মাহিন্দা রাজাপক্ষে
মাহিন্দা রাজাপক্ষে

ফিরে দেখা

মাহিন্দা রাজাপক্ষে—নায়ক থেকে খলনায়ক বনে যাওয়া এক নেতা

শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে সবেচেয়ে প্রতাপশালী নেতাদের একজন মাহিন্দা রাজাপক্ষে। দেশটিতে ২৬ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধ অবসানে তিনি বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। আজকের শ্রীলঙ্কার অবকাঠামোগত উন্নয়নেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। একই সঙ্গে স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ও বিরোধী মত দমনে মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। ২০২২ সালের আজকের দিনে পদত্যাগের ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়েছিলেন মাহিন্দা রাজাপক্ষে। অর্ধশতাব্দীর বর্ণিল রাজনৈতিক জীবনে ক্ষমতার চূড়া থেকে পতনের চূড়ান্ত সীমা দেখতে হয়েছিল তাঁকে।

২০২২ সাল; দুই বছর ধরে চলা করোনা মহামারির থাবা থেকে সবে মুক্ত হয়েছে বিশ্ব, সচল হতে শুরু করেছে অর্থনীতির চাকা। কিন্তু ভারত মহাসাগরের ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার আকাশে তখন কালো মেঘের ঘনঘটা।

বছরের শুরুতেই দিনের অর্ধেক সময় বিদ্যুৎ থাকছে না, লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ জনজীবন; জ্বালানির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও পাওয়া যাচ্ছে না তেল–গ্যাস; দ্রব্যমূল্য আকাশ ছুঁয়েছে, মূল্যস্ফীতি ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।

স্বাধীনতার পর সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে পুরো শ্রীলঙ্কা তখন ক্ষোভে ফুসছিল। জনগণ দেশের নজিরবিহীন এ অর্থনৈতিক দুর্দশার জন্য সরকারের দুর্নীতি ও আর্থিক অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন। শ্রীলঙ্কার ক্ষমতার লাগাম তখন দুই রাজাপক্ষে ভাইয়ের হাতে।

বড় ভাই মাহিন্দা রাজাপক্ষে প্রধানমন্ত্রী, আর ছোট ভাই গোতাবায়া রাজাপক্ষে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট। বছরের শুরু থেকেই রাজধানী কলম্বোসহ দেশের নানা প্রান্তে সরকারের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে ছোট ছোট বিক্ষোভের ঘটনা ঘটছিল। দ্রুতই সে বিক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করে। ৩১ মার্চ থেকে দুই ভাইয়ের পদত্যাগের দাবিতে শুরু হয় গণবিক্ষোভ।

বিক্ষোভ দমনে কঠোর হয় সরকার। পরদিন ১ এপ্রিল দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। এর পরদিন দেশজুড়ে জারি হয় ৩৬ ঘণ্টার কারফিউ, করা হয় সেনা মোতায়েন।

শুরুতে দমনের চেষ্টা, পরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা। তবু শেষ রক্ষা হয়নি। গণ–আন্দোলনের মুখে ৯ মে (আজকের এই দিনে) পদত্যাগ করতে বাধ্য হন মাহিন্দা রাজাপক্ষে।

কিন্তু মাহিন্দার পদত্যাগের ঘোষণায়ও থামেনি জনরোষ। বিক্ষোভকারীরা তাঁর বাড়িতে হামলা চালান। রাতের অন্ধকারে সেনা পাহারায় সপরিবার কলম্বোর সরকারি বাসভবন ছাড়েন মাহিন্দা রাজাপক্ষে।

শৈশব ও রাজনীতিতে পদার্পণ

ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে শ্রীলঙ্কার জন্ম হয় ১৯৪৮ সালে। এর আগে থেকেই দেশটির রাজনীতিতে সুপরিচিত রাজাপক্ষে পরিবার। সামাজিকভাবে অভিজাত এই পরিবারে ১৯৪৫ সালের ১৮ নভেম্বর জন্ম হয় মাহিন্দা রাজাপক্ষের। তাঁর বাবা ডন আলউইন রাজাপক্ষে।

