
যুক্তরাজ্যের সাম্প্রতিক স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির বড় ধরনের ধাক্কা যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মাত্র দুই বছর আগে ভূমিধস বিজয়ের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা দলটি এখন স্থানীয় পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য আসন হারিয়ে চাপের মুখে পড়েছে।
একই সঙ্গে ডানপন্থী রাজনীতিক নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন রিফর্ম ইউকের উত্থান এবং গ্রিন পার্টির শক্তিশালী অবস্থান যুক্তরাজ্যের রাজনীতির দীর্ঘদিনের দ্বিদলীয় সংস্কৃতিকে নতুন বাস্তবতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ইংল্যান্ডজুড়ে ১৩৬টি স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্বাচনে লেবার পার্টির বিপুল পরাজয় হয়েছে। লন্ডনসহ বেশির ভাগ কাউন্সিলে তারা আসন হারিয়েছে। বিশেষ করে উত্তর ইংল্যান্ড ও মিডল্যান্ডসের শ্রমজীবী ভোটার অধ্যুষিত এলাকাগুলোয় তাদের ফল বেশ খারাপ হয়েছে।
অন্যদিকে রিফর্ম ইউকে কয়েকটি এলাকায় ঐতিহাসিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অভিবাসন, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়–রাজনীতিকে কেন্দ্র করে ডানপন্থীদের প্রতি সমর্থন এখন দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।
২০২২ সালের স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টি প্রায় ২ হাজার ২০০–এর বেশি কাউন্সিল আসন জিতেছিল। ২০২৪ সালে দলটি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠে এবং বহু কাউন্সিলে রক্ষণশীলদের কাছ থেকে নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নেয়। কিন্তু সাম্প্রতিক নির্বাচনে সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে গেছে। বিভিন্ন কাউন্সিলে লেবার আসন হারিয়েছে, যেখানে রিফর্ম ইউকে ও গ্রিন পার্টি ভোট কেটে নিয়েছে।
একই সঙ্গে কনজারভেটিভ পার্টিও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। বহুদিন ধরে যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে প্রচলিত ‘লেবার বনাম কনজারভেটিভ’ দ্বিদলীয় প্রতিযোগিতা এখন ভাঙনের মুখে, এমন মূল্যায়ন করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান ফল প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বের ওপর সরাসরি চাপ তৈরি করেছে। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পর তাঁর নেতৃত্বকে স্থিতিশীল মনে করা হলেও মাত্র দুই বছরের মাথায় এই ধাক্কা লেবার পার্টির অভ্যন্তরে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে। ভেতরে ভেতরে অসন্তোষ বাড়ছে বলে যুক্তরাজ্যের গণমাধ্যমে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। কেউ কেউ প্রকাশ্যে মুখও খুলছেন। ইতিমধ্যে দলটির এমপি ওয়েস্ট ক্যাথরিন প্রধানমন্ত্রী স্টারমারকে নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দিতে মন্ত্রিসভার সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
কনজারভেটিভ পার্টির ছায়া আবাসনবিষয়ক মন্ত্রী স্যার জেমস ক্লেভারলি বলেন, ‘স্থানীয় নির্বাচনে রিফর্ম ইউকের উত্থান হলেও কনজারভেটিভ পার্টিই এখনো যুক্তরাজ্যের রাজনীতির সবচেয়ে বড় ডানপন্থী রাজনৈতিক দল। রিফর্ম কোনো মধ্য-ডানপন্থী রাজনৈতিক দল নয়, এটি মূলত ব্যক্তিকেন্দ্রিক একটি গোষ্ঠী। নাইজেল ফারাজ নিজে কোনো নীতি নন। শুধু বিভিন্ন বিষয়ে রাগ প্রকাশ করাই রাজনৈতিক নীতি হতে পারে না।’
স্টারমারের সমালোচকেরা বলছেন, তিনি একদিকে বামপন্থী ঐতিহ্যবাহী লেবার ভোটারদের পুরোপুরি ধরে রাখতে পারেননি। অন্যদিকে মধ্যপন্থী ভোটারদের মধ্যেও প্রত্যাশিত আস্থা তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধ, অভিবাসননীতি, করনীতি ও জনসেবা খাতের সংকট নিয়ে তাঁর অবস্থান দলের ভেতরে–বাইরে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
অন্যদিকে নাইজেল ফারাজের ডানপন্থার উত্থান যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ব্রেক্সিট আন্দোলনের অন্যতম মুখ এই রাজনীতিক এখন অভিবাসনবিরোধী, জাতীয়তাবাদী ও অ্যান্টি স্টাবলিশমেন্ট রাজনীতিকে সামনে এনে নতুন ভোটব্যাংক তৈরি করছেন। বিশ্লেষকদের মতে, কনজারভেটিভ দলের ডানপন্থী ভোটের একটি বড় অংশ এখন রিফর্ম ইউকের দিকে সরে যাচ্ছে।
একই সঙ্গে গ্রিন পার্টির উত্থানও গুরুত্বপূর্ণ। তরুণ ভোটার, পরিবেশবাদী ও প্রগতিশীল মধ্যবিত্তদের মধ্যে দলটির জনপ্রিয়তা বাড়ছে। ফলে লেবার পার্টি এখন দুই দিক থেকে চাপের মুখে। ডানদিকে রিফর্ম ইউকে, আর বামদিকে গ্রিন পার্টি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন যুক্তরাজ্যের বহুজাতিক ও বহুসাংস্কৃতিক রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান অভিবাসন ও সংখ্যালঘু ইস্যুকে আরও তীব্রভাবে সামনে নিয়ে আসতে পারে। বিশেষ করে মুসলিম, দক্ষিণ এশীয় ও অভিবাসী কমিউনিটিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মেরুকরণ বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা করছেন অনেকে।
তবে অন্য একটি অংশ মনে করে, যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক ব্যবস্থা এখন বহুদলীয় বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে। এখন আর কেবল লেবার ও কনজারভেটিভ নয়, বরং আঞ্চলিক দল, গ্রিন এবং রিফর্ম ইউকের মতো শক্তিগুলোও ভবিষ্যৎ ক্ষমতার সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই নির্বাচন হয়তো সরাসরি সরকার পরিবর্তন করবে না। তবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। কারণ, মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ক্ষমতাসীন দলের প্রতি ভোটারদের হতাশা দৃশ্যমান হওয়া ব্রিটিশ রাজনীতিতে অস্বাভাবিক ঘটনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।