গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে আগ্রাসন শুরু করে, তখন চীনের শীর্ষ নেতারা বন্ধুভাবাপন্ন আরেকটি দেশের সরকার পতনের আশঙ্কা করছিলেন। এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই ভেনেজুয়েলায় প্রায় একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল।
তবে প্রায় চার মাস পর এখনকার পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। কয়েক সপ্তাহের শান্তি আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি করেছে। তেহরানের শাসনক্ষমতা এখনো অক্ষুণ্ন রয়েছে এবং এ যুদ্ধ মূলত মার্কিন ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকেই প্রকাশ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে বেইজিংয়ের নিজস্ব কূটনৈতিক প্রভাব আগের চেয়ে বেড়েছে। যুদ্ধ চলাকালে চীন একের পর এক বিদেশি নেতাদের আতিথেয়তা দিয়েছে এবং নিজেকে শান্তির পক্ষের শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে। এমনকি যুদ্ধের সময় চীনের ভূমিকার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে বারবার প্রশংসাও পেয়েছেন দেশটির নেতারা।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির এই দেশ সংঘাতের কারণে তৈরি হওয়া ঐতিহাসিক জ্বালানিসংকটও বেশ ভালোভাবেই মোকাবিলা করেছে, যা তার অনেক প্রতিবেশী দেশই পারেনি। বিশেষ করে চীনের বিপুল কৌশলগত তেল মজুত এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের (ইভি) ব্যবহার দেশটিকে এই সুবিধা দিয়েছে।
চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে ‘শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে’ সক্রিয় ভূমিকা রাখতে বেইজিং ‘প্রস্তুত’।
এই চুক্তির পেছনে বেইজিংয়ের কোনো ভূমিকা ছিল কি না—জানতে চাইলে মুখপাত্র লিন জিয়ান নির্দিষ্ট করে কোনো ভূমিকার কথা নিশ্চিত করেননি। তবে যুদ্ধ অবসানে চীনের ‘অক্লান্ত’ প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করতেও তিনি দ্বিধা করেননি। এর মধ্যে গত এপ্রিলে চীনের শীর্ষ নেতা সি চিন পিংয়ের দেওয়া চার দফার শান্তি প্রস্তাবও রয়েছে।
গত বুধবার ফ্রান্সে জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি চীন ও প্রেসিডেন্ট সি–কে ধন্যবাদ জানাতে চাই। তিনি পুরোপুরি নিরপেক্ষ ছিলেন এবং আমি এর প্রশংসা করি।’ ইরানি বন্দরগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া অবরোধ অমান্য করতে চীনা নেতা তাঁর নৌবাহিনীর ক্ষমতা ব্যবহার করেননি—সে বিষয়ও উল্লেখ করেন ট্রাম্প।
ট্রাম্প আরও বলেন, ‘তারা সেটি করেনি। প্রেসিডেন্ট সি আমাকে সাহায্য করেছেন। তিনি সহযোগিতার চেষ্টা করেছেন। আমি মনে করি, এ সংকটের সমাধানে সম্ভবত তাঁর ভূমিকা ছিল।’
সংঘাতের সময় চীন বেশ সতর্ক কূটনৈতিক অবস্থান বজায় রেখেছিল। তারা ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার নিন্দা জানিয়েছে এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইরানি তেল কেনা অব্যাহত রেখেছে। তবে একই সঙ্গে উভয় পক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ বজায় রেখেছে বেইজিং।
যুদ্ধ যতই দীর্ঘায়িত হয়েছে, বহু বিদেশি নেতা বেইজিং সফর করেছেন। এর মধ্যে গত মাসে ট্রাম্প নিজে, কয়েক দিন আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং এই সংকটের প্রধান মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের নেতারা চীন সফর করেন।
আলোচনার শুরুর দিকে তেহরান একটি শান্তিচুক্তির নিশ্চয়তাকারী হিসেবে চীনের সমর্থন পাওয়ার জন্য বেশ আগ্রহী ছিল। কিন্তু বেইজিং এমন কোনো আনুষ্ঠানিক এবং জটিল ভূমিকা পালনে খুব একটা আগ্রহ দেখায়নি।
