দিনের বেলা স্কুটার ছুটিয়ে বাড়ি বাড়ি খাবার পৌঁছে দেওয়াই তাঁর কাজ। রাতে সেই ওয়াং জিবিং হয়ে ওঠেন সংবেদনশীল এক কবি। জীবনের দীর্ঘ লড়াই, রাস্তার ক্লান্তি আর সাধারণ মানুষের জীবনযাপনকে কবিতার ছন্দে গাঁথেন তিনি।
চীনের জিয়াংসু প্রদেশের বাসিন্দা ওয়াংয়ের বয়স ৫৭ বছর। তাঁর কাব্যগ্রন্থ লো ফ্লাইট এ বছর দেশটির ‘লু শুওন লিটারারি প্রাইজ’ জিতেছে। আধুনিক চীনা সাহিত্যের জনক লু শুওনের নামে প্রবর্তিত এই পুরস্কার চীনের সাহিত্যজগতে অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার।
‘দিনে ডেলিভারিম্যান, রাতে কবি’ হিসেবে পরিচয় পাওয়া ওয়াং জিবিংয়ের জীবন কখনোই সহজ ছিল না। অভাব-অনটনের কারণে বয়ঃসন্ধিতেই পড়াশোনা ছাড়তে হয়েছিল তাঁকে। পেটের দায়ে দিনের পর দিন নির্মাণশ্রমিক থেকে শুরু করে ভাঙারি কুড়ানো কিংবা ফুটপাতে দোকান চালানোর মতো কাজ করেছেন।
২০১৯ সালে কুনশান শহরে রাইডার হিসেবে কাজ শুরু করেন ওয়াং। এর পর থেকে স্কুটারে চেপে দেড় লাখ কিলোমিটারের বেশি রাস্তা চষে ফেলেছেন তিনি, আর লিখে ফেলেছেন প্রায় ছয় হাজার কবিতা। তাঁর জীবনে বড় বাঁক আছে ২০২২ সালে। তাঁর লেখা ‘ম্যান ইন আ হারি’ (ব্যস্ত এক মানুষ) কবিতাটি চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়।
গ্রাহকের ভুল ঠিকানার কারণে কীভাবে ওয়াংকে দিনভর শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চলতে হয়েছে এবং খাবার ডেলিভারি দিতে দেরি হওয়ার কারণে জরিমানা গুনতে হয়েছে। এর তিক্ত অভিজ্ঞতা তিনি কবিতায় ফুটিয়ে তোলেন।
পুরস্কার জেতা ওয়াংয়ের কাব্যগ্রন্থ লো ফ্লাইট কেবল তাঁর একার গল্প নয়। এর প্রতিটি কবিতায় তিনি তাঁর দুই শতাধিক সহকর্মী রাইডারের সাক্ষাৎকার ও প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতার চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। কাব্যগ্রন্থের একটি পঙ্ক্তি হলো, ‘ডানা মেলা মানেই কি উঁচুতে ওড়া? নিচু হয়ে ওড়াও তো একধরনের ওড়া।’
এত বড় স্বীকৃতি পাওয়ার পরও মাটিতে থাকতে চান ওয়াং। তিনি বলেন, ৬০ বছর বয়স না হওয়া পর্যন্ত খাবার পৌঁছে দেওয়ার এই কাজ তিনি চালিয়ে যাবেন। এর পেছনে আর্থিক বাধ্যবাধকতার চেয়েও শারীরিক সুস্থতা ধরে রাখা এবং মাটির কাছাকাছি থাকার তাগিদই তাঁর কাছে মুখ্য।
জীবনের জটিল সমীকরণকে যিনি কবিতার সহজ ছন্দে বাঁধতে পারেন, সম্মান বা খ্যাতির আলো তাঁর এই সাধারণ জীবনযাপনকে এতটুকু বদলাতে পারবে না বলেই বিশ্বাস ওয়াং জিবিংয়ের।