নেদারল্যান্ডসের হেগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যার মামলার ঐতিহাসিক শুনানি শুরু হয়। আদালতে গাম্বিয়ার বিচারমন্ত্রী দাওদা জালো ও আইনজীবী আরসালান সুলেমান। ১২ জানুয়ারি ২০২৬, দ্য হেগ
নেদারল্যান্ডসের হেগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যার মামলার ঐতিহাসিক শুনানি শুরু হয়। আদালতে গাম্বিয়ার বিচারমন্ত্রী দাওদা জালো ও আইনজীবী আরসালান সুলেমান। ১২ জানুয়ারি ২০২৬, দ্য হেগ

আল–জাজিরার এক্সপ্লেইনার

গাম্বিয়া কেন রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধনের মামলায় মিয়ানমারের শাস্তি চায়

মিয়ানমারের সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধন চালানোর অভিযোগে গাম্বিয়ার করা ঐতিহাসিক মামলার শুনানি এই সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) শুরু হয়েছে।

গত সোমবার গাম্বিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল ও বিচারমন্ত্রী দাওদা এ জালো আদালতে বলেন, মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ‘নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্য’ নিয়ে কাজ করেছে। প্রায় এক দশক আগে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী একটি অভিযান শুরু করেছিল, যার ফলে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। শরণার্থীরা জাতিগত নিধন, দলবদ্ধ ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন।

এই প্রথম রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে হওয়া ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ কোনো আন্তর্জাতিক আদালতে শুনানি হচ্ছে। এটিই প্রথম, যেখানে আইসিজে অন্য একটি দেশ বা গোষ্ঠীর পক্ষে কোনো তৃতীয় দেশের বিরুদ্ধে আনা জাতিগত নিধনের অভিযোগে করা মামলার রায় দেবেন।

বিরল ও আবেগঘন এক মুহূর্তে জালো আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের ‘পিস হল’–এ উপস্থিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের উঠে দাঁড়াতে বলেন, যেন ১৫ বিচারকের প্যানেল তাঁদের দেখতে পান।

শরণার্থীরা রুদ্ধদ্বার অধিবেশনে সাক্ষ্য দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তবে আদালত কবে চূড়ান্ত রায় দেবেন, তা এখনো জানা যায়নি। আইসিজে তাঁদের রায় সরাসরি কার্যকর করতে পারেন না। তবে এই আদালতের সিদ্ধান্তের ব্যাপক আইনি গুরুত্ব রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার করা মামলার ওপরেও রোহিঙ্গা মামলার এই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়তে পারে। ফিলিস্তিনিদের পক্ষে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকা ওই মামলা করেছিল। সেই মামলায় পরবর্তী সময় আরও বেশ কিছু দেশ যোগ দিয়েছে।

জাতিগত নিধনের অভিযোগে মিয়ানমারের বিচার দাবি করে শরণার্থী রোহিঙ্গাদের বিক্ষোভ। ২৫ আগস্ট ২০২৫, কক্সবাজার

গাম্বিয়া কেন রোহিঙ্গাদের জন্য লড়ছে

২৫ লাখ মানুষ অধ্যুষিত আফ্রিকার ছোট দেশ গাম্বিয়া মুসলিমপ্রধান দেশ হিসেবে ৫৭ সদস্যের ইসলামী সম্মেলন সংস্থার (ওআইসি) পক্ষ হয়ে এই মামলা দায়ের করেছে।

এই পদক্ষেপ নিয়ে গাম্বিয়া ও মামলার মূল পরিকল্পনাকারী সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল আবুবকর তাম্বাদু বিশ্বের নজর কেড়েছেন। তাম্বাদু বর্তমানে জাতিসংঘে কাজ করছেন এবং ২০২১ সালে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন।

পরবর্তী সময় কানাডা, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, মালদ্বীপ, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য—এ সাতটি দেশ আইসিজেতে গাম্বিয়ার মামলাটিকে সমর্থন দেওয়ার আবেদন করে।

রোহিঙ্গাদের ওপর কী ঘটেছিল

২০১৬ সালের শেষভাগ থেকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী (তাতমাদো) রোহিঙ্গাদের ওপর কয়েক মাস ধরে সহিংস অভিযান চালায়। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর মতে, আগে থেকেই বৈষম্যের শিকার এই জনগোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ তখন তীব্রতর হয়। রোহিঙ্গা জনপদগুলোয় অগ্নিসংযোগ, নির্বিচার গুলি, দলবদ্ধ ধর্ষণ ও অপহরণের ঘটনা ঘটে।

যে বছর গাম্বিয়া মামলাটি দায়ের করে, সেই ২০১৯ সালে জাতিসংঘের একটি তথ্য অনুসন্ধানকারী দল জানায়, মিয়ানমারে সেনা অভিযান ও উগ্র বৌদ্ধ গোষ্ঠীর হামলায় ১০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। প্রাণভয়ে ৭ লাখ ৩০ হাজার মানুষ বাংলাদেশে পালিয়ে গেছেন।

জাতিসংঘের ওই মিশন জানায়, এই সামরিক অভিযানের পেছনে ‘জাতিগত নিধনের অভিপ্রায়’ ছিল এবং মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের পরিচয় মুছে ফেলে তাদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দিতে চেয়েছিল।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর বিমান হামলার পর আগুন ধরে যাওয়া একটি বাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে আছেন এক ব্যক্তি

