
চীনা বিজ্ঞানীরা ভারত মহাসাগরের তলদেশে তিমির বিশাল এক সমাধিক্ষেত্র খুঁজে পেয়েছেন। তাঁরা বলছেন, এটি বিশ্বে তিমির সবচেয়ে বড় সমাধিক্ষেত্র। সেখানে তাঁরা নতুন ও প্রাচীন—দুই ধরনেরই বিপুলসংখ্যক তিমির দেহাবশেষ খুঁজে পেয়েছেন। তিমির এ সমাধিক্ষেত্রটি গভীর সমুদ্রে বসবাসকারী অসংখ্য জীবের জন্য আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে।
গত বুধবার নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত তিমির সমাধিক্ষেত্রগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে গভীর ও প্রাচীন। এখানে পাওয়া কিছু জীবাশ্মের বয়স প্রায় ৫৩ লাখ বছর।
ছোট একটি ডুবোযান দিয়ে গবেষণা চালিয়ে চীনের গবেষকেরা তিমির দেহাবশেষের ওপর বসবাসকারী নানা ধরনের অদ্ভুত প্রাণী দেখতে পান। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এসব প্রাণীর অনেকগুলোই নতুন প্রজাতির। তারা তিমির দেহাবশেষকে খাদ্য ও আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করে গভীর সমুদ্রে টিকে আছে।
ভারত মহাসাগরের তলদেশে অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম পাশে বিজ্ঞানীরা প্রায় ৫০০টি তিমির কঙ্কাল খুঁজে পেয়েছেন। প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটারজুড়ে এলাকাটি বিস্তৃত। সাগরে তলদেশে কিছু জায়গা ৭ হাজার মিটার পর্যন্ত গভীর।
ভারত মহাসাগরের তলদেশে অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম পাশে বিজ্ঞানীরা প্রায় ৫০০টি তিমির কঙ্কাল খুঁজে পেয়েছেন। এলাকাটি প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত। কিছু জায়গা ৭ হাজার মিটার পর্যন্ত গভীর।
এই কঙ্কালগুলোর মধ্যে একটি অজানা প্রজাতির তিমিও শনাক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এখন সে প্রজাতিটিও বিলুপ্ত।
গবেষণা প্রতিবেদনটির প্রধান লেখক এবং চায়নিজ একাডেমি অব সায়েন্সেস–এর বিজ্ঞানী শিয়াওতং পেং বলেন, এই আবিষ্কারের বিশালতা বুঝে গবেষকেরা ‘অবাক’ হয়ে গেছেন। তিনি বলেন, তিমির এমন বড় পরিসরের সমাধিক্ষেত্র, এর গভীরতা এবং বয়স—সবকিছুই তাঁদের ধারণার বাইরে ছিল।
বিজ্ঞানীরা আগে থেকেই জানতেন, তিমি মারা গেলে তাদের দেহ সমুদ্রের তলায় ডুবে যায়। এই ডুবে যাওয়া দেহকে ‘হোয়েল ফল’ বলা হয়। এ দেহ গভীর সমুদ্রের বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর খাবারের উৎস হয়।
তবে পেং বলেন, ‘তিমির এত বড় একটি সমাধিক্ষেত্র পাওয়াটা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল। এর বিস্তার, গভীরতা ও বয়সের পরিসর আমাদের কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি।’
গবেষকদের মতে, এই এলাকায় এত বেশি তিমি মারা যাওয়ার কারণ হতে পারে এটি তিমিদের খাবার খোঁজার একটি প্রিয় অঞ্চল। পাশাপাশি, এখানে থাকা ‘ভি’ আকৃতির গভীর খাদ মৃতদেহগুলোকে সমুদ্রের তলায় জমা হতে সাহায্য করেছে।