শ্রীলঙ্কার প্রথম পার্লামেন্টে রাজাপক্ষে পরিবারের যে দুই সদস্য ছিলেন, তাঁদের একজন মাহিন্দার বাবা। তিনি শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টির (এসএলএফপি) প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন, দুবার এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। শৈশব থেকেই পরিবারে রাজনৈতিক আবহ দেখে বড় হয়েছেন মাহিন্দা।

১৯৭০ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে মাহিন্দা শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হন। তখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে লেখাপড়া শেষ হয়নি তাঁর। পাঁচ বছর আগে বাবার ছেড়ে দেওয়া আসনে সেবার নির্বাচিত হয়েছিলেন মাহিন্দা।

অবশ্য ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে মাহিন্দা হেরে যান এবং আইন পেশায় মনোযোগ দেন। ১৯৭৪ সালে মাহিন্দা কলম্বো ল কলেজ থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন।

রাজনীতিতে ফেরা ও প্রভাবশালী হয়ে ওঠা

শ্রীলঙ্কার প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী শ্রীমাভো বন্দরনায়েকে। ১৯৯৪ সালে বন্দরনায়েকের কাছে থেকে এসএলএফপির নেতৃত্ব চলে যায় চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গার হাতে। তত দিনে রাজনীতিতে দুই দশক পার করে ফেলেছেন মাহিন্দা রাজাপক্ষে।

কুমারাতুঙ্গা দুই দফায় শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট ছিলেন। দুবারই তাঁর মন্ত্রিসভায় ছিলেন মাহিন্দা রাজাপক্ষে। ২০০৫ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ছিলেন কুমারাতুঙ্গা। এরপর রাজনীতি থেকে তিনি অবসরে যান। কুমারাতুঙ্গা ২০০৪ সালে মাহিন্দাকে তাঁর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন।

মাহিন্দা রাজাপক্ষে ও তাঁর ভাই গোতাবায়া রাজাপক্ষে (ডানে)

ক্ষমতার কেন্দ্রে

কুমারাতুঙ্গা অবসরে যাওয়ার পর ২০০৫ সালে ইউনাইটেড পিপলস ফ্রিডম অ্যালায়েন্সের (ইউপিএফএ) প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে জয়ী হন মাহিন্দা। শ্রীলঙ্কার ষষ্ঠ প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তিনি ছোট ভাই গোতাবায়া রাজাপক্ষের হাতে তাঁর প্রতিরক্ষা দপ্তরের দায়িত্ব তুলে দেন।

মাহিন্দা যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন শ্রীলঙ্কা সরকারের সঙ্গে তামিল টাইগার্স নামে পরিচিত বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ‘লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলম’ (এলটিটিই) এর একটি শান্তি আলোচনা চলছিল। লক্ষ্য ছিল দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলা গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটানো। উভয় পক্ষ একটি নাজুক যুদ্ধবিরতি চুক্তির মধ্যে ছিল।

কিন্তু দুই রাজাপক্ষে ভাই ক্ষমতায় এসে শান্তি আলোচনার হিসাব–নিকাশ বদলে দেন। বিশেষ করে ছোট ভাই গোতাবায়া সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে তামিল বিদ্রোহীদের (এলটিটিই) পরাস্ত করতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। সেনাপ্রধান থাকার সময় গোতাবায়ার বিরুদ্ধে বিরোধী, বিশেষ করে হাজারো সংখ্যালঘু তামিলকে হত্যা ও গুম করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখার অভিযোগ ছিল। বলা হয়, এ কাজের জন্য তিনি ‘ডেথ স্কোয়াড’ গঠন করেছিলেন।

