
প্রতিদিন সূর্য ওঠার আগে থেকে তাঁদের সারি বেঁধে দাঁড়ানো শুরু হতো। সারিগুলো নারীদের—কেবলই নারীদের। ফ্রান্সের অ্যাভিনিও শহরে কাচ-কংক্রিটে গড়া আদালত ভবনের বাইরে ব্যস্ত রিং রোডের ধারে একটি ফুটপাতে শরতের হিম উপেক্ষা করে তাঁরা দাঁড়িয়ে থাকতেন।
দিনের পর দিন তাঁরা আসতেন। কেউ কেউ হাতে ফুল নিয়ে আসতেন। জিসেল পেলিকো যখন লক্ষ্যে স্থির পায়ে সিঁড়ি ভেঙে উঠে কাচের দরজা পেরিয়ে আদালতে ঢুকতেন, সেই মুহূর্তে তাঁকে সমর্থন জানানোর জন্য তাঁরা হাজির থাকতে চাইতেন। কেউ কেউ তাঁর কাছে পৌঁছে যেতেন।
কেউ উচ্চ স্বরে বলে উঠতেন, ‘আমরা তোমার পাশে আছি গিস লে জিসেল।। তাঁরা বলতেন, ‘বুকে সাহস রাখো।’
তারপর তাঁদের বেশির ভাগই রয়ে যেতেন কানায় কানায় ভরা/জনসংকীর্ণ/ভরপুর আদালতে ঠাঁই না-পাওয়া মানুষদের জন্য রাখা ঘরটিতে আসন পাওয়ার আশায়। সেখানে টিভির পর্দায় মামলার বিচারকাজ দেখার সুযোগ ছিল।
এই নারীরা সমবেত হতেন এক বৃদ্ধার সাহসিকতার সাক্ষী হতে, যিনি—জিসেল—তাঁকে ধর্ষণকারী ডজন ডজন পুরুষের মধ্যে আদালতে চুপচাপ বসে থাকতেন।
এদিকে এএফপির একটি প্রতিবেদন জানাচ্ছে, স্বামীর সঙ্গে অ্যাভিনিও শহরের মাজান এলাকায় থাকতেন পেলিকো। কড়া ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে অন্য পুরুষকে দিয়ে তাঁকে ধর্ষণ করাতেন তাঁরই স্বামী ডোমেনিক পেলিকো। আর এই ঘটনার সূত্রপাত ২০১১ সালে। পেলিকোর বয়স এখন ৭২ বছর।
এএফপির খবরটি বলছে, গত ১৯ ডিসেম্বর ফ্রান্সের আদালতে পেলিকো ধর্ষণ মামলার রায় হয়েছে। এতে তাঁর স্বামীকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। পাশাপাশি আরও ৫০ জনকেও ৩ থেকে ১৫ বছর মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
ওদিকে বিচার চলাকালে বিবিসি অ্যাভিনিও আদালতে সমবেত নারীদের সঙ্গে কথা বলেছিল। ৫৪ বছর বয়সী ইসাবেল মুনিয়ের তাঁদেরই একজন। তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘আমি তাঁর (পেলিকো) মধ্যে নিজেকে দেখতে পাই। বিচারের মুখোমুখি হওয়া পুরুষদের মধ্যে আমার এক বন্ধুও ছিল। জঘন্য ব্যাপার।’
সাজিয়া জিমলি নামের ২০ বছর বয়সী এক নারী বলেন, ‘তিনি নারীবাদের জন্য আদর্শ হয়ে উঠেছেন।’
তবে আদালত প্রাঙ্গণে নারীরা শুধুই বিচারকাজ দেখতে যেতেন, তা নয়। এর পেছনে আরও কিছু কারণও ছিল। সর্বোপরি তাঁরা কিছু উত্তর খুঁজছিলেন।
ফ্রান্সের ইতিহাসে ধর্ষণের সবচেয়ে বড় বিচারকাজ এটি। বিচার চলাকালে অ্যাভিনিওর আদালত প্রাঙ্গণের নারীসহ ফ্রান্সের অনেক নারীর মাথায় এখন দুটি মৌলিক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
প্রথম প্রশ্নটি একেবারে নাড়ির প্রশ্ন—ফ্রান্সের ছোট এক গ্রাম্য এলাকায় ৫০ জন পুরুষ যে অপরিচিত কারও শোবার ঘরে অচেনা একজন অচেতন নারীর সঙ্গে যৌনকাজ করার উটকো আমন্ত্রণে স্পষ্টতই রাজি হয়ে গেলেন, এটা ফরাসি পুরুষদের সম্পর্কে কী ধারণা দেয়? ফরাসি পুরুষ, অথবা কেউ বলতে পারেন সব পুরুষ সম্পর্কেই এ প্রশ্ন জায়েজ।
প্রথম প্রশ্নটি দ্বিতীয় প্রশ্নের জন্ম দেয়—যৌন সহিংসতা এবং মাদক প্রয়োগ করে ধর্ষণের মহামারী ঠেকাতে এই বিচার কতটা সহায়ক হবে? কতটা সহায়ক হবে, লজ্জা আর সম্মতি বিষয়ে মনের গভীরে গেঁড়ে থাকা অপসংস্কার আর অজ্ঞতা দূর করতে?