চীনা গবেষকেরা ২০২৩ সালে ফেনদৌঝে নামের একটি ডুবোযান দিয়ে এই গবেষণা শুরু করেন। এই ডুবোযানটি একসঙ্গে তিনজন বিজ্ঞানীকে নিয়ে গভীর সমুদ্রে ৩২টি ডাইভ দেয়। পরে তাদের পাওয়া তথ্য নেচার সাময়িকীতে প্রকাশ করা হয়।
বিজ্ঞানীরা ডুবোযানের রোবোটিক হাত ব্যবহার করে সমুদ্রতল থেকে বিভিন্ন কঙ্কাল ও নমুনা সংগ্রহ করেন।
গবেষক ঝৌ বলেন, তিমির এই ‘সমাধিক্ষেত্র’ নিজের চোখে দেখাটা ছিল এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। তিনি বলেন, সেখানে যে জীবন্ত ও বৈচিত্র্যময় বাস্তুতন্ত্র দেখা গেছে, তা অন্ধকার ও ঠান্ডা সমুদ্রতল সম্পর্কে তাঁদের ধারণাই বদলে দিয়েছে। সেখানে জেলিফিশ, কৃমি, শামুক, ক্রাস্টেশিয়ান, ব্রিটল স্টার এবং বাইভালভ নামের মলাস্কসহ নানা প্রাণী এই মৃত তিমির দেহের ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ‘ডায়মেন্টিনা জোন’ নামে চিহ্নিত এ অঞ্চলটিতে এক কোটির বেশি তিমির মৃতদেহ থাকতে পারে। বেশির ভাগই ছিল ‘বেকড হোয়েল’।
এই বিশালসংখ্যক মৃতদেহে থাকা চর্বি ও জৈব পদার্থ মিলিয়ে প্রায় ৬৭ লাখ টন কার্বন সমুদ্রের তলদেশে আটকে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ আফ্রিকা, আইবেরীয় উপদ্বীপ এবং ক্রোজেট দ্বীপপুঞ্জের কাছেও এমন আরও সমাধিক্ষেত্র থাকতে পারে।
হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞানী ক্রেইগ স্মিথ ১৯৮৭ সালে প্রথমবারের মতো তিমির মৃতদেহ ঘিরে তৈরি হওয়া বাস্তুতন্ত্র (হোয়েল ফল) আবিষ্কার করেছিলেন। নতুন এই গবেষণায় তিনি যুক্ত ছিলেন না। তবে তিনি এ আবিষ্কারকে ‘অত্যন্ত রোমাঞ্চকর’ বলে উল্লেখ করেছেন।
ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক এবং তিমির মৃতদেহ–সংক্রান্ত গবেষক অ্যামি বাকো-টেলর বলেন, এই ‘অসাধারণ আবিষ্কার’ থেকে সম্ভবত অনেক নতুন তথ্য পাওয়া যাবে।
তবে টেলর মনে করেন, এত বেশিসংখ্যক তিমির ওই এলাকায় মারা যাওয়ার বিষয়টি সত্যিই অদ্ভুত। তিনি বলেন, ‘তিমির চেতনা বা আচরণ সম্পর্কে আমরা এখনো যথেষ্ট জানি না।’
যুক্তরাষ্ট্রের জীবাশ্মবিদ স্টিফেন গডফ্রে অতীতের বড় সামুদ্রিক আবিষ্কারের সঙ্গে এই ‘অনন্য আবিষ্কার’-এর তুলনা করেছেন। যেমন ১৯৭৭ সালে বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো সমুদ্রের তলদেশে প্রাণে ভরপুর হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট আবিষ্কার করেছিলেন।
গডফ্রে ভবিষ্যতে আরও ডুবোযান অভিযান চালিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এমন তিমির সমাধিক্ষেত্র খুঁজে বের করার আহ্বান জানিয়েছেন।
নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট একটি প্রবন্ধে গডফ্রে লিখেছেন, এই আবিষ্কার তাঁকে ‘একটি মহাকাব্যিক চলচ্চিত্র সিরিজের প্রথম পর্বের ট্রেলারের’ কথা মনে করিয়ে দিয়েছে।
ভবিষ্যতে এমন আরও ‘চমকপ্রদ আবিষ্কার’ হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন গডফ্রে।