ব্রুস হাইওয়ে ধরে ম্যাকাই থেকে উত্তরে যাচ্ছি। গাড়ি ছুটছে ঠিক এক শ কিলোমিটার গতিতে। জাহাজের সাবেক কাপ্তান ও মেরিন ইঞ্জিনিয়ার জাফর মজুমদারের হাতে স্টিয়ারিং। হঠাৎ ডান দিকে একটা উঁচু পাহাড় শাঁ করে উল্টো দিকে ছুটে চলে গেল। পেছনের সিট থেকে ডা. মাসুদ হক বলে উঠলেন, ‘ইশ্, পাহাড়টা পার হয়ে গেলাম! এই পাহাড়ের কিন্তু একটা গল্প আছে...।’
আমরা যাচ্ছিলাম আর্লি বিচ দেখতে। ম্যাকাই শহর থেকে ১৫০ কিলোমিটারের মতো দূরে ম্যাকাই রিজিয়নেরই সমুদ্রতীরের আরেক শহর হুইটসানডে। আর্লি বিচ হুইটসানডের ছোট পর্যটন এলাকা। ছবির মতো সুন্দর বলতে যা বোঝায়, এই সৈকত–শহর ঠিক তেমনই।
অফিস খোলার দিন বলে পর্যটকদের ভিড় তেমন ছিল না। তবে রাস্তার দুই ধারের ঝলমলে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পাব, বার আর আকর্ষণীয় স্যুভেনির শপগুলো দেখে বোঝা যাচ্ছিল, জায়গাটি পর্যটকদের কতটা লোভনীয় হাতছানি দিয়ে ডাকে।
আর্লি বিচের আরেক পরিচয়, ‘গেটওয়ে টু দ্য হুইটসানডেজ।’ ট্যুর বোট, ক্যাটামারান আর ফেরি ভাড়া করে হুইটসানডে দ্বীপপুঞ্জের ৭৪টি বিলাসী পর্যটন দ্বীপে যাওয়া যায় আর্লি বিচ থেকে, যাওয়া যায় গ্রেট ব্যারিয়ার রিফেও। ম্যাকাই অঞ্চল থেকে এটিই গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের প্রবেশদ্বার।
‘গেটওয়ে টু দ্য হুইটসানডেজ’ দেখাতে আমাদের নিয়ে যাচ্ছিলেন দুই ম্যাকাইপ্রবাসী বাংলাদেশি জাফর মজুমদার ও মাসুদ হক, যিনি স্থানীয়ভাবে ‘রুমি ভাই’ নামেই পরিচিত। প্রথমজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার, ম্যাকাইয়ে আছেন এক যুগের বেশি সময়। আর ডা. মাসুদ দুই যুগের বেশি।
সবুজ আখের খেত, পাহাড় আর নীরব গ্রামীণ জনপদ পেরিয়ে ম্যাকাই থেকে ২১–২২ কিলোমিটার উত্তর–পশ্চিমে ব্রুস হাইওয়ের একদম পাশেই ‘দ্য লিপ’ পাহাড়। গাড়িতে যেতে যেতে পাহাড়ের ইতিহাসের সারাংশ জানা হয়ে গেল ডা. মাসুদের কাছ থেকে। সে ইতিহাস স্থানীয় আদিবাসীদের প্রতি ‘ঔপনিবেশিক অস্ট্রেলিয়া’র দমন–পীড়নের ইতিহাস, সন্তান কোলে পাহাড় থেকে ঝাঁপিয়ে পড়া এক মায়ের হার না মানা বীরত্বের গল্প।
মান্দুরানা পাহাড়ের একটি অংশ দ্য লিপ, বাংলায় যে লিপ–এর অর্থ লাফ বা ঝাঁপ দেওয়া। পাহাড়ের কেন এমন নাম, তা নিশ্চয়ই সন্তান কোলে আদিবাসী মায়ের পাহাড় থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা শুনেই বুঝতে পারছেন। বাকিটা আছে ইতিহাসের পাতায়।
