
স্টিভ জবস নিয়ে লিখতে হবে। সেই স্টিভ জবস, যিনি ব্যক্তিগত কম্পিউটার ব্যবহারের ধারণাই পাল্টে দিয়েছিলেন। মুঠোফোনের জগতে এনেছিলেন বিপ্লব। অ্যানিমেশন সিনেমায় যুক্ত করেছিলেন নতুন প্রযুক্তি, গান শোনার ধরনটাই পাল্টে দিয়েছিলেন। বিখ্যাত আইরিশ গায়ক বোনো স্টিভের ভালো বন্ধু ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘একবিংশ শতাব্দী তৈরি করেছে স্টিভের মতো কিছু অদ্ভুত ধরনের মানুষ। কারণ, তারা অন্য রকম করে ভাবতে জানত। মান্ধাতা আমলের চিন্তাভাবনা দিয়ে এ সম্ভব ছিল না।’
আসলে দুনিয়া বদলে দিয়েছিলেন ২০ বছরের কয়েকজন তরুণ, তাঁদের একজন স্টিভ জবস, অন্যজন বিল গেটস। প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাঁরা এমন সব কাণ্ডকারখানা করেছিলেন, যাতে পুরো একবিংশ শতাব্দীর ইতিহাসই নতুন করে লিখতে হয়েছে। তিনি নিজে প্রযুক্তিবিদ ছিলেন না, কলেজও শেষ করেননি; অথচ তৈরি করে দিয়েছেন এক জাদুকরি জগৎ।
স্টিভ জবস মারা গেছেন ১৫ বছর আগে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত অসংখ্য নাটকীয় উপাদানে ভরা তাঁর ৫৬ বছরের জীবন। সেই জীবনের কিছু গল্প বলব বলেই এই লেখা।
২০০৫ সালের জুনে স্বনামধন্য স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি স্টিভ জবসকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল সমাবর্তন বক্তা হওয়ার জন্য। স্টিভের তখন ক্যানসার ধরা পড়েছে, যদিও তা খুব বেশি মানুষ জানত না। এর আগে কখনো সমাবর্তন বক্তৃতা দেওয়া হয়নি। ভাবলেন, বিখ্যাত স্ক্রিপ্টরাইটার আরন সার্কিনকে দিয়ে লিখিয়ে নেবেন। কিন্তু তাঁকে পাওয়াই গেল না। অগত্যা নিজেই লিখতে বসে গেলেন। স্টিভ জবস ঠিক করেছিলেন, কোনো লেকচার নয়, বরং গল্প করবেন। কারণ, সবাই গল্প শুনতে চায়। তাই সমাবর্তন মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘আজ আমি আপনাদের আমার জীবনের তিনটি গল্প বলতে চাই। এর বেশি কিছু নয়, কোনো বড় বক্তব্যও না। শুধু তিনটি গল্প।’
এখন পর্যন্ত যত সমাবর্তন বক্তৃতা দেওয়া হয়েছে, সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত স্টিভ জবসের বক্তৃতা। নিজের বলা সেই তিন গল্পই বরং শোনা যাক। আর এ ক্ষেত্রে আমার ভূমিকা সূত্রধরের। তাই তাঁর বলা গল্পেই নতুন কিছু যোগ করেছি, যাতে স্টিভ জবসের গল্পটা সম্পূর্ণ হয়।
প্রথম গল্প: ডটগুলো যুক্ত করা
ইংরেজিতে কথাটি ছিল, ‘কানেকটিং দ্য ডটস।’ এখনো বিখ্যাত হয়ে আছে এটি। স্টিভ জবসের মুখ থেকেই শোনা যাক।
‘প্রথম গল্পটি হলো জীবনের বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো কীভাবে একসময় গিয়ে যুক্ত হয় (কানেকটিং দ্য ডটস), সেই বিষয়ে। আমি রিড কলেজে প্রথম ছয় মাস পড়ার পর “ড্রপআউট” করি, কিন্তু তারপরও প্রায় আরও ১৮ মাস “ড্রপইন” ছাত্র হিসেবে সেখানে ঘোরাফেরা করেছি, তারপর সত্যিকারের অর্থে ছেড়ে দিই। তাহলে আমি ড্রপআউট করলাম কেন? এর শুরুটা আমার জন্মের আগেই।
‘আমার জৈবিক মা ছিলেন একজন তরুণী অবিবাহিত গ্র্যাজুয়েট ছাত্রী। তিনি সিদ্ধান্ত নেন আমাকে দত্তক দেবেন। তিনি খুব জোর দিয়ে চেয়েছিলেন, আমাকে যেন কলেজ-পাস-করা কোনো বাবা-মায়ের কাছে দত্তক দেওয়া হয়। ঠিক হয়েছিল যে একজন আইনজীবী ও তাঁর স্ত্রীর কাছে জন্মের সময়ই আমাকে দত্তক দেওয়া হবে। কিন্তু জন্মানোর পর শেষ মুহূর্তে তাঁরা সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেন। কারণ, তাঁরা একটি মেয়েশিশু চেয়েছিলেন। তখন অপেক্ষার তালিকায় থাকা আমার ভবিষ্যৎ বাবা-মা গভীর রাতে একটি ফোন পান, “একটি ছেলেশিশু এসেছে, আপনারা কি তাকে নেবেন?” তাঁরা বললেন, “অবশ্যই।”
‘পরে আমার মা জানতে পারেন যে আমার দত্তক মা কখনো কলেজ থেকে পাস করেননি, আর দত্তক বাবা হাইস্কুলও শেষ করেননি। তিনি দত্তক-কাগজে সই করতে অস্বীকার করেন। কয়েক মাস পরে তিনি রাজি হন শুধু তখনই, যখন আমার বাবা-মা প্রতিশ্রুতি দেন যে আমাকে কলেজে পড়ানো হবে। এভাবেই আমার জীবনের শুরু।
‘১৭ বছর পরে আমি সত্যিই কলেজে যাই। কিন্তু এমন একটি কলেজ বেছে নিই, যার খরচ প্রায় স্ট্যানফোর্ডের মতোই বেশি। আর আমার কর্মজীবী বাবা-মায়ের সারা জীবনের সঞ্চয় আমার টিউশন ফিতে খরচ হতে থাকে। ছয় মাস পর আমি এর কোনো মূল্য খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আমি জানতাম না, জীবনে কী করতে চাই; আর এটাও বুঝতে পারছিলাম না, কলেজ আমাকে কীভাবে তা বুঝতে সাহায্য করবে। আর এদিকে আমি সব টাকা খরচ করে ফেলছিলাম। এই অর্থ আমার বাবা-মা সারা জীবন ধরে জমিয়েছিলেন।
‘তাই আমি ড্রপআউট করার সিদ্ধান্ত নিই। তখন ব্যাপারটা বেশ ভয়ংকর লাগছিল। কিন্তু এখন পেছনে তাকিয়ে দেখি, এটা ছিল আমার নেওয়া সেরা সিদ্ধান্তগুলোর একটি। ড্রপআউট করার সঙ্গে সঙ্গেই বাধ্যতামূলক ক্লাসগুলো বন্ধ করি। আর যেসব ক্লাস বেশি আকর্ষণীয় মনে হতো, সেগুলোতে যাওয়া শুরু করলাম।
‘সবকিছু অবশ্য রোমান্টিক ছিল না। থাকার জন্য আমার কোনো ডর্ম রুম ছিল না, বন্ধুদের ঘরের মেঝেতে ঘুমাতাম। কোকের বোতল ফেরত দিয়ে ৫ সেন্ট করে জমা পেতাম, সেই টাকা দিয়ে খাবার কিনতাম। সপ্তাহে একবার ভালো খাবার পাওয়ার জন্য প্রতি রোববার রাতে সাত মাইল হেঁটে শহরের ওপারে হরে কৃষ্ণ মন্দিরে যেতাম। আমি এটা ভালোবাসতাম।
‘আর কৌতূহল ও অন্তর্দৃষ্টির টানে এমন কিছুর মধ্যে ঢুকে পড়েছিলাম, যার অনেক কিছুই পরে অমূল্য হয়ে দাঁড়ায়। একটি উদাহরণ দিই। সেই সময় সম্ভবত রিড কলেজেই দেশের সেরা ক্যালিগ্রাফি শিক্ষা দেওয়া হতো। ক্যাম্পাসজুড়ে প্রতিটি পোস্টার, প্রতিটি ড্রয়ারের লেবেল—সবই সুন্দর হাতে ক্যালিগ্রাফি করা ছিল। আমি যেহেতু ড্রপআউট করেছিলাম এবং নিয়মিত ক্লাস নেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল না, তাই ক্যালিগ্রাফি শেখার জন্য একটি ক্লাসে ভর্তি হই। সেখানে আমি ‘সেরিফ ও সান্স সেরিফ’ টাইপফেস সম্পর্কে শিখি, বিভিন্ন অক্ষরের জোড়ার মধ্যে কতটা ফাঁক রাখা হয়, তা শিখি। ভালো টাইপোগ্রাফি কেন ভালো, তা শিখি। এটি ছিল সুন্দর, ঐতিহাসিক, শিল্পসম্মত সূক্ষ্মতায় ভরা, যা বিজ্ঞান দিয়ে ধরা যায় না, আর আমি এটিকে ভীষণ আকর্ষণীয় মনে করেছিলাম।
