
অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরায় ন্যাশনাল প্রেসক্লাবে ‘ওয়ান নেশন’ দলের প্রধান পলিন হ্যানসনের দেওয়া এক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নিজের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম কট্টরপন্থী এই ভাষণে হ্যানসন অস্ট্রেলিয়ার বিদ্যমান বহুসংস্কৃতিবাদ বাতিল, মুসলিম অভিবাসন বন্ধ এবং কর্মজীবী নারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি বাতিলের মতো একাধিক চরমপন্থী প্রস্তাব পেশ করেন।
তবে হ্যানসনের এই বক্তব্যকেও ছাপিয়ে গেছে অনুষ্ঠান চলাকালে তাঁর ঠিক পেছনে ঘটে যাওয়া এক নজিরবিহীন ও সুপরিকল্পিত রিমোট-নিয়ন্ত্রিত ব্যানার প্রতিবাদের ঘটনা। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল পুলিশ ওই ঘটনার ফৌজদারি তদন্ত শুরু করেছে।
ভাষণে পলিন হ্যানসন স্পষ্ট ঘোষণা দেন, পশ্চিমা সভ্যতা ও এর মূল্যবোধ এখন হুমকির মুখে। তিনি অস্ট্রেলিয়াকে একটি বহুসংস্কৃতিবাদী সমাজ হিসেবে টিকিয়ে রাখার ঘোর বিরোধিতা করে বলেন, দেশে বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষ থাকতে পারলেও সবাইকে একক সংস্কৃতির অধীনে আসতে হবে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে তিনি বার্ষিক অভিবাসন সংখ্যা ১ লাখ ৩০ হাজারে নামিয়ে আনা, অতিরিক্ত সময় ধরে অবস্থান করা ৭৫ হাজার অভিবাসীকে অবিলম্বে বহিষ্কার এবং জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয় বিলুপ্ত করার প্রস্তাব দেন।
হ্যানসন একই সঙ্গে কর্মজীবী নারীদের অধিকারের ওপর আঘাত হেনে প্রশ্ন তোলেন, নারীরা যখন ছুটির কারণে কাজে অনুপস্থিত থাকেন, তখন ব্যবসায়ী বা মালিকপক্ষ কেন তাদের বেতন দেবে? এ ছাড়া তিনি বহুভাষিক গণমাধ্যম এসবিএস সম্পূর্ণ বন্ধ এবং সরকারি সম্প্রচার মাধ্যম এবিসিকে শহরের মানুষের জন্য অর্থের বিনিময়ে দেখার সেবায় রূপান্তর করার দাবি জানান।
হ্যানসন যখন মঞ্চে এই কড়া বক্তব্য দিচ্ছিলেন ঠিক তখনই তাঁর পেছনে একটি গোপন প্রতিবাদের ব্যানার স্বয়ংক্রিয়ভাবে নেমে আসে, যেখানে হ্যানসনের দ্বিমুখী নীতির সমালোচনা করে লেখা ছিল, ‘আমি নিজেই নিজের বেতন এক লাখ ডলার বৃদ্ধি করলাম। অথচ সাধারণ কর্মীদের বেতন বৃদ্ধির বিরোধিতা করলাম।’
এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ ‘ওয়ান নেশন’ দলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, দলের নেত্রীর নিরাপত্তাব্যবস্থা চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার অধিকারকর্মী সংগঠন ‘গেটআপ’ এই সুপরিকল্পিত ঘটনার দায় স্বীকার করেছে। প্রাথমিক তদন্ত ও সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে ন্যাশনাল প্রেসক্লাব কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভাষণের আগের দিনই দুই ব্যক্তি সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে ভবনে প্রবেশ করে মূল মঞ্চের পেছনে এই রিমোট-নিয়ন্ত্রিত ব্যানারটি গোপনে স্থাপন করেছিল।
ভাষণ চলাকালে দর্শক সারিতে টিকিট কেটে বসা একজন সহযোগী রিমোটের বোতাম চেপে ব্যানারটি নিচে নামিয়ে দেন। ঘটনার সময় লিবারেল দলের সাবেক কর্মী ব্রিটনি হিগিন্সের স্বামী এবং গেটআপের প্রচার পরিচালক ডেভিড শিরাজকে তাঁর মুঠোফোনে ঘটনার ভিডিও চিত্র ধারণ করতে দেখা যায় এবং ব্যানারটি নামার পরপরই দ্রুত ক্লাব ভবন ত্যাগ করেন।
ন্যাশনাল প্রেসক্লাবের সভাপতি টম কনেল এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও নজিরবিহীন নিরাপত্তার ত্রুটির জন্য পলিন হ্যানসনের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। ইতিমধ্যে ঘটনার সব ভিডিও ও তথ্যপ্রমাণ অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলেও জানান টম কনেল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হ্যানসনকে জনসমক্ষে অপদস্ত করতে এই অভিনব প্রতিবাদটি করা হলেও এটি উল্টো তাঁর কট্টর সমর্থকদের আরও বেশি উসকে দেবে। এ ধরনের ‘ওয়ান নেশন’ দলের রাজনৈতিক অবস্থানকে মাঠপর্যায়ে আরও শক্তিশালী করতে পারে।