অস্ট্রেলিয়ার প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, ১৮৬৭ সালে অস্ট্রেলিয়ার ‘ন্যাটিভ পুলিশের’ একটি দল স্থানীয় আদিবাসী মানুষদের ধাওয়া করে এই পাহাড়ের দিকে নিয়ে যায়। অন্যদের মতো কোয়াহা নামের এক নারীও ধাওয়া খেয়ে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে গিয়েছিলেন। তাঁর সামনে পাহাড়ের খাড়া কিনারা, পেছনে সশস্ত্র পুলিশ।
তবু শিশুসন্তানকে হাতছাড়া করেননি কোয়াহা। তাকে কোলে নিয়েই ঝাঁপ দেন পাহাড় থেকে। কিংবদন্তি অনুযায়ী, পাহাড় থেকে লাফিয়ে পড়ে সাহসী মা কোয়াহা মারা গেলেও বেঁচে যায় তাঁর শিশুটি। পাহাড়ের নাম দ্য লিপ এই মর্মান্তিক ঘটনা থেকেই।
ন্যাটিভ পুলিশের ওই অভিযান ছিল শ্বেতাঙ্গদের জন্য বসতি গড়ার উদ্দেশ্যে আদিবাসীদের উচ্ছেদ করা। অভিযানে এই অঞ্চলের দুই শর বেশি আদিবাসীর মধ্যে প্রায় ৫০ জনই নিহত হয়েছিলেন বলে ইতিহাসে আছে, সেখানে এটিকে ‘দ্য লিপ ম্যাসাকার’ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। ইতিহাস বলে, আদিবাসীদের ওপর দমন–পীড়নের অংশ হিসেবে তাঁদের সন্তানদের কেড়ে নিয়ে শ্বেতাঙ্গ বসতি স্থাপনকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হতো। পরবর্তী সময়ে তাদের ব্যবহার করা হতো গৃহকর্মী বা শ্রমিক হিসেবে।
ইতিহাসে লাফিয়ে পড়ার গল্পটির অবশ্য অন্য বর্ণনাও আছে। কেউ বলেছেন, কোয়াহা মারা গেলেও তাঁর সন্তান বেঁচে গিয়েছিল। কারও মতে, কোয়াহা পাহাড় থেকে লাফিয়ে পড়েছিলেন ঠিকই, তবে তিনি ও তাঁর সন্তান দুজনই বেঁচে যান। কোথাও আবার একজন নারী নয়, একজন পুরুষের পাহাড় থেকে লাফিয়ে পড়ার কথা বলা হয়েছে।
তবে দ্য লিপের সামনে গিয়ে দাঁড়ালে আপনার সামনে একজন আদিবাসী মায়ের বীরত্বগাথাই ভেসে উঠবে। আর্লি বিচ থেকে ফেরার পথে সেখানে দাঁড়িয়ে দেখলাম, ইতিহাসকে ধরে রাখতে পাহাড়ের পাদদেশে যে ভাস্কর্যটি গড়া হয়েছে, সেটি সন্তান কোলে পাহাড় থেকে লাফ দিতে উদ্যত এক আদিবাসী নারীর।
ভাস্কর্যের পাশেই ১৪৪ বছরের পুরোনো ‘লিপ হোটেল’। এখনো তা সেই শুরুর কাঠের কাঠামোতেই দাঁড়িয়ে। হোটেলের ভেতর স্থানীয় ইতিহাসের স্মারক নিয়ে গড়া একটি জাদুঘরও আছে শুনেছি। তবে রাত হয়ে যাওয়ায় সেটি তখন বন্ধ ছিল।
দ্য লিপের পাদদেশে দাঁড়িয়ে কিছু সময়ের জন্য যেন হারিয়ে গেলাম ইতিহাসের পাতায়। ল্যাম্পপোস্টের মলিন আলোয় কোয়াহার ছবিটাকে হঠাৎ জীবন্ত মনে হলো। ওই তো সন্তান কোলে লাফিয়ে পড়ছেন এক আদিবাসী নারী!
নারী, নাকি মা? দ্য লিপ তো আসলে মায়ের আত্মত্যাগের গল্পই বলে, যে গল্পে মিশে আছে অস্ট্রেলিয়ার জন্য অস্বস্তিকর এক অতীত।