সহজ কথায়, জিসেল পেলিকোর সাহসী ভূমিকা এবং দৃঢ় সংকল্প কি কোনোকিছু বদলাতে পারবে? পেলিকো যেমনটা বলেছেন, তিনি চান ‘লজ্জার পালাবদল’ ঘটাতে—লজ্জা যেন ভুক্তভোগীকে নয়, ধর্ষণকারীকেই গ্রাস করে।
যেকোনো দীর্ঘ বিচার তার নিজস্ব পরিবেশ তৈরি করে। গত কয়েক সপ্তাহে অ্যাভিনিওর বিচারালয়ে এক অদ্ভুত ধরনের স্বাভাবিকত্ব তৈরি হয়েছে। কয়েক ডজন অভিযুক্ত ধর্ষকের মুখোশখোলা উপস্থিতি গোড়াতে যে তীব্র প্রতিক্রিয়া জাগাত, টেলিভিশন ক্যামেরা আর আইনজীবীদের জটলার আবহে তা ক্রমে হারিয়ে গেছে।
অভিযুক্তরা আদালত এলাকায় ঘুরে বেড়িয়েছেন, গল্পগুজব আর ঠাট্টামশকরা করেছেন, মেশিন থেকে মগে কফি ভরে নিয়েছেন অথবা রাস্তার ওপারের কাফে থেকে এক চক্কর ঘুরে এসেছেন। আর এসবের মধ্য দিয়ে তাঁরা যেন আসামিপক্ষের আত্মসমর্থন কৌশলের মূল যুক্তিকে একরকম জোরদার করেছেন—যে তাঁরা গড়পড়তা সাধারণ মানুষ, ফরাসি সমাজেরই অংশ, যাঁরা অনলাইনে অবাধ যৌন উত্তেজনা খুঁজতে গিয়ে অপ্রত্যাশিত ঝামেলায় ফেঁসে গেছেন।
ফরাসি নারীবাদী অধিকারকর্মীদের সংগঠন ডেয়ার টু বি ফেমিনিস্টের জন্য কাজ করা এলসা ল্যাবোরেট বলেন, ‘(এই যুক্তিটি) এ মামলার সবচেয়ে মর্মান্তিক দিক। এটা কল্পনা করতেও কষ্ট হয়।’
ফ্রান্সের ইনস্টিটিউট অব পাবলিক পলিসিজ চলতি বছর একটি পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। এতে দেখা গেছে, ২০১২ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত গড়ে যৌন নিপীড়নের ৮৬ শতাংশ অভিযোগ এবং ধর্ষণের ৯৪ শতাংশ অভিযোগের বিচার হয়নি কিংবা এগুলো বিচারের আওতায় আসেনি।
এলসা ল্যাবোরেট আরও বলেন, ‘আমার ধারণা, বেশির ভাগ মানুষ পুরুষের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের ক্ষেত্রে সঙ্গীকে বিশ্বাসযোগ্য বলে ভাবেন। কিন্তু এখন অনেক নারীই এর (জিসেলের) সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে দেখছেন। অনেকটা যেন, ‘তা হলে আমার সঙ্গেও এমন ঘটতে পারে।’
এলসা ল্যাবোরেট বলেন, ‘অভিযুক্তরা পাঁড় অপরাধী নন। তাঁরা শুধু ইন্টারনেটে ঢুকেছিলেন…তার মানে, হয়তো এ ধরনের ঘটনা সবখানেই ঘটছে।’
ফ্রান্সের ইনস্টিটিউট অব পাবলিক পলিসিজ চলতি বছর একটি পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। এতে দেখা গেছে, ২০১২ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত গড়ে যৌন নিপীড়নের ৮৬ শতাংশ অভিযোগ এবং ধর্ষণের ৯৪ শতাংশ অভিযোগের বিচার হয়নি কিংবা এগুলো বিচারের আওতায় আসেনি।
এলসা ল্যাবোরেট বলেন, ‘যৌন সহিংসতা তখনই ঘটে, যখন কিছু পুরুষ বুঝতে পারেন যে এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে তাঁরা সহজেই পার পেয়ে যাবেন। ফ্রান্সে এসব ঘটনা এত বেশি ঘটার পেছনে এটি একটি বড় কারণ বলে আমি মনে করি।’
আদালত নিযুক্ত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ লরেন্ট লেয়েট সাক্ষ্য দিয়েছেন যে অভিযুক্তরা দানবও নন, আবার সাধারণ পুরুষও নন। বিচার চলাকালে তাঁদের কেউ কেউ কেঁদেছেন। কয়েকজন নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেছেন। কিন্তু বেশির ভাগই নানা রকম অজুহাত দেখিয়েছেন।