২০০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে গোতাবায়াকে হত্যা করতে আত্মঘাতী হামলা চালানো হয়েছিল। অল্পের জন্য সেবার তিনি প্রাণে রক্ষা পান। শ্রীলঙ্কা সরকার এ হামলার জন্য তামিল টাইগার্সকে দায়ী করে। ওই হামলার পর মাহিন্দা স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন যে ‘শান্তি আলোচনার সব সুযোগ শেষ’। মাহিন্দা তামিল টাইগার্সকে সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করার ঘোষণা দেন।

বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে শ্রীলঙ্কা সরকার বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে। জল, স্থল ও আকাশ—তিন দিক থেকেই তীব্র আক্রমণ শুরু হয়।

সরকারি বাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে একের পর এক এলাকা থেকে তামিল টাইসার্গ সদস্যরা পিছু হটতে থাকেন।

২০০৯ সালের শুরুর দিকে শ্রীলঙ্কার উত্তরাঞ্চলে এলটিটিইর মূল ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কিলিনোচ্চি দখল করে নেয় শ্রীলঙ্কার সরকারি বাহিনী।

ওই বছর মে মাসের মাঝামাঝি সেনাবাহিনীর হামলায় তামিল টাইগার্স নেতা ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণ নিহত হন। ১৮ মে সেনাপ্রধান আনুষ্ঠানিকভাবে প্রভাকরণের নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেন। প্রভাকরণের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শ্রীলঙ্কায় দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধের অবসান হয়।

গৃহযুদ্ধ অবসানের নায়ক, নাকি ‘গণহত্যাকারী’

১৯৭৬ সালে ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণ এলটিটিই গঠন করেছিলেন। শুরুতে ছোট আকারে সক্রিয় থাকলেও পরে শ্রীলঙ্কার উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে একটি স্বাধীন তামিল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে লড়াই শুরু করে তামিল টাইগার্স। ১৯৮৩ সালে শ্রীলঙ্কায় শুরু হয় গৃহযুদ্ধ।

এরপর প্রায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে তামিল টাইগার্স শ্রীলঙ্কার কিছু এলাকায় বিচ্ছিন্নতাবাদী বাহিনী হিসেবে কার্যত একটি সমান্তরাল সরকারব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল।

প্রভাকরণ নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে গৃহযুদ্ধের অবসান হয় ঠিক। কিন্তু যুদ্ধে প্রায় এক লাখ মানুষ নিহত এবং তিন লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন। নিহত ও বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই ছিলেন তামিল।

মাহিন্দাকে গৃহযুদ্ধ অবসানের নায়ক হিসেবে দেখা হলেও তাঁর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের একাধিক অভিযোগ রয়েছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, গৃহযুদ্ধের শেষ দিকে কথিত ‘গুলিবর্ষণ নিষিদ্ধ এলাকায়’ শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনীর বোমাবর্ষণে প্রায় ৪০ হাজার বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। যদিও মাহিন্দা নিহতের এ সংখ্যা অস্বীকার করেন। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক তদন্তের প্রস্তাবও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।

সমালোচকেরা বলেন, গৃহযুদ্ধ শেষ হলেও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা শ্রীলঙ্কার সংখ্যালঘু তামিলদের সঙ্গে বিভেদ দূর করতে তেমন কিছু করেননি। গৃহযুদ্ধে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণ করতে তামিলদের বাধা দেওয়া ও তাঁদের কোণঠাসা করে রাখার অভিযোগও রয়েছে মাহিন্দার বিরুদ্ধে।

চীনা ঋণের অর্থে শ্রীলঙ্কার হামবানটোটায় নির্মাণ করা হয়েছে গভীর সমুদ্রবন্দর

স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা

গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে দেশের সাধারণ জনগণের চোখে ‘নায়ক’ বনে যান মাহিন্দা, বিশেষ করে দেশটির সংখ্যাগুরু সিংহলিদের কাছে। ২০০৯ সালের পর রাজাপক্ষে পরিবারকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি।

সামরিক কায়দায় শ্রীলঙ্কা শাসন করতে শুরু করেন রাজাপক্ষে ভাইয়েরা। পরিবারের সদস্যদের সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বসান মাহিন্দা। দেশে রাজাপক্ষেরাই রাজা হয়ে ওঠেন। একচেটিয়া আধিপত্যের সুযোগে শুরু হয় দুর্নীতি।

