জাপানের বিরুদ্ধে বিজয় ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির ৮০তম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত চীনের সামরিক বাহিনীর কুচকাওয়াজে একটি লেজার অস্ত্র প্রদর্শন করা হচ্ছে। চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন স্কয়ারে। ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫
জাপানের বিরুদ্ধে বিজয় ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির ৮০তম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত চীনের সামরিক বাহিনীর কুচকাওয়াজে একটি লেজার অস্ত্র প্রদর্শন করা হচ্ছে। চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন স্কয়ারে। ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ থেকে কী ধরনের শিক্ষা নিতে পারে চীন

ইরান যুদ্ধ তৃতীয় মাসে গড়িয়েছে। এ যুদ্ধ চীনের জন্য একটি বিশেষ সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা কীভাবে কাজ করে, চীন এই যুদ্ধ থেকে তা শিখতে পারে। স্মরণে রাখা ভালো—যেকোনো যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণে প্রতিপক্ষের ভূমিকাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

পারস্য উপসাগর এবং এর আশপাশে গত দুই মাসের লড়াই থেকে বেইজিং ও ওয়াশিংটনের সম্ভাব্য সংঘাত নিয়ে কী কী ধারণা পাওয়া যেতে পারে—তা নিয়ে চীন, তাইওয়ান এবং অন্যান্য অঞ্চলের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেছে সিএনএন।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, চীনের নিজেদের শক্তি সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণ করা ঠিক হবে না। দেশটির উচিত, নিজেদের অভিজ্ঞতার অভাবকে গুরুত্বসহকারে নেওয়া এবং এই সংঘাতের ফলাফলকে ছোট করে না দেখা।

আগামী দিনে কোনো যুদ্ধে নিজেদের অপরাজেয় রাখতে চীনকে প্রতিরক্ষার দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করতে ব্যাপক প্রচেষ্টা চালাতে হবে।
ফু কিয়ানশাও, সাবেক কর্নেল, চীনের বিমানবাহিনী

চীনের বিমানবাহিনীর সাবেক কর্নেল ফু কিয়ানশাও সিএনএনকে বলেন, এই লড়াই থেকে এ পর্যন্ত তাঁর প্রধান উপলব্ধি হলো—পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) যেন তাদের প্রতিরক্ষার কথা ভুলে না যায়। প্যাট্রিয়ট বা থাডের মতো মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ফাঁকি দিতে পেরেছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসকারী ব্যবস্থাকে কীভাবে ফাঁকি দেওয়ার পথ খুঁজে বের করেছে ইরান, তা জানা দরকার।

ফু আরও বলেন, ‘ভবিষ্যতে কোনো যুদ্ধে নিজেদের অপরাজেয় রাখতে আমাদের প্রতিরক্ষার দিকের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করতে ব্যাপক প্রচেষ্টা চালাতে হবে।’

গত কয়েক বছরে পিপলস লিবারেশন আর্মি তাদের হামলা চালানোর সক্ষমতা দ্রুত বাড়িয়েছে। তারা নিজেদের অস্ত্রভান্ডারে হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকেল–সমৃদ্ধ ক্ষেপণাস্ত্র যুক্ত করেছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র (যুক্তরাষ্ট্রের) ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসকারী ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে সক্ষম।

চীনের লুয়াং-৩ শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের ডেস্ট্রয়ার ইউএসএস চুং-হুনের (ডিডিজি-৯৩) কাছ দিয়ে চলে যাচ্ছে। ছবিটি যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ারের ডেক থেকে তোলা। তাইওয়ান প্রণালিতে। ৩ জুন ২০২৩

ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাংক আরইউএসআইয়ের তথ্যমতে, চীন তাদের বিমানবাহিনীতে দ্রুত পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ ফাইটার যুক্ত করছে। দূরপাল্লার নির্ভুল লক্ষ্যভেদী স্ট্রাইক মোডে কাজ করার জন্য তারা প্রায় ১ হাজার জে-২০ জেট মোতায়েন করবে। এসব যুদ্ধবিমান অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫–এর সমতুল্য। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ বা বি-২১–এর মতো দূরপাল্লার স্টেলথ বোমারু বিমান তৈরির কাজও চালাচ্ছে চীন।