‘এর কোনো কিছুরই তখন আমার জীবনে ব্যবহারিক প্রয়োগের সামান্য সম্ভাবনাও ছিল না। কিন্তু দশ বছর পরে যখন আমরা প্রথম ম্যাকিনটোশ কম্পিউটার ডিজাইন করছিলাম, আগের সবকিছু আমার মনে পড়ে, আর আমরা সবকিছু ম্যাকের মধ্যে যুক্ত করি। সেটিই ছিল প্রথম কম্পিউটার, যেখানে সুন্দর টাইপোগ্রাফি ছিল।
‘আমি যদি ড্রপআউট না করতাম, সেই ক্যালিগ্রাফি ক্লাসে ড্রপইনও না করতাম, তাহলে আজ পারসোনাল কম্পিউটারগুলোতে যে চমৎকার টাইপোগ্রাফি আমরা দেখি, তা হয়তো থাকত না।
‘কলেজে থাকাকালে জীবনের ঘটনাগুলো কীভাবে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হবে, তা বোঝা সম্ভব নয়। কিন্তু দশ বছর পরে পেছনে তাকালে দেখা যায়, সবকিছুই আসলে এক সুতায় গাঁথা। সামনে এগোতে গেলে এই যোগসূত্র ধরা পড়ে না, শুধু পেছনে তাকালেই বোঝা যায়।
‘তাই বিশ্বাস রাখতে হয় যে আজকের ছোট অভিজ্ঞতাগুলো ভবিষ্যতে কোনো না কোনোভাবে কাজে লাগবে। নিজের ভেতরের অনুভূতি, নিয়তি, জীবন বা কর্মফল—যেকোনো কিছুর ওপর ভরসা রাখুন। এই বিশ্বাস নিজের মনের কথা শুনে পথ চলতে আপনাকে সাহস দেবে, এমনকি যদি সেই পথটা সবার চেনা পথের বাইরেও হয়। আর এই সাহসই শেষ পর্যন্ত বড় পার্থক্য গড়ে দেয়।’
আমার সংযোজন—১: দত্তকের গল্পের পেছনে
স্টিভ জবস বক্তৃতায় নিজের জৈবিক বাবা-মায়ের কথা বলেছেন, যাঁরা ছেলেকে দত্তক দিয়েছিলেন। অল্প কথায় ঘটনাটি উল্লেখ করলেও পুরো গল্পটাই আসলে নাটকীয় উপাদানে ভর্তি। সেই গল্পটাই এবার জানা যাক।
আবদুল ফাত্তাহ জান্দালি ছিলেন সিরিয়ার এক ধনী ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান। ১৯৫০-এর দশকের শুরুতে ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিনে রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়ার সময় সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন জার্মান বংশোদ্ভূত ক্যাথলিক তরুণী জোয়ান শিবলের সঙ্গে। পরিবারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য ১৯৫৪ সালের গ্রীষ্মে জোয়ানকে নিয়ে যান সিরিয়ার দামেস্কে। জোয়ান সেখানে দুই মাস থাকেন। উইসকনসিনে ফিরে গিয়ে জোয়ান জানতে পারেন তিনি গর্ভবতী। তাঁদের দুজনের বয়সই ২৩। জোয়ানের বাবা আর্থার শিবল কট্টর ক্যাথলিক। কিছুতেই মেনে নেবেন না মেয়ের এই সম্পর্ক। হুমকি দিলেন সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার।
এরপর জোয়ান গোপনে সান ফ্রান্সিসকো গিয়ে সন্তানের জন্ম দেন। ১৯৫৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেওয়া সেই ছেলেটির নাম রাখা হয় আবদুল লতিফ জান্দালি। জোয়ান ছেলেকে দত্তক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দত্তক নেন পল জবস ও ক্লারা দম্পতি। পল জবস দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কোস্টগার্ডে কাজ করা একজন মেকানিক, আর ক্লারা আর্মেনীয় অভিবাসী পরিবারের মেয়ে। তাঁরা শিশুটির নাম রাখেন স্টিভেন পল জবস।
আসলে শিশুটিকে দত্তক না দিলেই পারতেন জোয়ান। তাঁর বাবার মৃত্যু হয় ১৯৫৫ সালের আগস্টে। পরে তিনি জান্দালিকে ঠিকই বিয়ে করেন। ১৯৫৭ সালে তাঁদের একটি মেয়ে হয়। সেই মেয়েটির নাম মোনা। তবে এই দাম্পত্য টেকেনি, ১৯৬২ সালে তাঁদের বিচ্ছেদ ঘটে।
শৈশব থেকেই স্টিভ জানতেন, তিনি দত্তক সন্তান। পরবর্তী সময়ে স্টিভের কয়েকজন সহকর্মী বলেছেন, পরিত্যক্ত হওয়ার প্রভাব পড়েছিল তাঁর জীবনে। তবে স্টিভ জবস সব সময়ই তাঁর দত্তক বাবা-মাকেই কৃতিত্ব দিয়েছেন ভালোবাসাপূর্ণ পরিবেশে বড় করে তোলার জন্য। স্টিভ নিজেকে দত্তক মনে করতেন না। বলতেন, তিনি তাঁর বামা-মায়ের বেছে নেওয়া সন্তান। এই দম্পতি পরে প্যাট্রিসিয়া বা প্যাটি নামে আরেকটি মেয়েশিশুকে দত্তক নেন। ১৯৫৯ সালে পরিবারটি ক্যালিফোর্নিয়ার মাউন্টেন ভিউতে চলে আসে।
যত দিন মা বেঁচে ছিলেন, জৈবিক বাবা-মায়ের কোনো খোঁজ করেননি স্টিভ। মা তাতে কষ্ট পাবেন। ১৯৮৬ সালে মারা যান ক্লারা। স্টিভের বয়স তখন ৩১। এরপর বাবার অনুমতি নিয়েই জৈবিক মায়ের খোঁজ নেওয়া শুরু করেন। গোয়েন্দাও লাগিয়েছিলেন। একসময় খুঁজে পেলেন জন্মসনদে সই করা ডাক্তারকে। ডাক্তার ভদ্রলোক অবশ্য ঠিকানা দিতে অস্বীকার করলেন। তবে একটি কাজ করেছিলেন। জোয়ান শিবলের ঠিকানা জানিয়ে স্টিভের জন্য একটি চিঠি লিখে রাখেন। বলা ছিল তিনি মারা যাওয়ার পরেই কেবল চিঠিটি দেওয়া যাবে। এর কিছুদিন পরে সেই ডাক্তার মারা যান। চিঠি পেয়ে জানলেন, মা জোয়ান শিবল লস অ্যাঞ্জেলেসেই থাকেন। পরে স্টিভ জবস বলেছেন, মাকে খুঁজে বের করার আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল দেখানো যে তাঁরা যাকে পরিত্যাগ করেছিলেন, সেই ছেলের খারাপ কিছু হয়নি, বরং ভালোই হয়েছে।
মা-ছেলের দেখা হলো। মা অনেকক্ষণ কাঁদলেন, ক্ষমাও চাইলেন বারবার। আরও জানালেন, মোনা সিম্পসন নামে স্টিভের এক বোনও আছে। মোনা তখন উঠতি লেখক, একটা উপন্যাস লেখা শুরু করেছেন। নিউইয়র্কে থাকা মোনাও জানতেন না যে তাঁর একটা ভাই আছে।
সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য মোনার কাছে গোপন থাকল স্টিভের নাম। শুধু কিছু সূত্র দিলেন জোয়ান। প্রথমে গরিব ছিল, পরে অনেক ধনী হয়েছে, দেখতে খুব সুন্দর, অনেক বিখ্যাত মানুষ, চুল লম্বা আর কালো। এরপর মোনা আর তাঁর সহকর্মীরা ভাবতে শুরু করলেন, কে হতে পারেন মোনার সেই বিখ্যাত ভাই। বেশির ভাগের ধারণা ছিল, ভাইটি হবেন অভিনেতা জন ট্রাভোল্টা। তারপর তাঁদের দেখা হলো নিউইয়র্কের এক রেস্তোরাঁয়। সেই থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মোনা সিম্পসন ছিলেন স্টিভের সবচেয়ে প্রিয় বোন ও বন্ধু।
মোনা পরে নামকরা ঔপন্যাসিক হয়েছেন। তাঁর বিখ্যাত বই অ্যানিহয়ার বাট হিয়ার যেমন পুরস্কার জিতেছে, এ নিয়ে সিনেমাও হয়েছে। ভাইকে নিয়েও লিখেছেন একটি উপন্যাস, আ রেগুলার গাই।
এরপর মোনা বাবার খোঁজ শুরু করেন। পাঁচ বছর বয়সে ছাড়াছাড়ি হয়েছিল বাবা-মেয়ের। একসময় খুঁজেও পেলেন বাবাকে। শিক্ষকতা ছেড়ে ক্যালিফোর্নিয়া স্যাক্রামেন্টো শহরে একটি রেস্তোরাঁ চালাতেন তিনি। মোনা গেলেন বাবার সঙ্গে দেখা করতে, স্টিভ যাননি। স্টিভ বলেছিলেন, ‘সে আমাকে ছেড়েছে বলে কোনো ক্ষোভ নেই আমার। কিন্তু মোনার সঙ্গেও সে একই কাজ করেছে, এই জিনিসটা সহ্য হচ্ছিল না আমার।’
