত ভর্তুকি চালিয়ে যেতে পারে না।

গত সেপ্টেম্বরে বিগত সরকার ২০৪০ সালের মধ্যে মোট জাতীয় সরবরাহকৃত জ্বালানির মধ্যে ১৭ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে একটি নীতিমালা প্রকাশ করে।

কোর জ্বালানি প্রতিষ্ঠান প্লাস এক্সনার্জি দেশটিতে সৌরশক্তি সরবরাহ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি নানা কাজে যুক্ত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা মূল্যে প্রকৌশল বিষয়ে কর্মশালার আয়োজন করে। বিশুদ্ধ জ্বালানি ব্যবহার করতে চাওয়া কোম্পানিগুলোকে অল্প সুদে ঋণ দেওয়ার জন্য ব্যাংকগুলোকে আহ্বানও জানিয়েছে কোর প্রতিষ্ঠান।