
দক্ষিণ আমেরিকার একধরনের বিশেষ প্রজাতির ব্যাঙের বিষ প্রয়োগ করে রাশিয়ার বিরোধীদলীয় নেতা অ্যালেক্সি নাভালনিকে হত্যা করা হয়েছিল বলে দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও দেশটির ইউরোপীয় মিত্ররা।
নাভালনি ছিলেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের একজন কট্টর সমালোচক। ২০২৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি সাইবেরিয়ার একটি কারাগারে নির্জন প্রকোষ্ঠে তিনি মারা যান। সে সময় তাঁর বয়স ছিল ৪৭ বছর।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, নাভালনির মরদেহে এপিবাটিডিন নামক বিষের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই বিষেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
ইউরোপীয় দেশগুলো বলছে, নাভালনির শরীরে এই প্রাণঘাতী বিষ প্রয়োগের সামর্থ্য ও সুযোগ শুধু রাশিয়ারই ছিল। তবে ক্রেমলিন এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নাভালনিকে বিষ প্রয়োগে হত্যার পশ্চিমা এই দাবিকে ‘ভিত্তিহীন’ ও ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে আখ্যায়িত করেছে মস্কো।
টক্সিকোলজি বিশেষজ্ঞ জিল জনসনের মতে, এপিবাটিডিন হলো একটি প্রাকৃতিক স্নায়ুবিষ (নিউরোটক্সিন)। ইকুয়েডরের বিশেষ প্রজাতির একটি ব্যাঙের শরীর থেকে এই বিষ সংগ্রহ করা হয়। বিবিসিকে তিনি বলেন, এই বিষ মরফিনের চেয়েও ‘২০০ গুণ বেশি শক্তিশালী’। এটি ল্যাবরেটরিতেও তৈরি করা সম্ভব।
ইউরোপীয় মিত্রদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, খাঁচায় বন্দী বা পালিত ব্যাঙ এই বিষ তৈরি করে না। রাশিয়ার প্রকৃতিতেও এটি পাওয়া যায় না।
‘অ্যান্থনিজ পয়জন অ্যারো ফ্রগ’ এবং ‘ফ্যান্টাসমাল পয়জন ফ্রগ’ প্রজাতির ব্যাঙ তাদের চামড়া দিয়ে এই বিষ নিঃসরণ করে। এপিবাটিডিন ব্যথানাশক হিসেবে ও ফুসফুসের প্রদাহজনিত তীব্র ব্যথার উপশমে ব্যবহারযোগ্য কি না, তা নিয়ে আগে গবেষণা হয়েছিল। কিন্তু এটি এতই বিষাক্ত যে চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যবহার করার জন্য একে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়।
জিল জনসনের মতে, এই বিষ সরাসরি মানুষের স্নায়ুতন্ত্রের ওপর আঘাত হানে। এটি স্নায়ুর সংকেত আদান-প্রদানের পথগুলোকে অস্বাভাবিকভাবে উত্তেজিত করে দেয়। এটি পেশির খিঁচুনি, পক্ষাঘাত, হৃৎস্পন্দন কমে যাওয়া এবং শ্বাসকষ্টের মাধ্যমে মৃত্যু ঘটাতে পারে।
ইউনিভার্সিটি অব লিডসের এনভায়রনমেন্টাল টক্সিকোলজির অধ্যাপক অ্যালাস্টেয়ার হে বলেছেন, এর প্রভাবে শ্বাসকষ্ট শুরু হয় এবং বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি মূলত ‘দম বন্ধ হয়ে মারা যান’।
অ্যালাস্টেয়ার আরও বলেন, কারও রক্তে এই বিষ পাওয়ার মানে হলো, এটি ‘উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রয়োগ’ করা হয়েছে। কিছু ওষুধের সঙ্গে মিশিয়ে এপিবাটিডিনের বিষাক্ততা আরও বাড়িয়ে তোলা সম্ভব।
জনসন জানান, এপিবাটিডিন অত্যন্ত বিরল। এটি শুধু একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলে খুব সামান্য পরিমাণে পাওয়া যায়। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তর যে ব্যাঙটির কথা উল্লেখ করেছে, সেটি হলো ‘অ্যান্থনিজ পয়জন অ্যারো ফ্রগ’, যা মূলত ইকুয়েডর ও পেরুর স্থানীয় প্রজাতি।
এই ব্যাঙগুলো নির্দিষ্ট কিছু খাবার খেয়ে তাদের শরীরে অ্যালকালয়েড নামক জৈব যৌগ তৈরি করে, যা পরে এপিবাটিডিনে রূপান্তরিত হয়ে চামড়ায় জমা হয়। যদি ব্যাঙের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন হয়, তবে তাদের শরীরে এই বিষও ফুরিয়ে যায়।
জনসন বলেন, ‘সঠিক জায়গায় এই বন্য ব্যাঙ খুঁজে পাওয়া এবং সেগুলোকে ঠিক সেই খাবার খাওয়ানো যা বিষ তৈরিতে সাহায্য করে—এটি প্রায় অসম্ভব। মানুষের শরীরে এই বিষক্রিয়া ঘটা অত্যন্ত বিরল ঘটনা। এর আগে এপিবাটিডিন বিষক্রিয়ার যে ঘটনাগুলো আমি জানি, তা ছিল ল্যাবরেটরি–ভিত্তিক এবং সেগুলো প্রাণঘাতী ছিল না।’
ইউরোপীয় ল্যাবরেটরিগুলো নিশ্চিত করেছে, নাভালনি এই রহস্যময় বিষেই মারা গেছেন। তবে মস্কো আগে দাবি করেছিল, নাভালনির স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। যদিও নাভালনির বিধবা স্ত্রী ইউলিয়া নাভালনায়া শুরু থেকেই দাবি করে আসছেন, তাঁর স্বামীকে বিষ খাইয়ে ‘হত্যা’ করা হয়েছে।
লন্ডনে অবস্থিত রুশ দূতাবাস এই হত্যাকাণ্ডে মস্কোর সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছে এবং এই ঘোষণাকে পশ্চিমা বিশ্বের ‘কল্পকাহিনি’ ও লাশ নিয়ে রাজনীতি হিসেবে বর্ণনা করেছে।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা বলেছেন, ‘এসব কথাবার্তা এবং বিবৃতি কেবল পশ্চিমা বিশ্বের বর্তমান সমস্যাগুলো থেকে নজর সরানোর জন্য একটি অপপ্রচার মাত্র।’