মোনাকে দেখে বেশ খুশিই হন জান্দালি। আগেই স্টিভ মোনাকে বলে রেখেছিলেন, স্টিভের ব্যাপারে জান্দালিকে কিছুই বলা যাবে না। মোনা বলেনওনি। কয়েক ঘণ্টা কথা হলো দুজনের। জান্দালি কথায়–কথায় জানালেন মোনার আগেও একটা ছেলেবাচ্চা হয়েছিল। একটু রহস্য করে মোনা বললেন, ‘তারপর কী হলো ছেলেটার?’ জান্দালি উত্তর দিলেন, ‘জানি না। ছেলেটাকে বোধ হয় আর দেখা হবে না।’ কিন্তু মোনা আরও অবাক হলেন যখন জান্দালি তাঁর আগের রেস্টুরেন্টের কথা বলছিলেন। স্যান হোসেতে আগে জান্দালির অনেক সুন্দর একটা রেস্তোরাঁ ছিল। জান্দালি বলেছিলেন, ‘অনেক বিখ্যাত বিখ্যাত মানুষ আসত আমার ওই রেস্তোরাঁয়। এমনকি স্টিভ জবসও নিয়মিত আসত।’
জান্দালির সঙ্গে কথা শেষ করেই তড়িঘড়ি করে স্টিভকে ফোন দিলেন মোনা। মোনার কাছ থেকে সব শুনে স্বাভাবিকভাবেই খুব আশ্চর্য হলেন স্টিভ। ওই রেস্টুরেন্টের মালিকের চেহারা মনে করতে মোটেও বেগ পেতে হলো না। স্টিভ বলেছেন, ‘আমি বেশ কয়েকবার গিয়েছি ওই রেস্তোরাঁয়। খুব ভালো করে মনে আছে মালিকের কথা। সিরিয়ান ভদ্রলোকটির সঙ্গে হ্যান্ডশেকও করেছি।’
এরপরও স্টিভ জান্দালির সঙ্গে দেখা করার ব্যাপারে মোটেও আগ্রহী ছিলেন না। তবে জান্দালি একটা ব্লগ থেকে জানতে পারেন সব। স্বীকার করলেন মোনা। তবে এটাও জানালেন যে স্টিভ তাঁর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করতে চান না। এরপরও জান্দালিও কখনো আর স্টিভের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেননি। বাবাকে খোঁজার সেই কাহিনি নিয়েই মোনা লিখলেন তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস দ্য লস্ট ফাদার।
স্টিভ জৈবিক বাবাকে নয়, দত্তক বাবা-মাকে অ্যাপল কোম্পানির সাড়ে সাত লাখ ডলারের স্টক উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন। এই অর্থ দিয়ে পল জবস বাড়ির মর্টগেজের অর্থ পরিশোধ করেছিলেন।
দ্বিতীয় গল্প: লাভ অ্যান্ড লস
সমাবর্তনে বলা স্টিভ জবসের দ্বিতীয় গল্পটি মূলত নিজের কাজ নিয়ে। এখানে আছে তাঁর উত্থান, পতন, আবার পুনরুত্থানের গল্প। আবারও স্টিভের মুখ থেকেই শোনা যাক।
‘আমার দ্বিতীয় গল্পটি ভালোবাসা এবং তা হারিয়ে ফেলা নিয়ে। আমি ভাগ্যবান ছিলাম। জীবনের খুব শুরুর দিকেই বুঝে গিয়েছিলাম, আমি কী করতে ভালোবাসি। ২০ বছর বয়সে আমি আর ওজ (স্টিফেন ওজনিয়াক, স্টিভের চেয়ে পাঁচ বছরের বড়) বাবা-মায়ের গ্যারেজে বসে অ্যাপল কোম্পানি শুরু করি। আমরা খুব পরিশ্রম করেছি। মাত্র ১০ বছরে গ্যারেজে দুজন মানুষের ছোট উদ্যোগ থেকে অ্যাপল হয়ে উঠল দুই বিলিয়ন ডলারের কোম্পানি, কর্মী চার হাজারের বেশি। এরই মধ্যে আমরা আমাদের সেরা সৃষ্টি ম্যাকিনটোশ বাজারে এনেছি। ঠিক যখনই আমার বয়স ৩০ হলো, তখনই আমাকে চাকরি থেকে বের করে দেওয়া হলো।
‘আপনি যে কোম্পানি নিজে শুরু করেছেন, সেখান থেকেই কীভাবে বরখাস্ত হন? ঘটনা হলো, কোম্পানি বড় হওয়ার পর আমরা আমাদের সঙ্গে মিলে কোম্পানি চালানোর জন্য এমন একজনকে নিয়োগ দিলাম, যাকে আমি খুব মেধাবী মনে করতাম। প্রথম এক বছর সবকিছু ভালোই চলছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের ভাবনায় ফারাক দেখা দিল। মতবিরোধ বাড়তে বাড়তে একসময় সম্পর্ক ভেঙে গেল। পরিচালনা পর্ষদ শেষ পর্যন্ত তার পক্ষ নিল।
‘৩০ বছর বয়সে আমি বাইরে এবং সবার সামনে বাইরে। ব্যাপারটা ভীষণ আঘাত করেছিল। কয়েক মাস আমি বুঝতেই পারিনি কী করব। মনে হচ্ছিল, আগের প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের আমি হতাশ করেছি, আমার হাতে তুলে দেওয়া দৌড়ের ব্যাটন আমি ফেলে দিয়েছি। আমি ছিলাম খুব দৃশ্যমান এক ব্যর্থতার উদাহরণ। এমনকি সিলিকন ভ্যালি ছেড়ে চলে যাওয়ার কথাও ভেবেছিলাম।
‘কিন্তু ধীরে ধীরে একটা বিষয় পরিষ্কার হলো যে আমি এখনো আমার কাজটাকে ভালোবাসি। অ্যাপলে যা-ই ঘটুক, এই ভালোবাসা একটুও বদলায়নি। আমাকে বাদ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কাজটার প্রতি টান রয়ে গেছে। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম নতুন করে শুরু করব। তখন বুঝিনি, কিন্তু পরে দেখলাম অ্যাপল থেকে বরখাস্ত হওয়াটাই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে ভালো ঘটনা। সফলতার ভারী চাপ সরে গিয়ে আবার নতুন শিক্ষার্থীর হালকা অনুভূতি ফিরে এল, সবকিছু নিয়ে কম নিশ্চিত, কিন্তু বেশি মুক্ত। এ অবস্থাই আমাকে জীবনের সবচেয়ে সৃজনশীল সময়ে ঢুকে পড়ার সুযোগ দেয়।
‘পরের পাঁচ বছরে আমি নেক্সট নামে একটি কোম্পানি শুরু করি, পিক্সার নামে আরেকটি কোম্পানি গড়ে তুলি এবং এক অসাধারণ নারীর প্রেমে পড়ি, যিনি পরে আমার স্ত্রী হন। পিক্সার তৈরি করে বিশ্বের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য কম্পিউটার অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র টয় স্টোরি। পরে পিক্সার হয়ে ওঠে বিশ্বের সবচেয়ে সফল অ্যানিমেশন স্টুডিও।
‘অদ্ভুত এক মোড়ে অ্যাপল পরে নেক্সটকে কিনে নেয়, আর আমি আবার অ্যাপলে ফিরে যাই। নেক্সটে আমরা যে প্রযুক্তি তৈরি করেছিলাম, সেটাই আজকের অ্যাপলের পুনর্জাগরণের কেন্দ্রে আছে। লরিন আর আমি মিলে একটি সুন্দর পরিবার গড়েছি। আমি প্রায় নিশ্চিত যে অ্যাপল থেকে বরখাস্ত না হলে এসব কিছুই ঘটত না। ওষুধটা খেতে খুব তিতা ছিল, কিন্তু রোগীর জন্য দরকার ছিল।
‘জীবন কখনো কখনো ইট ছুড়ে মাথায় আঘাত করবে। বিশ্বাস হারাবেন না। আমি নিশ্চিত যে আমাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে একটাই জিনিস—আমি আমার কাজকে ভালোবাসতাম।
‘আপনাকে খুঁজে বের করতেই হবে আপনি কী ভালোবাসেন। কাজের ক্ষেত্রেও যেমন সত্য, সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তেমন। আপনার কাজ আপনার জীবনের বড় একটি অংশজুড়ে থাকবে। সত্যিকারের তৃপ্তি পাওয়ার একমাত্র পথ হলো আপনি যেটাকে মহান কাজ বলে মনে করেন, সেটাই করা। আর মহান কাজ করার একমাত্র উপায় হচ্ছে আপনি যা করেন, সেটাকে ভালোবাসা। যদি এখনো তা খুঁজে না পান, খুঁজতে থাকুন। থেমে যাবেন না, মেনে নেবেন না।