রাজাপক্ষে ভাইয়েরা চীনের দিকে হেলে পড়তে শুরু করেন। অবশ্য শ্রীমাভো বন্দরনায়েকের সময় থেকেই বেইজিং ছিল কলম্বোর বন্ধু। রাজাপক্ষেদেরও একই অবস্থান দেখে শ্রীলঙ্কার অবকাঠামো খাতে ব্যাপক বিনিয়োগের আগ্রহ দেখায় চীন। ২০১১ সালে হামবানটোটায় গভীর সমুদ্রবন্দর উদ্বোধন করা হয়। চীনের উদ্যোগে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) অধীন বিভিন্ন দেশে ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের অংশ ছিল হামবানটোটা গভীর সমুদ্রবন্দর।

বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ করতে গিয়ে চীনের কাছে একের পর এক ঋণ নেয় শ্রীলঙ্কা। একপর্যায়ে ঋণ শোধ করতে না পেরে হামবানটোটা বন্দর চীনের কাছে ৯৯ বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়। দিন যত যায়, ঋণের ভার বাড়তে থাকে।

দেশের অর্থনীতি ঋণনির্ভর হয়ে পড়ে, মাহিন্দার জনপ্রিয়তা কমতে থাকে। এ পরিস্থিতিতে ২০১৫ সালের প্রেসিডেন্টে নির্বাচনে হেরে যান মাহিন্দা রাজাপক্ষে। তবে দেশটির রাজনীতিতে তিনি প্রভাবশালী থেকে যান।

রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন

২০১৮ সালে স্থানীয় নির্বাচনে মাহিন্দা আবার দৃশ্যপটে আসেন। তিনি আবার ক্ষমতায় ফিরবেন, এমন শঙ্কা থেকে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহকে বরখাস্ত করেন। অতীতে যাঁর অধীন ছিলেন, সেই মাহিন্দাকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন তিনি। তবে নতুন করে গঠিত এ সরকার বেশি দিন টিকতে পারেনি। রনিল আবার প্রধানমন্ত্রী হন।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কয়েক মাস পরই পদত্যাগ করেছিলেন মাহিন্দা। তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করেন তিনি।

২০১৯ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়। প্রেসিডেন্ট হন গোতাবায়া রাজাপক্ষে। ওই বছর পার্লামেন্ট নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জয় পান মাহিন্দা, নভেম্বরে আবার প্রধানমন্ত্রী হন।

গণবিক্ষোভ ও মাহিন্দার চূড়ান্ত পতন

চীনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে অবকাঠামো খাতে একের পর এক উচ্চাভিলাষী প্রকল্প বাস্তবায়ন করছিল শ্রীলঙ্কা। কিন্তু সেসব প্রকল্প থেকে আয় আসছিল সামান্যই। চীনের ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে অর্থনীতিতে বিপর্যয় নেমে আসে।

শ্রীলঙ্কার জাতীয় আয়ের বড় একটি অংশ আসে পর্যটন খাত থেকে। করোনা মহামারির সময়ে এ আয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে যায়। বিদেশে অবস্থানরত শ্রীলঙ্কানরাও দেশে কম অর্থ পাঠান।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে হামলার জেরে রাশিয়ার তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্ব নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। বৈশ্বিক জ্বালানির বাজারে এর জোর ধাক্কা লাগে।

সব মিলিয়ে নজিরবিহীন অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে শ্রীলঙ্কা। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তলানিতে গিয়ে ঠেকে। এমনকি জ্বালানি, ওষুধসহ নিত্যপণ্য আমদানির জন্য পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা দেশটির সরকারের হাতে ছিল না।

ফলে অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতি দেখা দেয়; দিনের পর দিন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং চলতে থাকে। জ্বালানি তেলের জন্য তেলের পাম্পে লাইন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে।

