
মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাতের জেরে বিশ্ব জ্বালানিবাজারে নজিরবিহীন সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জ্বালানি সাশ্রয় ও অর্থনীতি সচল রাখতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ।
বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথ কার্যত বন্ধ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর থেকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এই ১৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সমুদ্রপথ দিয়ে পার হতে চাওয়া বেশ কিছু জাহাজে হামলা চালিয়েছে। এর ফলে হরমুজ প্রণালির উভয় পাশে ভয়াবহ অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এশিয়া থেকে আফ্রিকা এবং ইউরোপের সরকারগুলো সরকারি ছুটি ঘোষণা, বাধ্যতামূলকভাবে বাসা থেকে কাজ (ওয়ার্ক ফ্রম হোম), জ্বালানি রেশনিং এবং শিল্পকারখানা বন্ধ রাখার মতো জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
শ্রীলঙ্কায় স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় এবং অতীব জরুরি নয় এমন সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বাধ্যতামূলক ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। কিউআর কোডভিত্তিক ‘ন্যাশনাল ফুয়েল পাস’ সিস্টেমের মাধ্যমে ব্যক্তিগত যানবাহনের জন্য সপ্তাহে সর্বোচ্চ ১৫ লিটার পেট্রল বিক্রি করা হচ্ছে।
ভুটানে মজুতদারি রোধে জেরি ক্যানে তেল বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং জরুরি সেবাকে অগ্রাধিকার দিয়ে রেশনিং ব্যবস্থা চালু হয়েছে।
পাকিস্তানে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সপ্তাহে চার দিন কর্মদিবস নির্ধারণ এবং সরকারি দপ্তরে জ্বালানি বরাদ্দ ৫০ শতাংশ কমানো হয়েছে।
ফিলিপাইনে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু এবং অপ্রয়োজনীয় সরকারি ভ্রমণ সীমিত করা হয়েছে।
ভিয়েতনামে যতটুকু সম্ভব প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত না থেকে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং নাগরিকদের গণপরিবহন ব্যবহারের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
মিয়ানমারে তীব্র সংকটে পেট্রলপাম্পগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ব্যক্তিগত যানবাহনের জন্য নিবন্ধন নম্বরের ভিত্তিতে ‘জোড়-বিজোড়’ রেশনিং পদ্ধতি চালু হয়েছে।
কম্বোডিয়ায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পেট্রলপাম্প কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। লাওসে সরকারি চাকরিজীবীদের বাসা থেকে কাজ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং যাতায়াত কমাতে পালাক্রমে দায়িত্ব পালনের পদ্ধতি চালু হয়েছে।
মিসরে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে রাত ৯টার মধ্যে বিপণিবিতান ও রেস্তোরাঁ এবং সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে সরকারি ভবন বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিলবোর্ডের বিজ্ঞাপনের আলোও বন্ধ রাখা হচ্ছে।
কেনিয়ায় জ্বালানি রপ্তানি নিষিদ্ধের পাশাপাশি রেশনিং চালু হয়েছে। দেশটির বর্তমান মজুত কেবল এপ্রিল পর্যন্ত চলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় ডিজেল সংকট ও আতঙ্কিত হয়ে কেনাকাটা রুখতে শিল্প খাতে নিয়ন্ত্রিত বরাদ্দের ব্যবস্থা কার্যকর করেছে।
নিউজিল্যান্ডে ১৯৭৯ সালের নীতি অনুসরণ করে সপ্তাহে এক দিন ব্যক্তিগত গাড়ি চালানো বন্ধ রাখার ‘গাড়িমুক্ত দিবস’ চালুর কথা ভাবছে সরকার। জ্বালানি মজুত পর্যবেক্ষণে ‘অ্যাম্বার অ্যালার্ট’ জারি করা হয়েছে এবং উচ্চ মূল্যের কারণে এয়ার নিউজিল্যান্ডের কয়েক শ ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।
স্লোভাকিয়ায় ডিজেল মজুতদারি ঠেকাতে সরকারিভাবে ক্রয়ের কোটা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। স্লোভেনিয়ায় স্থানীয় সরবরাহ নিশ্চিত করতে দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম জ্বালানি বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিগত গাড়ি ও ট্রাকের জন্য তেল বিক্রিতে সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে।
এসব পদক্ষেপ সম্মিলিতভাবে বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটের ভয়াবহতা এবং নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তায় দেশগুলো কত দূর পর্যন্ত যেতে পারে, তা-ই স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ইরানকে ৪৮ ঘণ্টার সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। তবে এই সময় শেষ হওয়ার আগেই আজ সোমবার তিনি বলেছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ‘খুব ভালো ও ফলপ্রসূ আলোচনা’ শুরু হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইরানের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার সিদ্ধান্ত পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত করা হয়েছে।
ইরান অবশ্য ট্রাম্পের এমন দাবি নাকচ করে দিয়েছে। তেহরান বলেছে, এ ধরনের কোনো আলোচনা হচ্ছে না এবং পাল্টা হামলার ভয়ে যুক্তরাষ্ট্র পিছু হটছে। জ্বালানি তেলের দাম কমাতে ট্রাম্প এই কৌশল নিয়েছেন।