‘হৃদয়ের সব বিষয়ের মতো যখন আপনি এটি খুঁজে পাবেন, আপনি বুঝতে পারবেন। আর যেকোনো মহান সম্পর্কের মতো, বছর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এটি আরও ভালো হতে থাকবে।
‘তাই খুঁজে যান।
‘থেমে যাবেন না।’
আমার সংযোজন—২: স্টিভের জাদুকরি
আমার অনেকগুলো সংযুক্তি: বক্তৃতার এই অংশে স্টিভ জবস অনেকগুলো বিষয় সামনে এনেছিলেন—নিজের কাজ, সম্পর্ক, ফিরে আসা এবং শেষ পর্যন্ত অবদান রাখা। ফলে এই সংযুক্তিও কয়েকটি অংশে ভাগ করা যেতে পারে।
১. একবিংশ শতাব্দীতে স্টিভের অবদান: স্টিভ জবসের কিংবদন্তি সিলিকন ভ্যালি থেকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল তখনই। কলেজ থেকে ঝরে যাওয়া একটি ছেলে বাড়ির গ্যারেজে যে কোম্পানির যাত্রা শুরু করেছিলেন, সেটিই এখনো পৃথিবীর সবচেয়ে দামি প্রযুক্তি কোম্পানির একটি। আসলে স্টিভ জবস আইডিয়া, আর্ট আর টেকনোলজি মিলিয়ে ভবিষ্যৎ তৈরি করে দিয়েছিলেন। একের পর এক অসাধারণ সব জিনিস পৌঁছে দিয়েছেন মানুষের হাতে।
গবেষকেরা বলেন, স্টিভ জবসের কল্পনাশক্তি ছাড়িয়ে গেছে অকল্পনীয় স্তরকেও। পৌঁছে গেছে জাদুকরি স্তরে। ভবিষ্যৎ দেখতে পাওয়ার ক্ষমতা অবশ্যই জাদুকরি ক্ষমতা। স্টিভ জবস গান পছন্দ করতেন। কবিতার প্রতি ঝোঁক ছিল। গিটার বাজাতেন। ফলে তাঁর সৃষ্টির মধ্যে শিল্পের ছোঁয়া ছিল সব ক্ষেত্রেই। তাই বলা হয়, তাঁর তৈরি জিনিসগুলোর প্রতিটাই একটা কবিতা, যে কবিতা বাইনারির ভাষায় কথা বলে, প্রসেসরের ভাষায় কাজ করে।
এবার অল্প কথায় তাঁর অবদানগুলো উল্লেখ করি:
• অ্যাপল-২, ওজনিয়াকের সার্কিট বোর্ড নিয়ে তৈরি হলো পৃথিবীর প্রথম পারসোনাল কম্পিউটার। শখের দুনিয়া থেকে পারসোনাল কম্পিউটার এল বাস্তব দুনিয়ায়।
• ম্যাকিনটোশ, গ্রাফিক্যাল ইউজার ইন্টারফেস দিয়ে পারসোনাল কম্পিউটারের জগতে বিপ্লব ঘটিয়ে দিল।
• টয় স্টোরিসহ পিক্সারের অন্য সব ব্লকবাস্টার সিনেমা, অ্যানিমেশন মুভির দুনিয়ায় ঘটাল আরেক বিপ্লব।
• অ্যাপল স্টোর, ব্র্যান্ড ইমেজ তৈরিতে খুচরা দোকান কী অসাধারণ ভূমিকা রাখতে পারে, তার জ্বলন্ত উদাহরণ।
• আইপড, গানপ্রেমীদের মন তো জয় করলই, যারা গান শুনতে বিরক্তবোধ করত, তারাও গানপ্রেমী হয়ে উঠল।
• আইটিউনস স্টোর মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিকে শুধু মৃত্যুর মুখ থেকেই তুলে আনেনি, আমূল বদলেও দিয়েছে।
• আইফোন, শুধু ফোনকে একাধারে মিউজিক, ভিডিও, ফটোগ্রাফি, ওয়েব ডিভাইসে পরিণত করল।
• আইপ্যাড, ট্যাবলেট কম্পিউটার যুগের সূচনা করল। বই, ম্যাগাজিন, ভিডিও, ইন্টারনেট—সবকিছুকে আরও সহজ করে ডিজিটাল লাইফস্টাইলকে আরও পাল্টে দিল।
• অ্যাপল কোম্পানিটাই স্টিভের সবচেয়ে বড় সৃষ্টি। সবচেয়ে ধনী কোম্পানি, যেখানে কল্পনাকে বাস্তবে নিয়ে আসা হয়।
২. প্রেমিক পুরুষ স্টিভ: স্টিভ জবস প্রেমের ব্যাপারে ছিলেন আবেগপ্রবণ ও দ্রুত আকৃষ্ট হওয়া মানুষ। সম্পর্কের উত্থান-পতন তিনি বন্ধুদের সঙ্গে খোলামেলাভাবে ভাগ করে নিতেন। স্টিভের বোন মোনা বলেছিলেন, ‘ভালোবাসা নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে স্টিভ অনেকটা মেয়েদের মতো ছিলেন। অনেক সময় দিতেন। ভালোবাসা ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় গুণ, তাঁর কাছে দেবতারও দেবতা।’ এবার স্টিভের সেই ভালোবাসার গল্পগুলোই বলা যাক।
ক্রিসান ব্রেনান: স্টিভ জবসের প্রথম প্রেমিকা ক্রিসান ব্রেনান। ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে, অ্যাপল প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে তাঁদের পরিচয় ও প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সেই সম্পর্ক বেশি দিন টেকেনি। তাঁদের প্রেম যখন ফিকে হয়ে যাচ্ছিল, দুজনে জানতেন সেই সম্পর্ক টিকবে না, তখনই ক্রিসান গর্ভবতী হন। ১৯৭৮ সালের ১৭ মে তাঁদের একটি কন্যাসন্তান জন্ম নেয়, নাম লিসা ব্রেনান-জবস। সন্তানের জন্মের পর প্রথম দিকে স্টিভ জবস পিতৃত্ব স্বীকার করেননি, এ নিয়ে আইনি প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছিল। এমনকি ডিএনএ টেস্টও করেন স্টিভ। স্টিভকে যেমন তাঁর বাবা-মা পরিত্যাগ করেছিলেন, সেই একই কাজ তিনি করেছিলেন লিসার সঙ্গেও। পরে তিনি পিতৃত্ব মেনে নেন এবং মেয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরে স্বীকার করেছিলেন, এটি ছিল তাঁর অন্যতম বড় ভুল। তাঁদের সম্পর্কেও ছিল নানা উত্থান-পতন। এই লিসার নাম থেকেই অ্যাপল তাদের একটি প্রাথমিক কম্পিউটার প্রকল্পের নাম রেখেছিল ‘অ্যাপল লিসা’।
কেন তিনি মেয়েকে পরিত্যাগ করেছিলেন? তাঁর এক সহকর্মী বলেছিলেন, ‘স্টিভ কেন কারও কারও প্রতি বেশি বেশি নিষ্ঠুর আচরণ করেছে, ওই প্রশ্নের উত্তরও পাওয়া যায় মা-বাবার কাছ থেকে ওর নিজের পরিত্যক্ত হওয়ার ঘটনাটার ভেতর।’ পরে জবস নিজে এ ব্যাপারে বলেছেন, ‘আমাকে আমার মা-বাবা ত্যাগ করেছিলেন বলে আমি অনেক কষ্ট করি, অনেক পরিশ্রম করি, যাতে অনেক ভালো কিছু করতে পারি, যাতে আমাকে ছেড়ে যাওয়ায় আমার মা-বাবার আফসোস হয় বা এ রকম কিছু।’
লিসা ব্রেনান-জবস পরে একজন লেখক হিসেবে পরিচিতি পান। স্মৃতিকথা স্মল ফ্রাই বইয়ে লিসা নিজের শৈশব এবং স্টিভ জবসের সঙ্গে সম্পর্কের নানা দিক তুলে ধরেছেন। তবে লিসার দায়িত্ব নেওয়ার পর স্টিভের মধ্যে কিন্তু বেশ পরিবর্তন এসেছিল। পাগলামি বা ড্রাগস—সব এক পাশে সরিয়ে বেশ গুছিয়ে পথচলা শুরু করেন। ভদ্র হেয়ার কাট, স্টাইলিশ স্যুট-বুট পরা শুরু করেছিলেন। সঙ্গে বারবারা জ্যাসিনস্কি নামের এক পলিনেশিয়ান-পোলিশ কন্যার সঙ্গে নতুন সম্পর্কেও জড়িয়ে পড়েছিলেন। এই সম্পর্ক অবশ্য বেশি দিন টেকেনি।
জোয়ান বায়েজ: ১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশের জনগণের ওপর নৃশংস সশস্ত্র আক্রমণ চলছিল, তখন জোয়ান বায়েজ লিখেছিলেন ‘দ্য স্টোরি অব বাংলাদেশ’ গান। গানটি পরে অ্যালবাম বা সিডিতে ‘সং অব বাংলাদেশ’ নামে প্রকাশিত হয়েছে। এই জোয়ান বায়েজের সঙ্গেও সম্পর্ক হয়েছিল স্টিভ জবসের। ১৯৮২ সালে এক চ্যারিটি অনুষ্ঠানের সূত্রেই দেখা। তারপর সম্পর্ক। এ নিয়ে স্টিভ তাঁর জীবনী লেখককে বলেছিলেন, ‘আমি খুব বেশি কিছু যে আশা করেছিলাম, তা নয়। কিন্তু দেখা হওয়ার পর দেখলাম, জোয়ান খুব স্মার্ট আর মজার মানুষ।’