গত বুধবার চীনের শীর্ষ কূটনীতিক ওয়াং ই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচির সঙ্গে ফোনে কথা বলেন এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল ‘যথাযথভাবে পরিচালনার’ আহ্বান জানান। ওয়াং ই বলেন, ‘শান্তির আলো দেখা যাচ্ছে। পরবর্তী পদক্ষেপের মূল চাবিকাঠি হলো সব পক্ষের নিজ নিজ প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা এবং সব ধরনের হস্তক্ষেপ দূর করা।’
বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে সই হওয়া সমঝোতা স্মারকের পেছনে বেইজিং তার কূটনৈতিক প্রভাব কতটা খাটিয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। এই চুক্তির ফলে চূড়ান্ত শর্তাবলি নিয়ে আলোচনার জন্য ৬০ দিনের একটি সময় পাওয়া গেছে।
তবে বেইজিংয়ের জন্য এই প্রকাশ্য উচ্চপর্যায়ের সফরগুলো একটি বার্তাই জোরালো করেছে—অন্যরা যখন যুদ্ধ ছড়াচ্ছে, তখন চীন একটি দায়িত্বশীল বৈশ্বিক শক্তি ও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে।
সুয়েজ সংকট নিয়ে বিতর্ক
উভয় পক্ষ যখন আলোচনার পরবর্তী ধাপে প্রবেশ করছে, তখন বিশ্লেষকেরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে এত বড় ধাক্কা দেওয়া এ সংঘাত থেকে আসলে যুক্তরাষ্ট্র কী অর্জন করল। চীনে—যেখানে মার্কিন-নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যবস্থার বিরোধিতা করাই পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি—সেখানকার রাজনৈতিক চিন্তাবিদেরাও আলোচনা করছেন, এ সংঘাত বৈশ্বিক মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে।
কিছু বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলছেন, এ সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ১৯৫০-এর দশকের ‘সুয়েজ সংকট’-এর মতো কোনো মুহূর্ত কি না। ওই সময় সুয়েজ খালের ওপর ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঘটনাটিকে দেশটির আন্তর্জাতিক পতন এবং বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের উত্থানের প্রতীক হিসেবে দেখা হতো।
সাংহাইয়ের ফুদান ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর মিডল ইস্টার্ন স্টাডিজের পরিচালক সান দেগাং চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত গ্লোবাল টাইমসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে লিখেছেন, সুয়েজ সংকটের সময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ওপর যে ছায়া পড়েছিল, হরমুজ প্রণালিতে কি এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সেই একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে?
সান বলেন, স্নায়ুযুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি হয়ে উঠেছে। তবে এবার মার্কিন সামরিক বাহিনী ওয়াশিংটনের ভাবনার মতো ততটা শক্তিশালী প্রমাণিত হয়নি। অন্যদিকে এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মিত্রদের পাশে না থাকাটা ‘যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক জোটে বিভক্তির স্পষ্ট লক্ষণ’ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পশ্চিমা বিশ্বেও এই প্রশ্ন নিয়ে বিতর্ক চলছে। তবে চীনের কিছু কণ্ঠস্বর স্পষ্ট করেই বলছে, ওয়াশিংটনের এ যুদ্ধ থেকে বেইজিং লাভবান হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক হু সিজিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উইবোতে লিখেছেন, দূর মধ্যপ্রাচ্যের কোনো যুদ্ধে বিজয়ীর মুকুট পরার কোনো আগ্রহ চীনের নেই।
তবে এ সংঘাত চীনের প্রতি বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করেছে। এটি দেখিয়েছে, জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় চীনের ‘কৌশলগত পরিকল্পনা’ কতটা সফল এবং তার শান্তিপূর্ণ ‘উন্নয়নের পথ’ কতটা আকর্ষণীয়।
