ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো জাপানেও গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। প্রচণ্ড গরমে খানিকটা স্বস্তি পেতে দেশটিতে কর্মক্ষেত্রে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় পুরুষদের হাঁটু পর্যন্ত লম্বা শর্টস পরে কাজ করতে বেশি দেখা যাচ্ছে।
রাজধানী টোকিও মেট্রোপলিটন সরকার কোম্পানির কর্মীদের প্রচলিত পোশাক স্যুট-টাই ছেড়ে আরও স্বস্তিদায়ক পোশাক পরতে উৎসাহিত করছে। যেমন কর্মীরা চাইলে টি-শার্ট, স্পোর্টস জুতা ও শর্টস পরে কর্মক্ষেত্রে আসতে পারবেন। প্রায় চার মাস আগে নতুন এই রীতি চালু করা হয়, যা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
কেউ কেউ এই শিথিল পোশাকবিধিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, এতে আরও স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করা যায়।
তবে অন্যদের অভিযোগ, এই নীতি নারীদের প্রতি বৈষম্যমূলক। কারণ, নারীরা পায়ের কিছু অংশ খোলা রাখলেও তাঁরা আঁটসাঁট পোশাক পরবেন বলে প্রত্যাশা করা হয়।
আবার কিছু নারী ‘লেগ হেয়ার হ্যারাসমেন্ট’ বা অনলাইনে প্রচলিত ‘সুনেহারা’ শব্দটি ব্যবহার করে তাঁদের অস্বস্তির কথা জানিয়েছেন। এর অর্থ, সহকর্মীদের পায়ের লোম দেখতে বাধ্য হওয়ার কারণে সৃষ্ট অস্বস্তি।
টোকিও মেট্রোপলিটন সরকারের পরিবেশবিষয়ক কর্মকর্তা নোবোরু ওয়াতানাবে বিবিসিকে বলেন, ‘তীব্র গরমে আমরা মানুষকে আরও বেশি পোশাকের বিকল্প দিতে চাই, কী পরতে হবে, তা বলে দিতে চাই না। কর্মক্ষেত্রের পোশাক যদি কারও কাছে আপত্তিকর না হয়, তাহলে তা নিয়ে কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়।’
গত জুনে গরিলা ক্লিনিকের এক জরিপে দেখা গেছে, গ্রীষ্মে কর্মস্থলে শর্টস পরার বিপক্ষে ছিলেন ৫৩ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা। অন্যদিকে নতুন এই সুপারিশের পক্ষে মত দিয়েছেন ৪৬ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা।
অফিসে শর্টস পরার বিরোধিতাকারীদের মধ্যে নারী-পুরুষ উভয়েরই প্রধান উদ্বেগ ছিল শরীরের গড়ন ও পায়ের লোম নিয়ে।
গত জুন মাসে গরিলা ক্লিনিকের এক জরিপে দেখা গেছে, গ্রীষ্মে কর্মস্থলে শর্টস পরার বিপক্ষে ছিলেন ৫৩ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা। অন্যদিকে নতুন এই সুপারিশের পক্ষে মত দিয়েছেন ৪৬ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা। অফিসে শর্টস পরার বিরোধিতাকারীদের মধ্যে নারী-পুরুষ উভয়েরই প্রধান উদ্বেগ ছিল শরীরের গঠন ও পায়ের লোম নিয়ে।
গরিলা ক্লিনিকের ভাষ্য, জরিপে পুরুষদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী এ বিষয়ে মতামত দিয়েছেন। এতে ইঙ্গিত মিলেছে, অনেক নারী পুরুষ সহকর্মীদের খোলা পা দেখতে তুলনামূলকভাবে বেশি অনাগ্রহী বা অস্বস্তি বোধ করেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয়, বিশেষ করে স্টার্টআপ ও প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত অনেক জাপানি কর্মী কর্মস্থলে ‘ক্যাজুয়াল’ পোশাক পরা শুরু করেছেন।
তবে এ বছর টোকিও সরকারের সুপারিশের পর কর্মস্থলে শর্টসসহ এমন পোশাক পরা সামাজিকভাবে আরও বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। তবু অনেক পুরুষই পায়ের লোম দৃশ্যমান হওয়া নিয়ে অস্বস্তি বা সংকোচ বোধ করছেন।
গরিলা ক্লিনিকের পরিচালক আকিফুমি ফুনাতসু বলেন, তিনি লক্ষ্য করেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে শুধু সৌন্দর্যচর্চার জন্য নয়, বরং ‘শর্টস পরার সামাজিক শিষ্টাচার’ মেনে চলার জন্যও অনেক গ্রাহক ক্লিনিকে আসছেন।
জাপানে ২০০৫ সালে প্রথম গ্রীষ্মকালীন পোশাক পরিবর্তনের উদ্যোগ নেন তৎকালীন পরিবেশমন্ত্রী ইউরিকো কোইকে। তিনি ‘কুল বিজ’ নামে একটি জাতীয় জ্বালানি সাশ্রয় কর্মসূচি চালু করেছিলেন। এর লক্ষ্য ছিল কোম্পানির কর্মীদের হাফহাতা শার্টসহ অপেক্ষাকৃত হালকা পোশাক পরতে উৎসাহিত করা।
সরকারের শীর্ষ নেতারাও এ উদ্যোগে অংশ নেন। জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুনইচিরো কোইজুমিকে প্রায়ই জনসমক্ষে টাই ও কোট ছাড়া দেখা যেত, যা এই প্রচারকে জনপ্রিয় করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
এর কয়েক বছর পর, ২০১১ সালের মার্চে তোহোকু ভূমিকম্প ও সুনামির পর সরকার ‘সুপার কুল বিজ’ কর্মসূচি চালু করে। এই কর্মসূচির আওতায় পোশাকবিধিসহ বিভিন্ন নির্দেশিকা আরও বিস্তৃত করা হয়, যাতে কর্মস্থল ও বাড়ি—উভয় জায়গাতেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যবহার কমানো যায়।
বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মতো জাপানেও সাম্প্রতিক মাসগুলোয় রেকর্ড মাত্রার তাপপ্রবাহ দেখা গেছে। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশটিকে উচ্চ জ্বালানি ব্যয়ের চাপও সামলাতে হচ্ছে।
আবহাওয়াবিদেরা এ গ্রীষ্মে তীব্র তাপপ্রবাহের সতর্কবার্তা দিয়েছেন। জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে জাপান আবহাওয়া সংস্থা ‘কোকুশো-বি’ শব্দটি ব্যবহার করছে। এর অর্থ ‘প্রচণ্ড গরমের দিন’—যেদিন তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হয়।
জাপানে ২০০৫ সালে প্রথম গ্রীষ্মকালীন পোশাক পরিবর্তনের উদ্যোগ নেন তৎকালীন পরিবেশমন্ত্রী ইউরিকো কোইকে। তিনি ‘কুল বিজ’ নামে একটি জাতীয় জ্বালানি সাশ্রয় কর্মসূচি চালু করেছিলেন। এর লক্ষ্য ছিল কোম্পানির কর্মীদের হাফহাতা শার্টসহ অপেক্ষাকৃত হালকা পোশাক পরতে উৎসাহিত করা।
এ ছাড়া জাপানে আর্দ্রতার মাত্রাও অনেক বেশি। ফলে ঘাম সহজে শুকাতে পারে না, যা শরীরের স্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা হওয়ার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
জাপানের ফায়ার অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, ৬ থেকে ১২ জুলাই—এই ৭ দিনে জাপানে হিটস্ট্রোকে ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৪ হাজার ৫৮০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।