স্টিভের বয়স তখন সাতাশ আর জোয়ানের একচল্লিশ। স্টিভের ভাষায়, ‘ভালো বন্ধু থেকে অনেকটা অ্যাক্সিডেন্টলি ভালোবাসার মানুষ হয়ে গিয়েছিল জোয়ান।’ তবে স্টিভের বন্ধুদের ধারণা, স্টিভ জোয়ানের রূপ বা গুণ দেখে যতটা না প্রেমে পড়েছেন, তার চেয়ে বেশি পড়েছেন জোয়ান বব ডিলানের গার্লফ্রেন্ড ছিলেন, এই কারণে। কারণ, স্টিভ বব ডিলানের বিশাল ভক্ত ছিলেন। স্টিভ এ নিয়ে বলেছেন, ‘আমার মনে হয়, আমি জোয়ানের প্রেমে পড়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু ভালোবাসার চেয়ে পছন্দের পরিমাণটা ছিল বেশি। আর একসঙ্গে থাকা আমাদের কারও নিয়তিতেই ছিল না।’
১৯৯০ সালে নিজের স্মৃতিকথায় জোয়ান বায়েজ লিখেছেন, ‘একা থাকাই আমার নিয়তি। সব সময় একাই ছিলাম। শুধু মাঝে মাঝে যে সম্পর্কগুলো হয়েছে, সেগুলো আমার কাছে অনেকটা পিকনিকের মতো।’
জেনিফার ইগান: ১৯৮৩ সালের গ্রীষ্মে এক ডিনার পার্টিতে পরিচয় হয় তরুণ লেখক-শিক্ষার্থী জেনিফার ইগানের সঙ্গে। তখন তিনি গায়িকা জোয়ান বায়েজের সঙ্গে সম্পর্কের শেষ পর্যায়ে। জেনিফারকে ভালো লেগে গেলে খোঁজ নিয়ে নিজেই যোগাযোগ করেন। প্রায় এক বছর তাঁদের সম্পর্ক চলে। আরেক শহরে থাকলেও নিয়মিত দেখা করা, দীর্ঘ ফোনালাপ, তর্ক-আলোচনায় ভরা ছিল সেই সময়। ১৯৮৪ সালে ম্যাকিনটোশ তৈরির পর জবস হঠাৎ একদিন জেনিফারের বাসায় নতুন ম্যাকিনটোশ নিয়ে হাজির হয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন। তবে বিয়ে নিয়ে মতভেদে সেই সম্পর্ক ভেঙে যায়। জেনিফার বিয়ের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না।
টিনা রেডসে: এর কিছুদিন পর, ১৯৮৫ সালের শুরুতে তাঁর জীবনে আসেন টিনা রেডসে। প্রথম দেখাতেই মুগ্ধ হন জবস। শুরুতে টিনা রাজি না হলেও পরে তাঁদের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং দ্রুত গভীর হয়। কয়েক মাসের মধ্যে টিনা তাঁর সঙ্গে থাকতে শুরু করেন। জবস পরে বলেছেন, টিনাই সম্ভবত প্রথম নারী, যাঁকে তিনি সত্যিকারের গভীরভাবে ভালোবেসেছিলেন। দুজনের মধ্যে তীব্র মানসিক ও শারীরিক আকর্ষণ ছিল, আবার ঝগড়া-বিরোধও ছিল ঘন ঘন। স্বভাবের দিক থেকে তাঁরা ছিলেন একেবারেই ভিন্ন। টিনা সহানুভূতিশীল ও মানুষকেন্দ্রিক, জবস বেশি কঠোর ও আত্মকেন্দ্রিক। তবু সম্পর্কটি টিকে ছিল প্রায় পাঁচ বছর।
বিচ্ছেদের পরও টিনার প্রতি জবসের টান কমেনি। ১৯৮৯ সালে তিনি আবার বিয়ের প্রস্তাব দেন, কিন্তু টিনা রাজি হননি। টিনা মনে করতেন, জবসের মতো বৃহৎ ব্যক্তিত্বের জীবনে তিনি উপযুক্ত সঙ্গী হতে পারবেন না। পরে টিনা অন্যত্র বিয়ে করেন; সংসারও ভেঙে যায়। তবু দুজনের যোগাযোগ বন্ধ হয়নি। জবসের অসুস্থতার সময়ও টিনা পাশে ছিলেন। একসঙ্গে থাকা না হলেও সেই ভালোবাসা পুরোপুরি কখনো শেষ হয়ে যায়নি।
লরিন পাওয়েল এবং বিয়ে: ১৯৮৯ সালের অক্টোবরে স্ট্যানফোর্ড বিজনেস স্কুলে লেকচার দিতে যান স্টিভ জবস। সেদিন ক্লাসে দেরি করে ঢোকেন সদ্য গ্র্যাজুয়েট লরিন পাওয়েল। সব আসন ভর্তি দেখে তিনি সামনের একটি রিজার্ভ সিটে বসেন। লেকচার দিতে দিতে হঠাৎ স্টিভের চোখে পড়ল সামনে বসা আত্মবিশ্বাসী মেয়েটির দিকে। কথা বলতে গিয়ে হালকা মজা করে লরিন বলেছিলেন, রিজার্ভ সিটে বসেছেন কারণ ‘লটারি জিতেছেন’, আর সেই খুশিতে জবসের উচিত তাঁকে ডিনারে নিয়ে যাওয়া। স্টিভ লেকচার শেষে ভিড়ের মধ্যে তাঁকে খুঁজে বের করেন, পার্কিং লটে গিয়ে সরাসরি জিজ্ঞেস করেন, ‘ডিনারটা কবে হবে?’
সেদিনই পরিকল্পনা বদলে যায়। অন্য এক করপোরেট ডিনারে যাওয়ার কথা থাকলেও স্টিভ সেটি বাদ দিয়ে লরিনকে নিয়ে যান একটি নিরামিষ রেস্টুরেন্টে। কয়েক ঘণ্টার সেই ডিনার থেকেই শুরু দুজনের দীর্ঘ সম্পর্ক। লরিন নিজেও নিরামিষভোজী ছিলেন।
লরিনের জীবনও ছিল সংগ্রামে গড়া। নিউ জার্সিতে জন্ম, পাইলট বাবা এক বিমান দুর্ঘটনায় মারা যান। নিজে বাঁচতে পারতেন, তবু জনবহুল এলাকা এড়াতে গিয়ে প্রাণ দেন। পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষে গোল্ডম্যান স্যাকসে কাজ করেন, পরে চাকরি ছেড়ে ইতালি ঘুরে স্ট্যানফোর্ডে এমবিএ করতে আসেন। স্বাধীনতাকে বেশি মূল্য দিতেন লরিন।
তবে সম্পর্কের শুরুটা অতটা মসৃণ ছিল না। স্টিভ জবস তখনো আগের প্রেমিকা টিনা রেডসেকে ভুলে উঠতে পারেননি। কখনো বিয়ের কথা বলেন, আবার মাসের পর মাস চুপ থাকেন। এতে বিভ্রান্ত ও বিরক্ত হয়ে একসময় লরিন আলাদা হয়ে যান। অবশেষে ১৯৯১ সালের ১৮ মার্চ তাঁদের বিয়ে হয়। ঘনিষ্ঠজনদের উপস্থিতিতে, জেন আধ্যাত্মিক গুরুর পরিচালনায় সম্পন্ন হয় অনুষ্ঠান। ঝড়ঝাপটার পর এটাই ছিল স্টিভ জবসের জীবনের সবচেয়ে স্থির ও দীর্ঘস্থায়ী প্রেমের ঠিকানা।
৩. ধর্ম, আধ্যাত্মিকতা ও ভারত সফর: স্টিভ জবসের জীবনে ভিন্ন এক অধ্যায়ও আছে। তাঁর চিন্তা, জীবনদর্শন ও সৃজনশীলতার গভীরে ছিল আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান, জেন বৌদ্ধধর্মের প্রভাব, ভারত সফরের অভিজ্ঞতা এবং একধরনের কঠোর খাদ্যশৃঙ্খলা। প্রযুক্তির নকশা থেকে ব্যক্তিগত জীবন—সবখানেই এই প্রভাবের ছাপ স্পষ্ট ছিল।
কৈশোর থেকেই স্টিভ জবস প্রচলিত ধর্মের চেয়ে ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানে বেশি আগ্রহী ছিলেন। ১৯৭০-এর দশকের ক্যালিফোর্নিয়ার কাউন্টার কালচার, ধ্যান, যোগ, এলএসডি-অভিজ্ঞতা—এসব তাঁর চিন্তার জগৎ খুলে দেয়। ১৯৭০-এর দশকের সেই হিপি-জীবনে তীব্রভাবেই ঝুঁকেছিলেন।
১৯৭৪ সালে তরুণ স্টিভ জবস ভারত ভ্রমণে আসেন। উদ্দেশ্য ছিল আধ্যাত্মিক শিক্ষক নিম তারোলি বাবার আশ্রমে যাওয়া। কিন্তু ভারতে পৌঁছে জানতে পারেন, সেই গুরু ইতিমধ্যেই মারা গেছেন। তবু কয়েক মাস তিনি উত্তর ভারতে ঘুরে বেড়ান। তাঁর সেই ভারত সফর ছিল কষ্টকর। অসুস্থ হয়ে পড়েন। অর্থকষ্ট তো ছিলই। বাবা-মা এসে স্টিভকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যান। পরে স্টিভ জবস বলেন, এই সফর তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। ভারত থেকে ফিরে তিনি আরও সংযমী, স্বল্পাহারী ও মনোযোগী জীবনধারার দিকে ঝুঁকে পড়েন।
