
নেপালের একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের সুড়ঙ্গে কাজ করছিলেন কর্মীরা। হঠাৎ বাতাসের প্রবল ঝাপটা এসে লাগে। বাতাস এতটাই প্রবল ছিল, সেখানে রাখা প্লাইউডের পাতগুলো উড়ে যায়। ভারী যন্ত্রপাতিও জায়গা থেকে সরে যায়। এরপরই হুড়মুড়িয়ে পানি ঢুকতে শুরু করে।
এভাবেই গত সপ্তাহের আকস্মিক ও প্রাণঘাতী প্রবল পাহাড়ি ঢলের মুহূর্তের কথা স্মরণ করছিলেন বেঁচে ফেরা পেমবা দুনদু তামাং। তাঁদের প্রায় ৩০ জনের একটি দল তখন ত্রিশূলী নদীর ওপর জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের সুড়ঙ্গের ভেতরে কংক্রিটের আস্তর দেওয়ার কাজ করছিল।
বিবিসিকে তামাং বলেন, ‘(বিপদ দেখে) আমি সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখের দিকে দৌড়াতে শুরু করি। ঢলের পানি আমার পেছনের দিকে ধেয়ে আসছিল। আমি সামনে দৌড়াচ্ছিলাম।’
প্রলয়ংকরী ওই ঢলে বাড়িতে থাকা পরিবারের কয়েকজন সদস্যকে চিরতরে হারিয়েছেন তামাং। নেপালে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে প্রাণঘাতী এ দুর্যোগে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা এরই মধ্যে হাজার ছাড়িয়েছে। নিখোঁজ ব্যক্তির সংখ্যা ৪ হাজারের বেশি।
চীন-নেপাল-ভারতের বিশেষজ্ঞরা একযোগে উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এ কাজে তাঁরা খননযন্ত্র ও ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করছেন। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোয় ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে আটকে পড়া শ্রমিকদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন তাঁরা।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে একাধিক জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের সুড়ঙ্গে আটকে পড়া কয়েক শ শ্রমিক রয়েছেন বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। চলছে উদ্ধারকাজ। তামাংয়ের মতো এসব কর্মী নদীতীরে থাকা জলবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিশাল সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্কে কাজ করছিলেন। এখন উদ্ধার অভিযান জোরদার করতে প্রকৌশলীরা এসব সুড়ঙ্গে বাতাস সরবরাহের কাজ করছেন।
নেপালের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেত এএফপিকে বলেন, ‘আমরা সুড়ঙ্গগুলোয় অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজে মনোযোগ দিচ্ছি। কাজ চলছে। সেনারা মরদেহ উদ্ধার ও রোগের বিস্তার ঠেকাতে কাজ করছে।’
সেনাবাহিনী জানিয়েছে, গতকাল মঙ্গলবার ১১৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।
স্মৃতি হাতড়ে তামাং বলেন, ঢল থেকে প্রাণ বাঁচাতে তিনি মিনিট কুড়ি দৌড়েছিলেন। পাহাড়ের দিকে উঠে যান। আঘাত পেয়েছিলেন। বলেন, ‘প্রায় অচেতন হয়ে পড়ি। ঠিকমতো চিন্তা করতে পারছিলাম না।’
তামাংয়ের সহকর্মী ইথা ঘালেও বেঁচে ফিরেছেন। তিনি বলেন, দৌড়ানোর সময় প্রবল বাতাসের ঝাপটা তাঁদের প্রায় উড়িয়ে নিচ্ছিল।
ঢলে ভেসে গেছে বাড়ি
নেপালে উৎপাদিত বিদ্যুতের ৯৯ শতাংশের বেশি আসে জলবিদ্যুৎ থেকে। তামাং আর ঘালে ‘আপার ত্রিশূলী ৩বি’ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে সুড়ঙ্গ নির্মাণে যুক্ত ছিলেন।
এভাবে চলতে থাকলে আমাদের না খেয়ে থাকতে হবে। কখনো কখনো মনে হয়, বেঁচে না থাকলেই হয়তো ভালো হতো।পেমবা দুনদু তামাং, ঢলে বেঁচে ফেরা ব্যক্তি
প্রকল্পটি আগামী বছর চালু হওয়ার কথা। উজানে থাকা একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবহৃত পানি আবার কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা ছিল। সেই বিদ্যুৎ নেপালের জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা।
এ প্রকল্পে কয়েকটি দল আলাদাভাবে কাজ করছিল। তামাং বলেন, বড় সুড়ঙ্গে কংক্রিটের আস্তর দেওয়ার যন্ত্র পরিচালনাকারী দলটি সবার শেষে বের হতে পেরেছিল। এরপর তাদের চোখের সামনে আসে ভয়াবহ বাস্তবতা।
তামাং বলেন, ‘আমাদের বাড়ি যেখানে থাকার কথা, সেখানে তাকিয়ে দেখি, কিছুই নেই। বুঝলাম, সব শেষ হয়ে গেছে।’