হু সিজিন আরও লিখেছেন, এ যুদ্ধ তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক প্রতিরোধক্ষমতাকে ‘উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে’। এটি মার্কিন অস্ত্র মজুতের সীমাবদ্ধতা এবং ইরানের মতো একটি বিচ্ছিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধেও পশ্চিমা জোট গঠনে ওয়াশিংটনের ব্যর্থতাকে ফুটিয়ে তুলেছে।
চীনের ভারসাম্য রক্ষার নীতি
যুক্তরাষ্ট্রের এ দুর্বল অবস্থানের পর চীন কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে, তা এখনো একটি বড় প্রশ্ন। বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে একটি ‘বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার’ সমর্থক হিসেবে উপস্থাপন করে আসছে। এ সংঘাতকে তারা নিজেদের কাঙ্ক্ষিত আরেকটি পরিবর্তনের জন্য ব্যবহার করতে পারে, আর তা হলো যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নিয়ন্ত্রিত নিরাপত্তাব্যবস্থার অবসান ঘটানো।
তবে পুরো যুদ্ধে বেইজিং নিজের স্বার্থগুলো সতর্কতার সঙ্গে সামাল দিয়েছে; সংকট সমাধানে সরাসরি নেতৃত্ব দেওয়া বা কোনো এক পক্ষকে পুরোপুরি সমর্থন করা থেকে বিরত থেকেছে।
দীর্ঘদিনের সহযোগী ইরানকে মুখে সমর্থন দিলেও যুদ্ধ বাধানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চীনের সমালোচনা ছিল বেশ পরিমিত। উপরন্তু ইরানের হামলার শিকার হওয়া উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও একাধিকবার বৈঠক ও ফোনালাপ করেছে চীন।
ধারণা করা হয়, বেইজিংই চলতি বসন্তের শুরুতে তেহরানকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চাপ দিয়েছিল, যদিও মার্কিন সরকারের মতে, চীনা কোম্পানিগুলো তেহরানের অস্ত্র ক্রয়ে সহায়তা করেছে। তবে বেইজিং সাধারণত যুদ্ধে লিপ্ত কোনো দেশকে অস্ত্র দেওয়ার কথা অস্বীকার করে থাকে।
এমন সব পরিস্থিতির মধ্যেও সি যে গত মাসে ট্রাম্পের সঙ্গে একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ বৈঠক করতে পেরেছিলেন, তা-ও আবার ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হিসেবে চীনের অবস্থান বজায় রেখে, তা বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং অত্যন্ত নিখুঁত ভারসাম্য রক্ষার নীতিরই প্রমাণ।
তবে চীনের বিশ্লেষকেরা এ–ও বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সম্ভাব্য ‘সুয়েজ মুহূর্ত’ মানেই এই নয় যে চীন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশ্বব্যবস্থার শীর্ষে চলে যাবে। চীনা কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকেরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের মতো কোনো পরাশক্তি হতে চায় না।
বেইজিংয়ের তসিংহু ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজির ফেলো সান চেংহাও সিএনএনকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র এখনো সবচেয়ে শক্তিশালী বহিরাগত পক্ষ হিসেবে রয়ে গেছে, যা পরিবর্তিত হয়েছে তা হলো, এখন তাদের এই আধিপত্য বজায় রাখতে রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক এবং সুনামগত দিক থেকে অনেক বেশি মূল্য চুকাতে হচ্ছে।
চেংহাও বলেন, এ সংঘাতের ফলে সার্বভৌমত্ব, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, রাজনৈতিক সমাধান এবং উন্নয়নমুখী নিরাপত্তার ওপর জোর দেওয়া চীনের বিশ্বদর্শন অনেক দেশের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
সান চেংহাও আরও বলেন, তবে বিশ্বাসযোগ্যতা কেবল মার্কিন পদক্ষেপের সমালোচনা করে তৈরি হয় না; এটি নির্ভর করে চীন বাস্তবসম্মত কূটনৈতিক সমাধান দিতে পারছে কি না, জ্বালানি স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে পারছে কি না এবং উত্তেজনা কমানোর পরিবেশ তৈরিতে সাহায্য করতে পারছে কি না, তার ওপর।