আধ্যাত্মিকতার প্রতি স্টিভের এই আকর্ষণ মোটেও হুজুগে টাইপ ছিল না। স্টিভের পুরো জীবনই এতে প্রভাবিত। ভারত ভ্রমণের অনেক বছর পর স্টিভ বলেছেন, ‘ভারতে আমি সংস্কৃতিগত বিরাট একটা পার্থক্য দেখেছি। ভারত ও এর পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে মানুষের চালিকা শক্তি তাদের মন। পশ্চিমাদের মতো তারা শুধু মাথা খাটিয়ে কাজ করে না। আমারও মনে হয়, মন খুব শক্তিশালী একটি জিনিস। এই বিশেষ ভাবনাটা আমার জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।’
ভারত থেকে ফেরার পরে স্টিভ জবস জেন বৌদ্ধধর্মের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হন। ক্যালিফোর্নিয়ায় তিনি জেন-গুরু কোবুন চিনো ওতোগাওয়ার কাছে ধ্যান শিখতেন। পরবর্তী সময়ে এই জেন-গুরুই তাঁর বিয়ের অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন।
স্টিভ জবস জীবনের বিভিন্ন সময়ে চরম খাদ্যনিয়ম মেনে চলেছেন। একসময় তিনি ‘ফ্রুটারিয়ান ডায়েট’ বা রান্না ছাড়া ফলনির্ভর খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করতেন। প্রধানত ফল, বাদাম, কাঁচা সবজি খেতেন। জীবনের অনেকটা সময় তিনি কেবল আপেল ও গাজর খেয়ে কাটিয়েছেন। বিশ্বাস করতেন, বিশুদ্ধ খাবার শরীর ও মন—দুটোকেই সতেজ ও পরিচ্ছন্ন রাখে। এমনকি মনে করতেন, তাঁর যে খাদ্যাভ্যাস, তাতে সপ্তাহে এক দিন গোসল করাই যথেষ্ট। তবে এই খাদ্যাভ্যাস পরবর্তী সময়ে তাঁর শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছিল।
নিজের কোম্পানির নাম অ্যাপল রাখার পেছনেও তাঁর ফলভিত্তিক খাদ্যাভ্যাস ও বন্ধুসুলভ নামের প্রতি পছন্দ কাজ করেছিল।
৪. কঠোর একজন বস: স্টিভ জবস বস হিসেবে কতটা কঠোর ও রুক্ষ হতে পারতেন, তা নিয়ে তাঁর সহকর্মীদের স্মৃতিতে বহু ঘটনা আছে। তিনি ঘুরিয়ে কথা বলতেন না, কোনো কাজ পছন্দ না হলে সরাসরি বলে দিতেন, ‘ঘোড়ার ডিম হয়েছে।’ অনেক সময় পরিকল্পনা শুনেই বলে উঠতেন, ‘এটা বাজে, এটা একদম চলবে না’। তাঁর ভাষা প্রায়ই কড়া হতো, যা শুনে অনেকে অপমানিত হতেন বা ভেঙে পড়তেন। তবে তাঁর উদ্দেশ্য ছিল শুরুর দিকেই দুর্বল ধারণা বাদ দেওয়া। তিনি প্রতিটি বিষয় নিয়ে বৈঠক করতে পছন্দ করতেন। তবে পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনা একেবারেই সহ্য করতেন না। বলতেন, যে কিছু জানে না, সে-ই পাওয়ার পয়েন্ট ব্যবহার করে। তিনি সাদা বোর্ড নিয়ে মিটিংয়ে আসতেন। সেখানেই সব লিখে লিখে দেখাতেন।
অফিসে স্টিভ জবসের সঙ্গে লিফটে একা পড়া মানেই অস্বস্তিকর জেরা। তিনি হঠাৎ জিজ্ঞেস করতেন, ‘তুমি কী কাজ করো? কেন এটা গুরুত্বপূর্ণ?’ উত্তর দুর্বল হলে সেখানেই কড়া সমালোচনা শুনতে হতো। এমন হঠাৎ কথোপকথনের পর কারও দায়িত্ব বদলে বা প্রজেক্ট থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও আছে। বস হিসেবে স্টিভ ছিলেন অত্যন্ত কড়া।
স্টিভ নিখুঁত কাজ চাইতেন। দেরি বা অজুহাত পছন্দ করতেন না। তবে একই সঙ্গে টিমকে বিশেষ ও বাছাই করা দল বলে অনুপ্রাণিতও করতেন। কঠোরতা ও উচ্ছ্বাস—দুটোই ছিল একসঙ্গে। নকশা বা ডিজাইন নিয়ে তাঁর খুঁতখুঁতি ছিল কিংবদন্তিতুল্য। এমনকি কম্পিউটারের ভেতরের সার্কিট বোর্ড, ব্যবহারকারী যা দেখতেও পাবে না, সেটিও সুন্দর ও গোছানো হতে হবে বলে তিনি জোর দিতেন। ইঞ্জিনিয়াররা বলতেন, ‘এটা তো কেউ দেখবে না।’ জবসের উত্তর ছিল, ‘আমরা তো জানব।’ এটি স্টিভ নিজের বাবার কাছ থেকে পেয়েছিলেন।
চাকরির সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় প্রার্থীদের অদ্ভুত অদ্ভুত সব প্রশ্ন করতেন। দীর্ঘ সময় ধরে একসঙ্গে হেঁটে হেঁটে চাকরিপ্রার্থীর সাক্ষাৎকার নিতেন। এমনিতেই তিনি সব সময়ই হেঁটে হেঁটে কথা বলতে পছন্দ করতেন।
আসলে আজকের কম্পিউটারনির্ভর বিশ্ব গড়ে তুলতে স্টিভ জবসের ভূমিকা অসাধারণ। তিনি ছিলেন লক্ষ্যভেদী ও পরিপূর্ণ কাজের প্রতি ভীষণ কঠোর একজন মানুষ। প্রযুক্তি দিয়ে পৃথিবী বদলাতে চেয়েছিলেন। কাজের মান নিয়ে তিনি কোনো ছাড় দিতেন না। এই মনোভাবই তাঁকে বড় সাফল্য এনে দেয়। এ কারণে সহকর্মীদের সঙ্গে তাঁর দ্বন্দ্বও হয়েছে। অনেকের কাছে তিনি রূঢ় মনে হতো। কিন্তু স্টিভ জবস বলতেন, চাপ না দিলে মানুষের সেরা কাজ বের হয় না।
৫. পাইরেটস অব সিলিক্যান ভ্যালি: স্টিভ জবস ও বিল গেটসের সম্পর্ক নিয়ে কিছু না বললে লেখাটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। প্রযুক্তিজগতের এই দুই কিংবদন্তির সম্পর্ক ছিল অনেকটা রোলার-কোস্টারের মতো। তাঁদের মধ্যে যেমন গভীর বন্ধুত্ব ও শ্রদ্ধা ছিল, তেমনি ছিল তীব্র ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও তিক্ত বিতর্ক। দুজনের জন্মই ১৯৫৫ সালে। বিল গেটসের বাবা ছিলেন স্বনামধন্য আইনজীবী। গেটস বিপ্লবী মনোভাবের মানুষ, আধ্যাত্মিক বিষয়ে অনাগ্রহী। স্টিভের মতো তিনিও কলেজ ড্রপআউট, কিন্তু গেটসের ড্রপআউট হওয়ার কারণ ভিন্ন। উদ্দেশ্য ছিল একটা কম্পিউটার সফটওয়্যার কোম্পানি শুরু করা। সেই কোম্পানিটি হলো মাইক্রোসফট।
একুশ শতকের শুরুর দিকে প্রযুক্তি দুনিয়ায় সবচেয়ে প্রভাবশালী দুই ব্যক্তিত্ব ছিলেন তাঁরা। স্টিভ জবসের জীবনীকার ওয়াল্টার আইজাকসন তাঁদের তুলনা করেছেন ইতিহাসের বিখ্যাত জুটিদের সঙ্গে। যেমন আইনস্টাইন-নিলস বোর বা জেফারসন-হ্যামিল্টন। প্রযুক্তির দিক থেকে তাঁদের লক্ষ্য ছিল কাছাকাছি, কিন্তু ব্যক্তিত্ব ও কাজের ধরন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেই মিল তাঁদের কাছাকাছি এনেছে, আর অমিল তৈরি করেছে সংঘাত। এই দুজনকে বলা হয় ‘পাইরেটস অব সিলিক্যান ভ্যালি’। বিদ্রোহী, নিয়ম ভাঙা, আইডিয়া ছিনিয়ে নেওয়া, দ্রুত দখল—এসব অর্থেই তাঁদের পাইরেট বলা হতো। এ নামে তাঁদের নিয়ে একটি সিনেমাও আছে।
শুরুতে জবস ও গেটস একসঙ্গে কাজ করেছিলেন। সেই সময় কম্পিউটার ছিল বড় আকারের যন্ত্র। ‘অ্যাপল-টু’ কম্পিউটারের কিছু সফটওয়্যার তৈরি করেছিল মাইক্রোসফট। বিল গেটস নিয়মিত ক্যালিফোর্নিয়ায় অ্যাপলের অফিসে যেতেন, নতুন কাজ দেখতেন।