গাম্বিয়ার অনুপ্রেরণা

গাম্বিয়ার সাবেক বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা ইমরান দারবো আল–জাজিরাকে বলেন, গাম্বিয়ার নিজেদের ইতিহাস তাঁদের এই পদক্ষেপে অনুপ্রাণিত করে থাকতে পারে। সাবেক স্বৈরশাসক ইয়াহিয়া জামেহ ২০১৭ সাল পর্যন্ত টানা ২২ বছর গাম্বিয়াকে কঠোর হাতে শাসন করেছিলেন।

২০১৭ সালে নির্বাচনে পরাজয়ের পর জামেহ যখন ক্ষমতা ছাড়তে রাজি হননি, তখন আঞ্চলিক সামরিক বাহিনী তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়। ২০১৮ সালে নতুন সরকার জামেহর আমলের নৃশংসতা ও হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শুরু করে।

যখন রোহিঙ্গা সংকট চরমে, তখন গাম্বিয়ার মানুষ নিজেরাও তাঁদের দেশের অতীতের শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়নের শিকার মানুষের সাক্ষ্য শুনছিলেন।

দারবো বলেন, ‘আমরা তখন নিজেদের ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম এবং মানবাধিকার রক্ষার গুরুত্ব বুঝতে পারছিলাম। মানুষ রোহিঙ্গাদের কষ্ট অনুভব করতে পেরেছিল। তাই আমরা সবাই এই মামলার বিষয়ে একমত ছিলাম।’

আইসিজেতে গাম্বিয়ার যুক্তি কী

বিচারমন্ত্রী দাওদা জালো সোমবার আদালতে বলেন, মিয়ানমারের সামরিক শাসকেরা রোহিঙ্গাদের পরিকল্পিতভাবে নিশানা করেছে। তাদের জীবন তছনছ করে দিয়েছে। তিনি বলেন, মিয়ানমার তাদের স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে, তাদের জীবনকে এক দুঃস্বপ্নে পরিণত করেছে।

গাম্বিয়ার আইনজীবী দলের আরেক সদস্য পল রেইখলার ২০১৭ সালের সাক্ষীদের জবানবন্দি পড়ে শোনান। ওই জবানবন্দিতে জ্যান্ত মানুষসহ ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া ও দলবদ্ধ ধর্ষণের বর্ণনা ছিল।

রেইখলার আরও বলেন, মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ‘অশুদ্ধ ও ঘৃণিত মানুষ’ হিসেবে অভিহিত করেছিল।

ফিলিপ স্যান্ডস নামের দলের তৃতীয় এক সদস্য বলেন, সহিংসতার ব্যাপকতা প্রমাণ করে, মিয়ানমার ‘জাতিগত নিধনের উদ্দেশ্য’ নিয়েই কাজ করেছে।

মিয়ানমারের যুক্তি কী

মিয়ানমারের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিষয়ক মন্ত্রী কো কো হ্লাইংয়ের নেতৃত্বাধীন সে দেশের পক্ষের কৌঁসুলিরা ১৬ জানুয়ারি তাঁদের বক্তব্য দেওয়া শুরু করেন।

২০১৯ সালে যখন মামলাটি হয়, তখন মিয়ানমারে বেসামরিক সরকার ছিল। তৎকালীন নেত্রী অং সান সু চি ব্যক্তিগতভাবে আদালতে হাজির হয়ে গাম্বিয়ার দাবিকে ‘অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। এখন আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে শুনানির সময়ও একই দাবি করছে তারা। তাদের দাবি, গাম্বিয়ার অভিযোগ প্রমাণিত নয়।

২০২০ সালের জানুয়ারিতে আইসিজে মিয়ানমারকে জরুরি ভিত্তিতে রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধন রোধে ব্যবস্থা নেওয়ার আদেশ দেন, যা সু চির জন্য একটি বড় ধাক্কা ছিল।

বর্তমানে মিয়ানমার সামরিক জান্তার অধীনে থাকলেও তারা গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তাদের দাবি, তারা কেবল সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছিল।

কক্সবাজার-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো অপরাধীদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে।

রোহিঙ্গা কারা

রোহিঙ্গারা মুসলিমপ্রধান একটি নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী, যারা মূলত মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বসবাস করে। ২০১৭ সালের আগে সেখানে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা ছিল। এ ছাড়া ভারত, পাকিস্তান ও সৌদি আরবেও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কিছু মানুষ বসবাস করে।

রোহিঙ্গারা নিজেদের মিয়ানমারের আদিবাসী মনে করলেও মিয়ানমার সরকার তাদের নাগরিকত্ব দেয় না এবং তাদের ‘বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে গণ্য করে।

২০১৬ সালে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) নামক একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার অজুহাতে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ভয়াবহ হামলা শুরু করে। এর ফলে অন্তত ৭ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা প্রাণভয়ে পালিয়ে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় আশ্রয় নেয়।

২০২৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশে লাখ লাখ রোহিঙ্গা ঘিঞ্জি ও নোংরা আশ্রয়শিবিরে বসবাস করছে। তারা পুরোপুরি মানবিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য কমিয়ে দেওয়ায় রোহিঙ্গাদের খাদ্য ও শিক্ষা কার্যক্রম চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেকে উন্নত জীবনের আশায় সাগরপথে নৌকায় অন্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মাঝেমধ্যেই সাগরে তাঁদের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশ সরকার তাদের আশ্রয় দিলেও দৃঢ়ভাবে চায়, রোহিঙ্গারা যেন শেষ পর্যন্ত মিয়ানমারে ফিরে যায়।