দূরপাল্লার নির্ভুল লক্ষ্যভেদী স্ট্রাইক মোডে কাজ করার জন্য চীন প্রায় ১ হাজার জে-২০ জেট মোতায়েন করবে। এসব যুদ্ধবিমান অনেকটা আমেরিকার এফ-৩৫–এর সমতুল্য।

তবে চীনের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান সস্তা শাহেদ ড্রোন ও স্বল্পমূল্যের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মতো তুলনামূলক আদিম বা সাধারণ প্রযুক্তি দিয়ে পারস্য উপসাগরে মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করতে সক্ষম হয়েছে।

অন্যদিকে ইরানে এফ-৩৫ এবং বি-২–এর মতো যুদ্ধবিমান দিয়ে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি বি-১, বি-৫২ ও এফ-১৫–এর মতো যুদ্ধবিমান থেকে সস্তা ও কম উন্নত গাইডেড গোলাবারুদও ফেলা হয়েছে। এসব হামলার মাধ্যমে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার থেকে শুরু করে নৌযান ও সেতু—সবকিছু ধ্বংস করা হয়েছে।

চীনের সাবেক কর্নেল ফু কিয়ানশাও মনে করেন, বেইজিংকে অবশ্যই এই মিশ্র কৌশলের কথা মাথায় রেখে পরিকল্পনা সাজাতে হবে। তাঁর ভাষ্যমতে, ‘আমাদের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, বিমানঘাঁটি ও বন্দরগুলোকে এ ধরনের আক্রমণ ও অভিযান থেকে কার্যকরভাবে রক্ষার জন্য আরও গভীরভাবে কাজ করতে হবে।’

তাইওয়ানের বিরুদ্ধে চীনের যৌথ সামরিক অভিযানে দূরপাল্লার রকেট ও ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন হামলা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
চিহ চুং, সহযোগী গবেষক, ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি রিসার্চ

তাইওয়ান প্রণালির পরিস্থিতি

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্ভাব্য সংঘাতের কথা উঠলে তাইওয়ানকে প্রায় সময় সেই সংঘাতের মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখা হয়।

স্বশাসিত গণতন্ত্রিক তাইওয়ান দ্বীপকে নিজের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে ‘একীভূত’ করার শপথ নিয়েছে চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি। এখন পর্যন্ত তারা কখনো তাইওয়ান নিয়ন্ত্রণ করেনি। চীনের নেতা সি চিন পিং এই লক্ষ্য অর্জনে সামরিক শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি।

তাইওয়ানের বিশ্লেষকেরা চীনের সক্ষমতা সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান রাখেন। তাঁদের মতে, চীন এমন এক সামরিক বাহিনী গড়ে তুলেছে, যা একদিকে উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন নির্ভুল অস্ত্রের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ। অন্যদিকে কম খরচে বিপুলসংখ্যক ড্রোন দিয়ে যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে ইরানের মতো পারদর্শী।

তাইওয়ানের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি রিসার্চের সহযোগী গবেষক চিহ চুং সিএনএনকে বলেন, তাইওয়ানের বিরুদ্ধে চীনের যৌথ সামরিক অভিযানে দূরপাল্লার রকেট ও ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন হামলা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

কিন্তু তাইওয়ান প্রণালির সম্ভাব্য যুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য এসব সামরিক সক্ষমতাই কি যথেষ্ট?