১৯৮৩ সালে তাঁদের সম্পর্ক ছিল বেশ হালকা ও বন্ধুসুলভ। অ্যাপলের এক অনুষ্ঠানে ‘ম্যাকিনটোশ সফটওয়্যার ডেটিং গেম’ নামে মজার একটি পর্বে গেটস অংশ নেন। স্টিভ জবস সেখানে সঞ্চালকের ভূমিকায় ছিলেন। গেটস তখন ম্যাকিনটোশের প্রশংসা করে বলেন, এটি এমন একটি কম্পিউটার, যা মানুষের কল্পনাকে সত্যিই নাড়া দেবে। দর্শকেরা উচ্ছ্বসিত হন, জবসও খুশি হন। পরিবেশ ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই মধুর সময় বেশি দিন টেকেনি।
ম্যাকিনটোশ তৈরির সময় দুই প্রতিষ্ঠানের দল একসঙ্গে কাজ করেছিল। গেটস পরে দাবি করেন, ম্যাকিনটোশ প্রকল্পে মাইক্রোসফটের কর্মী ছিল অ্যাপলের চেয়েও বেশি। জবস গেটসকে অনুরোধ করেছিলেন ম্যাকিনটোশ বাজারে আসার পরে অন্তত এক বছর পর্যন্ত অন্য কারও জন্য গ্রাফিক্যাল ইন্টারফেস তৈরি না করতে। কিন্তু ম্যাকিনটোশের উন্মোচন দেরি হয়। ফলে ১৯৮৩ সালের নভেম্বরে মাইক্রোসফট ঘোষণা দেয়, তারা আইবিএমের সঙ্গে গ্রাফিক্যাল ইন্টারফেসভিত্তিক অপারেটিং সিস্টেম বানাবে, যা পরে উইন্ডোজ নামে পরিচিত হয়। এতে জবস ক্ষুব্ধ হন। তিনি অভিযোগ করেন, গেটস অ্যাপলের ধারণা চুরি করেছেন। জবাবে গেটস বলেন, এই ধারণা মূলত জেরক্সের গবেষণা থেকে এসেছে। এ নিয়ে তাঁর বিখ্যাত মন্তব্য হচ্ছে, ‘আমাদের দুজনেরই এক ধনী প্রতিবেশী ছিল—জেরক্স। আমি তার বাড়িতে টিভি চুরি করতে ঢুকে দেখি, তুমি আগেই নিয়ে গেছ।’
এরপর শুরু হয় তীব্র প্রতিযোগিতা। স্টিভ জবস বিল গেটসের রুচি ও স্টাইল নিয়ে ঠাট্টা করতেন। গেটস বলতেন, জবস বড় প্রযুক্তি নেতা হলেও নিজে ভালো কোডার নন। গেটস জবসের ব্যক্তিত্ব ও মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতাকে স্বীকার করতেন, কিন্তু তাঁকে অদ্ভুত ও ত্রুটিপূর্ণ মানুষও বলেছেন। অন্যদিকে জবস মনে করতেন, গেটস খুব সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির। তিনি একবার বলেছিলেন, গেটস তরুণ বয়সে যদি একটু আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা নিতেন, তবে আরও উদার মানসিকতার মানুষ হতেন। স্টিভ জবসের মনোযোগের কেন্দ্র ছিল নকশা, রুচি ও পণ্য; গেটস ছিলেন বাস্তববাদী ও কার্যকারিতাকেন্দ্রিক। গেটস সবকিছু উন্মুক্ত করে দেওয়ার পক্ষে ছিলেন। স্টিভ জবস সেটি মানতেন না।
সব দ্বন্দ্বের পরও শেষ পর্যন্ত একধরনের পারস্পরিক সম্মান তৈরি হয়েছিল। গেটস স্বীকার করেছিলেন, জবসের ‘কী কাজ করবে’, তা বোঝার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘স্টিভের রুচি যদি আমার থাকত, তার জন্য অনেক কিছু দিতাম।’
স্টিভ জবস যখন আবার অ্যাপলে ফিরে আসেন, তখন বিল গেটস সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। ১৯৯৭ সালের ম্যাকওয়ার্ল্ড এক্সপোতে সবাইকে অবাক করে দিয়ে স্টিভ জবস ঘোষণা দিয়েছিলেন যে মাইক্রোসফট অ্যাপলে ১৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। এটি অ্যাপলের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় ছিল। পর্দার আড়ালে গেটস ও জবসের ব্যক্তিগত সম্পর্কের বরফও এতে গলতে শুরু করে। আর এই চুক্তিটা হয়েছিল একদম শেষ মুহূর্তে।
গেটসও শেষ পর্যন্ত কোনো তিক্ততা রাখেননি। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েও একে অন্যকে এগিয়ে যেতে বাধ্য করেছি।’ জবসের ক্যানসারের খবর গেটসকে ব্যথিত করেছিল। জবসের জীবনের শেষ মাসগুলোতে গেটস তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন এবং তাঁরা কয়েক ঘণ্টা ধরে পুরোনো দিনের গল্প করেছিলেন।
তৃতীয় ও শেষ গল্প: মৃত্যু
স্টিভ জবস মারা যান ২০১১ সালের ৫ অক্টোবর, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার পালো আল্টোতে নিজের বাসায়। তাঁর মৃত্যুর কারণ ছিল অগ্ন্যাশয়ের একধরনের বিরল ক্যানসার। ২০০৩ সালে তাঁর ক্যানসার ধরা পড়েছিল। ২০০৪ সালে টিউমার অপসারণে অস্ত্রোপচার করা হয়। ২০০৯ সালে তাঁর লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট বা যকৃৎ প্রতিস্থাপন করা হয়। ক্যানসার লিভারে ছড়িয়ে পড়েছিল। এরপরও তিনি কিছু বছর কাজ চালিয়ে যান। ২০১১ সালের আগস্টে তিনি অ্যাপলের সিইও পদ ছাড়েন। শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। অক্টোবরেই তিনি মারা যান। সমাবর্তন বক্তৃতায় স্টিভ জবসের তৃতীয় গল্পটি ছিল এই মৃত্যু নিয়েই।
স্টিভ জবস বলেছিলেন, ‘যখন আমার বয়স ১৭, তখন আমি একটি উক্তি পড়েছিলাম। কথাটা ছিল এমন, তুমি যদি প্রতিটি দিন এমনভাবে বাঁচো, যেন আজই তোমার জীবনের শেষ দিন, তাহলে একদিন না একদিন সেটাই সত্যি হবে। কথাটা আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। তারপর ৩৩ বছর ধরে আমি প্রতিদিন সকালে আয়নায় তাকিয়ে নিজেকে একটি প্রশ্ন করেছি। যদি আজই আমার জীবনের শেষ দিন হয়, তাহলে আমি কি আজ যে কাজটা করতে যাচ্ছি, সেটা করতে চাইব? টানা অনেক দিন যদি উত্তর “না” হয়, তখন বুঝি কিছু একটা বদলানো দরকার।
আমি শিগগিরই মারা যাব—এই কথা মনে রাখা জীবনের বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায়। কারণ, মৃত্যুর কথা মনে পড়লে বাইরের প্রত্যাশা, অহংকার, লজ্জার ভয়, ব্যর্থতার ভয়—এসব গুরুত্ব হারায়। তখন শুধু সত্যিকার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোই সামনে থাকে।
প্রায় এক বছর আগে আমার ক্যানসার ধরা পড়ে। সকালে একটি স্ক্যান করার পর দেখা গেল, অগ্ন্যাশয়ে একটি টিউমার আছে। তখন আমি অগ্ন্যাশয় কী, সেটাও ঠিকমতো জানতাম না। চিকিৎসকেরা বললেন, এটি এমন ধরনের ক্যানসার, যা সাধারণত সারানো যায় না। তাঁরা ধারণা দিলেন, আমার হয়তো আর তিন থেকে ছয় মাস সময় আছে। একজন ডাক্তার বললেন বাড়ি গিয়ে সব গুছিয়ে নিতে। চিকিৎসকদের ভাষায়, এর মানে হলো মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হও। মানে, সন্তানদের যেসব কথা আগামী দশ বছরে বলবেন ভেবেছিলেন, সেগুলো কয়েক মাসের মধ্যে বলে দেওয়া। পরিবারের জন্য সবকিছু যতটা সম্ভব সহজ করে রেখে যাওয়া। বিদায় জানানো।