তামাংয়ের পরিবারের ছয় সদস্য এ দুর্যোগে প্রাণ হারিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে তামাংয়ের মা, বড় ভাই, ভাবি ও তাঁদের তিন সন্তান রয়েছেন। ঢলের সময়টায় তাঁরা নদীর তীরে নিজেদের বাড়িতে ছিলেন। তামাংয়ের স্ত্রী, ছেলে ও এক ভাতিজা বেঁচে গেছেন।
‘এখন আমার কাছে জীবন অর্থহীন মনে হয়। বেঁচে থাকাটাই কষ্টের। কোথায় খাব, কোথায় যাব, কিছু জানি না,’ বলছিলেন স্বজন হারানো তামাং। বলেন, ‘যাঁরা মারা গেছেন, তাঁরা শান্তিতে আছেন। আমরা যারা বেঁচে আছি, কষ্ট তো আমাদের।’
ঘালেও তাঁর পরিবারের আট সদস্য হারিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে তাঁর মা ও বড় মেয়ে রয়েছেন। যদিও স্ত্রী ও তিন ছেলে বেঁচে গেছেন।
ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা
ঘরবাড়ি আর স্বজন হারিয়ে এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন তামাং। বিশেষ করে দুর্যোগের পর জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো বন্ধ হয়ে গেলে কী হবে, তা নিয়ে তিনি চিন্তিত।
তামাং বলেন, ‘এভাবে চলতে থাকলে আমাদের না খেয়ে থাকতে হবে। কখনো কখনো মনে হয়, বেঁচে না থাকলেই হয়তো ভালো হতো।’
ঢলের সময় দৌড়ে পাহাড়ে উঠে প্রাণ বাঁচানোর পর অন্য কয়েকজনের সঙ্গে শান্তিবাজার নামে একটি গ্রামে আশ্রয় নেন তামাং। দুই দিন সেখানেই ছিলেন। পরে সেনাবাহিনী এসে তাঁদের উদ্ধার করে।
তামাংয়ের ধারণা, তাঁর সঙ্গে ৫০ থেকে ৬০ জন সুড়ঙ্গ থেকে বের হতে পেরেছিলেন। বাকিরা হয়তো আটকা পড়েছেন। তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আর সুরক্ষাব্যবস্থা আগে থেকে থাকলে আরও অনেক মানুষকে বাঁচানো যেত।
লক্ষণ ছিল, সতর্কবার্তা ছিল না
এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্যোগের কয়েক দিন আগেই হিমবাহের আশপাশে অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা গিয়েছিল। উন্নত ও আগাম সতর্কব্যবস্থা থাকলে আরও বেশি মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হতো।
দুর্যোগের আগে স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবিতে দেখা গেছে, হিমবাহের ওপরের অংশ দ্রুত সরে যাচ্ছিল। বরফ গলে জমা পানি ক্রমে বাদামি হয়ে উঠছিল। আশপাশের পাহাড়ি পাথরে ফাটল তৈরি হচ্ছিল। এশিয়ান মাউন্টেন একাডেমিক অ্যালায়েন্স, স্টিমসন সেন্টার ও চীনের ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেন হ্যাজার্ডস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের বিশেষজ্ঞরা এসব তথ্য জানান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এগুলো সবই পাহাড়ের ঢালে অস্বাভাবিকতার লক্ষণ। তবে প্রলয়ংকরী পাহাড়ি ঢল এতটাই তীব্রগতিতে আর দ্রুত নিচের দিকে নেমে এসেছিল যে প্রচলিত সতর্কব্যবস্থা দিয়ে কাছাকাছি থাকা মানুষদের সতর্ক করা সম্ভব ছিল না।
দ্রুত উদ্ধারের প্রত্যাশা
আরও ভাটির দিকের পরিস্থিতি যদিও ভিন্ন ছিল। সেসব জায়গায় ঢলের পানি পৌঁছাতে মিনিট দশেক বা তার বেশি লেগেছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, সেসব এলাকায় একটি সমন্বিত আগাম সতর্কব্যবস্থা থাকলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের প্রাণ বাঁচানো যেত।
চীন-নেপাল-ভারতের বিশেষজ্ঞরা এখন একযোগে উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এ কাজে তাঁরা খননযন্ত্র ও ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করছেন। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোয় ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে আটকে পড়া শ্রমিকদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন তাঁরা।
তামাংয়ের পরিচিত অনেকে এখনো জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকা পড়ে আছেন। তিনি বলেন, ‘সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকা পড়া অনেককেই আমি চিনি। তাঁদের কেউ কেউ হয়তো এখনো বেঁচে আছেন। তাঁদের দ্রুত উদ্ধার করা গেলে আমি খুশি হব।’