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ ও নৌযানের দৃশ্য। ওমানের মুসান্দাম উপদ্বীপের কাছে। ১ মে ২০২৬

বিশ্লেষকদের মতে, চীন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ড্রোন প্রস্তুতকারক। তাদের উৎপাদিত ড্রোন বা মানুষবিহীন অস্ত্রব্যবস্থার সংখ্যা বিস্ময়কর।

বিশ্লেষণধর্মী প্ল্যাটফর্ম ‘ওয়ার অন দ্য রকস’–এ ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের বেসামরিক নির্মাতারা এক বছরের কম সময়ের মধ্যে তাদের কারখানাগুলোকে পুনর্গঠিত করে বছরে যুদ্ধোপযোগী ১০০ কোটি ড্রোন তৈরির সক্ষমতা রাখে।

কেউ কেউ সতর্ক করে বলেন, তাইওয়ান এই বিশাল পরিসরে চীনের হামলা মোকাবিলা করার জন্য এখনো প্রস্তুত নয়। সরকারি নজরদারি সংস্থার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাইওয়ানের সামরিক বাহিনীর বর্তমান ড্রোন-প্রতিরোধব্যবস্থা ‘অকার্যকর’। এ পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো ও সামরিক ঘাঁটিগুলোর জন্য ‘বড় ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি’ তৈরি করছে।

চীনের বেসামরিক নির্মাতারা এক বছরের কম সময়ের মধ্যে তাদের কারখানাগুলোকে পুনর্গঠিত করে বছরে যুদ্ধোপযোগী ১০০ কোটি ড্রোন তৈরির সক্ষমতা রাখে।

বসে নেই তাইওয়ান

তবে তাইওয়ানও হাত গুটিয়ে বসে নেই। তারা ড্রোন-প্রতিরোধব্যবস্থা উন্নত করতে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে।

তাইওয়ানের শীর্ষ ড্রোন নির্মাতাপ্রতিষ্ঠান থান্ডার টাইগারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিন সু ড্রোনের ব্যাপক উৎপাদনসক্ষমতা বৃদ্ধি করতে আরও বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘শত্রুকে মোকাবিলা করতে আমাদের দিনরাত নিরবচ্ছিন্নভাবে ড্রোন উৎপাদন অব্যাহত রাখতে হবে।’

যুক্তরাষ্ট্রও শিক্ষা নিচ্ছে

উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে যুক্তরাষ্ট্রও শিক্ষা নিচ্ছে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কোনো সংঘাত শুরু হলে ওয়াশিংটন নিজেকে আক্রমণকারীর চেয়ে রক্ষণকারীর ভূমিকায় বেশি দেখতে চাইবে। এমন একটি ধারণা ক্রমশ বাড়ছে।

গত এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের এক শুনানিতে মার্কিন ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল স্যামুয়েল পাপারো বলেন, ড্রোন হামলাকারী পক্ষের জন্য যুদ্ধ অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে।

তাইওয়ান নিয়ে যুদ্ধ শুরু হলে পরিস্থিতি কী হতে পারে? এ ক্ষেত্রে তাইওয়ান বা যুক্তরাষ্ট্র ড্রোন ব্যবহার করে চীনের সেই সব জাহাজ বা বিমানকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে, যেসব জাহাজ বা বিমান লাখ লাখ পিএলএ সেনা নিয়ে প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করবে। প্রতিটি জাহাজ বা বিমান এবং তার ভেতরে থাকা সেনাদের মূল্য সেই সব ড্রোনের তুলনায় অনেক বেশি, যা তাদের ধ্বংস করতে সক্ষম।

ইরান যুদ্ধে এই ‘প্রতিরোধক ফ্যাক্টর’ বা ডিটারেন্স স্পষ্টভাবে চোখে পড়েছে। ইরানের অসম যুদ্ধের কৌশলে সতর্ক হয়ে মার্কিন নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালি দিয়ে পারস্য উপসাগরে খুব কম জাহাজ পাঠিয়েছে।

অ্যাডমিরাল পাপারো তাইওয়ান প্রণালির আকাশ, জলপথ ও সমুদ্রের তলদেশ হাজার হাজার ড্রোন দিয়ে ভরে ফেলার যে প্রস্তাব দিয়েছেন, তা নিশ্চয় চীনের চোখ এড়ায়নি। এর মূল লক্ষ্য হবে চীনা বাহিনীকে আটকে দেওয়া, যাতে করে পিএলএর সেনাদের জন্য তাইওয়ান অভিমুখে জলপথ পাড়ি দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।