‘সারা দিন আমি এই বাস্তবতা নিয়েই ছিলাম। সেদিন সন্ধ্যায় আমার বায়োপসি করা হয়। একটি নল গলা দিয়ে পাকস্থলী হয়ে অন্ত্রে ঢোকানো হয়, সেখান থেকে সুচ দিয়ে টিউমার থেকে কোষ নেওয়া হয়। আমি তখন অচেতন ছিলাম। পরে আমার স্ত্রী জানান, মাইক্রোস্কোপে কোষগুলো দেখে ডাক্তার কেঁদে ফেলেছিলেন। কারণ, এটি অগ্ন্যাশয়ের খুবই বিরল একধরনের ক্যানসার। পরে আমার অস্ত্রোপচার হয় এবং সৌভাগ্যক্রমে আমি সুস্থ হয়ে উঠি।
‘মৃত্যুর এত কাছাকাছি আমি আর কখনো যাইনি। আশা করি, অনেক বছর আর যেতে হবে না। এই অভিজ্ঞতার পর মৃত্যু সম্পর্কে আমি আগের চেয়ে বেশি নিশ্চিতভাবে কথা বলতে পারি। কেউই মরতে চায় না। যারা স্বর্গে যেতে চায়, তারাও সেখানে যেতে মরতে চায় না। তবু মৃত্যু আমাদের সবার শেষ গন্তব্য। কেউ কখনো এটিকে এড়াতে পারেনি। আর সেটাই স্বাভাবিক। কারণ, মৃত্যু সম্ভবত জীবনের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার।
মৃত্যুই পরিবর্তনের পথ খুলে দেয়। পুরোনোকে সরিয়ে নতুনের জায়গা করে দেয়। এখন নতুন আপনারা। কিন্তু খুব বেশি দেরি নয়, একসময় আপনারাও পুরোনো হয়ে যাবেন, জায়গা ছাড়তে হবে। কথাটি একটু নাটকীয় শোনাতে পারে, কিন্তু সত্যি। আপনার সময় সীমিত। তাই অন্যের জীবন নকল করে নিজের সময় নষ্ট করবেন না। বাঁধাধরা বিশ্বাসের ফাঁদে পড়বেন না, যা অন্যের চিন্তার ফল। অন্যের মতামতের শব্দ যেন আপনার ভেতরের কণ্ঠকে ঢেকে না দেয়। সবচেয়ে জরুরি হলো, নিজের হৃদয় আর অনুভূতিকে অনুসরণ করার সাহস রাখা। এগুলোই জানে আপনি আসলে কী হতে চান। বাকি সবকিছু গৌণ।
‘আমি যখন তরুণ, তখন একটি অসাধারণ প্রকাশনা ছিল, নাম হোল আর্থ ক্যাটালগ। এটি আমাদের প্রজন্মের কাছে একধরনের পথনির্দেশিকা ছিল। স্টুয়ার্ট ব্র্যান্ড নামের একজন এটি তৈরি করেছিলেন। তখন ব্যক্তিগত কম্পিউটার বা আধুনিক ছাপার প্রযুক্তি ছিল না। টাইপরাইটার, কাঁচি আর পোলারয়েড ক্যামেরা দিয়ে এটি বানানো হতো। অনেকটা কাগজের বই আকারের গুগলের মতো ছিল, গুগল আসার বহু বছর আগে। এতে ছিল নানা দরকারি উপকরণ, নতুন ধারণা আর অনুপ্রেরণামূলক বিষয়।
‘কয়েকটি সংখ্যা প্রকাশের পর তারা একটি শেষ সংখ্যা বের করে। তখন সময়টা ছিল সত্তরের দশকের মাঝামাঝি। আমি তখন আপনাদের বয়সী। শেষ সংখ্যার পেছনের প্রচ্ছদে ছিল ভোরের একটি গ্রামের রাস্তার ছবি, যেন ভ্রমণে বের হলে এমন রাস্তায় হাঁটতে পারেন। ছবির নিচে লেখা ছিল, ক্ষুধার্ত থাকো, বোকা থাকো। এটিই ছিল তাদের বিদায়ী বার্তা।
‘আমি সব সময় নিজের জন্য এই কথাটাই চেয়েছি। আজ আপনারা নতুন পথে যাত্রা শুরু করছেন। আপনাদের জন্যও আমার একই কামনা। ক্ষুধার্ত থাকুন, বোকা থাকুন। সবাইকে ধন্যবাদ।’
আমার সংযোজন ৩: শেষ সময়
স্টিভ জবস মারা যাওয়ার পরে ২০১১ সালের ৩০ অক্টোবর নিউইয়র্ক টাইমস তাঁর বোন মোনা সিম্পসনের একটি লেখা ছেপেছিল। শিরোনাম ছিল, ‘স্টিভ জবসকে এক বোনের শ্রদ্ধাঞ্জলি’। সেখানে মোনা স্টিভের একদম শেষ সময়ের কথা লিখেছিলেন। এই লেখাটি শেষ করছি সেই অংশটি দিয়েই।
মোনা সিম্পসন লিখেছেন:
‘মঙ্গলবার সকালে সে আমাকে ফোন করে বলল তাড়াতাড়ি যেতে। তার কণ্ঠ ছিল স্নেহভরা, কোমল, ভালোবাসায় পূর্ণ। কিন্তু এমন এক মানুষের মতো শোনাচ্ছিল, যার যাত্রার সব প্রস্তুতি শেষ, যে পথ ধরতে তৈরি, যদিও আমাদের ছেড়ে যেতে তার গভীর কষ্ট হচ্ছিল।
‘সে বিদায়ের কথা বলা শুরু করতেই আমি থামালাম। বললাম, একটু অপেক্ষা করো। আমি আসছি। এয়ারপোর্টের পথে ট্যাক্সিতে আছি। পৌঁছে যাব।
‘সে বলল, এখনই বলছি, কারণ ভয় হচ্ছে তুমি হয়তো সময়মতো পৌঁছাতে পারবে না, হানি।
‘আমি পৌঁছে দেখি, সে আর লরিন একসঙ্গে হাসি–মজা করছে, যেন সারা জীবন পাশাপাশি থাকা দুই সঙ্গী। সে তার সন্তানদের চোখের দিকে এমনভাবে তাকিয়ে ছিল, যেন দৃষ্টি সরাতে পারছে না।
‘বেলা প্রায় দুইটা পর্যন্ত তার স্ত্রী তাকে জাগিয়ে রাখতে পারছিল, যেন সে অ্যাপলের বন্ধুদের সঙ্গে কিছু কথা বলতে পারে। তারপর একসময় পরিষ্কার হয়ে গেল, সে আর আমাদের ডাকে জাগবে না।
‘তার শ্বাসের ধরন বদলে গেল। শ্বাস হয়ে উঠল ভারী, ধীর, সচেতন। মনে হচ্ছিল, সে যেন প্রতিটি শ্বাস গুনে গুনে নিচ্ছে, আগের চেয়ে আরও দূরে যাওয়ার চেষ্টা করছে। আমি তখন একটি জিনিস বুঝলাম। সে এটাও পরিশ্রম করে করছে। মৃত্যুর কাছে সে হার মানেনি, যেন এটাকেও নিজের চেষ্টায় অর্জন করছে।
‘বিদায় বলার সময় দুঃখ প্রকাশ করে সে আমাকে বলেছিল, আমরা যেমন ভেবেছিলাম একসঙ্গে বুড়ো হতে পারব না বলে সে কষ্ট পাচ্ছে। কিন্তু সে যাচ্ছে আরও ভালো এক জায়গায়।
‘ডা. ফিশার বলেছিলেন, রাতটা পার করার সম্ভাবনা অর্ধেক অর্ধেক। সে রাত পার করেছিল। লরিন তার পাশে শুয়ে ছিল। মাঝে মাঝে তার শ্বাসের বিরতি একটু দীর্ঘ হলেই লরিন হঠাৎ উঠে বসত। আমরা দুজন একে অন্যের দিকে তাকাতাম। তারপর সে আবার গভীর শ্বাস নিয়ে শুরু করত।
‘এটা যেন শেষ পর্যন্ত সম্পন্ন করারই একটি কাজ। তখনো তার মুখের গড়ন ছিল দৃঢ়, শান্ত, আকর্ষণীয়। যেন এক আদর্শবাদী, এক রোমান্টিক মানুষের মুখ। তার শ্বাসে বোঝা যাচ্ছিল, সে যেন কঠিন এক উঁচু পথে উঠছে। মনে হচ্ছিল, সে আরও ওপরে উঠছে। কিন্তু তার সেই শক্ত ইচ্ছা, কঠোর পরিশ্রম আর দৃঢ়তার পাশাপাশি ছিল বিস্ময়ে ভরা কোমল মন, শিল্পীর মতো আদর্শে বিশ্বাস, সামনে আরও সুন্দর কিছু আছে, এই আশা।
‘মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে তার শেষ কথাগুলো ছিল ছোট ছোট শব্দ, তিনবার বলা। শেষযাত্রার আগে সে প্রথমে বোন প্যাটির দিকে তাকাল, তারপর অনেকক্ষণ ধরে সন্তানদের দিকে, তারপর জীবনের সঙ্গী লরিনের দিকে, এরপর তাদের কাঁধের ওপর দিয়ে আরও দূরে কোথাও।
‘স্টিভের শেষ কথা ছিল—
ওহ ওয়াও
ওহ ওয়াও
ওহ ওয়াও।’
সূত্র
স্টিভ জবসের অনুরোধে বিশিষ্ট সাংবাদিক ওয়াল্টার আইজাকসনের লেখা জীবনীগ্রন্থ স্টিভ জবস প্রকাশিত হয়েছিল তিনি মারা যাওয়ার ১৯ দিন পরে, ২০১১ সালের ২৪ অক্টোবর। এই লেখার অধিকাংশ তথ্য সেখান থেকে নেওয়া। আরও তথ্য নেওয়া হয়েছে ইউটিউবে স্টিভ জবসের বক্তৃতা, নিউইয়র্ক টাইমস-এ মোনা সিম্পসনের স্মৃতিকথা, বিজনেস ইনসাইডারসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত লেখা থেকে।