শ্রীলঙ্কার শাসকদলের এক সমর্থক সরকারবিরোধী এক বিক্ষোভকারীর ওপর হামলা করেন। কলম্বো, ২০২২ সাল

২০২২ সালের ১২ এপ্রিল শ্রীলঙ্কা সরকার নিজেদের বৈদেশিক ঋণখেলাপি হিসেবে (৫১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ঘোষণা দেয়। অতি প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও শেষের দিকে বলে জানায়।

চীনের কাছ থেকে কোটি কোটি ডলার ঋণ নিয়ে যে বিশাল বিশাল অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছিল, সেগুলোর বেশির ভাগই অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে। দেশবাসীর চোখে সেগুলো রাজাপক্ষে ভাইদের উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে নয়, বরং তাঁদের আমলের আর্থিক অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত হতে থাকে।

এপ্রিলের শুরু থেকেই সরকারবিরোধী আন্দোলন তীব্র হতে থাকে। মন্ত্রিসভার একের পর এক সদস্য পদত্যাগ করতে থাকেন। বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দার পদত্যাগ দাবি করেন।

বিক্ষোভ দমনে সরকার দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করে, কারফিউও জারি হয়। অন্যদিকে বিক্ষোভকারীরা দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেন, অচল হয়ে পড়ে শ্রীলঙ্কা।

৬ মে আবারও ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়, আর সরকার জারি করে জরুরি অবস্থা। সেদিন মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দাকে পদত্যাগ করতে বলেন তাঁর ভাই তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষে।

শ্রীলঙ্কার সংখ্যাগুরু সিংহলি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের একটি অংশের মধ্যে মাহিন্দা তখনো বেশ জনপ্রিয়। ৯ মে সারা দেশ থেকে বাস ভর্তি করে মাহিন্দার সমর্থকেরা রাজধানীতে আসেন। নিজের বাসভবনের কাছে এক সমাবেশে তাঁদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন তিনি।

পরে প্রধানমন্ত্রীর অনুসারীরা বিক্ষোভকারীদের ওপর চড়াও হন। আগুন ধরিয়ে দেন সরকারবিরোধী ব্যানার-প্ল্যাকার্ডে। পরে প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের বাইরে অবস্থানরত বিক্ষোভকারীদের ওপরও হামলা চালান মাহিন্দার সমর্থকেরা।

শ্রীলঙ্কা পরিণত হয় রণক্ষেত্রে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় হাজার হাজার সরকারবিরোধী মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। সরকার–সমর্থকদের সঙ্গে সহিংসতায় জড়িয়ে পড়েন তাঁরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কলম্বোয় টিয়ার শেল ও জলকামান ব্যবহার করে পুলিশ। তাতেও কাজ না হলে শহরে কারফিউ জারি করা হয়। পরে সারা দেশে কারফিউ জারি হয়।

গণবিক্ষোভের জেরে পদত্যাগের ঘোষণা দেন মাহিন্দা। কিন্তু তাতে জনরোষ কমেনি। ৯ মে রাতে বিক্ষোভকারীরা রাজধানীতে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ‘টেম্পল ট্রিজে’ হামলা চালান। সপরিবার সেখানে আটকা পড়েন মাহিন্দা। পরদিন ভোরের আলো ফোটার আগে সেনা পাহারায় মাহিন্দা ও তাঁর পরিবারকে সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

প্রথমবার ২০০৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হন মাহিন্দা। এরপর ২০০৫ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত টানা ১০ বছর প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মে মাসে পদত্যাগের আগপর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।

শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর রাজনীতিকের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মাহিন্দা রাজাপক্ষে। তিনি বর্তমানে শ্রীলঙ্কায় নিজেদের পারিবারিক বাড়িতে বসবাস করছেন বলে জানা গেছে।

৭১ বছর বয়সী মাহিন্দার ভবিষ্যতে রাজনীতিতে ফেরার ইঙ্গিত এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স, বিবিসি, এএফপি ও ব্রিটানিকা