অনেকে আবার বলেছেন, তাঁরা কেবল খেয়ালখুশিমতো চলার স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন, ফরাসিরা যাকে বলে লিবার্টিন। তাঁরা শুধু একটি দম্পতির খেয়ালি কল্পনাকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। পেলিকো যৌন সম্পর্ক করার জন্য সম্মতি দিয়েছেন কি না, তা জানারও কোনো উপায় ছিল না তাঁদের। অন্যদের দাবি, জিসেল পেলিকোর স্বামী ডমিনিক পেলিকো তাঁদের ভয় দেখিয়েছিলেন।
পেলিকো ধর্ষণ মামলায় বিচারের আওতায় আনা ৫১ জন পুরুষের মধ্যে কোনো সুস্পষ্ট বৈশিষ্ট্যের ধারা বা মিল নেই বললেই চলে। তাঁরা সমাজের নানা অংশ থেকে এসেছেন। তিন-চতুর্থাংশের সন্তান আছে। অর্ধেক বিবাহিত বা প্রেমের সম্পর্কে আছেন। আর মাত্র এক–চতুর্থাংশ বলেছেন যে তাঁরা শিশু বয়সে নির্যাতন বা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।
বয়স, চাকরি বা সামাজিক শ্রেণির ভিত্তিতে তাঁদের ভাগে ফেলা কঠিন। তাঁদের মধ্যে শুধু দুটি বিষয়ে মিল ছিল। এগুলো হলো—তাঁরা পুরুষ এবং তাঁরা কোকো নামের একটি অবৈধ অনলাইন চ্যাট-গোষ্ঠীতে যুক্ত ছিলেন। এই গোষ্ঠীটি অবাধ যৌনাচারীদের চাহিদা মেটায়। পাশাপাশি তারা শিশুকামী ব্যক্তি ও মাদক ব্যবসায়ীদেরও আকৃষ্ট করায় তৎপর। ফরাসি কৌঁসুলিদের মতে, এই সাইটটি চলতি বছরের শুরুতে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ২৩ হাজারের বেশি অপরাধ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে এই সাইটের উল্লেখ আছে।
এই মামলাটিকে সবচেয়ে নিবিড়ভাবে অনুসরণ করেছেন জুলিয়েট ক্যাম্পিয়ন। তিনি একজন ফরাসি সাংবাদিক। পাবলিক ব্রডকাস্টার ফ্রান্স ইনফো-এর পক্ষ থেকে পুরো বিচার কাজ চলার সময় আদালতে ছিলেন তিনি। জুলিয়েট বলেন, ‘আমি মনে করি, ঘটনাটি অবশ্যই অন্য কোনো দেশেও ঘটতে পারত। কিন্তু ফ্রান্সে পুরুষেরা নারীদের কোন চোখে দেখেন, সে ব্যাপারে এ ঘটনা অনেক কথা বলছে…সম্মতির ধারণা সম্পর্কে।’ তিনি আরও বলেন, ‘অনেক পুরুষ জানেনই না সম্মতি আসলে কী। তাই দুঃখজনকভাবে এ মামলা আমাদের দেশ সম্পর্কে অনেক কিছুর ইঙ্গিত দেয়।
পেলিকো মামলা ফ্রান্সজুড়ে ধর্ষণ সম্পর্ক প্রচলিত মনোভাবের রূপরেখা অবশ্যই বদলে দিয়েছে।
গত ২১ সেপ্টেম্বর দেশটির অভিনেতা, গায়ক, সংগীতজ্ঞ এবং সাংবাদিকসহ বিশিষ্ট ফরাসি পুরুষদের একটি দল, লিবারেশন পত্রিকায় একটি খোলা চিঠি লিখেছিলেন। সেখানে তাঁরা বলেছিলেন, পেলিকো মামলা প্রমাণ করেছে যে পুরুষালি সহিংসতার দানবীয় কোনো বিষয় নয়। অর্থাৎ যেকোনো পুরুষের পক্ষেই এমন ঘটনা ঘটানো সম্ভব।
যৌন নিপীড়নের মামলায় বিশেষজ্ঞ প্যারিসভিত্তিক আইনজীবী ক্যারেন নোবলিনস্কি বলেন, ‘এই পুরো মামলাটি প্রত্যেকের জন্য, সব প্রজন্মের জন্য, অল্প বয়স্ক ছেলেদের জন্য, অল্প বয়স্ক মেয়েদের জন্য এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য খুবই দরকারি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটি তরুণদের মধ্যে সচেতনতা বাড়িয়েছে। ধর্ষণ সব সময় পানশালায় বা ক্লাবে হয় না। এটা আমাদের বাড়িতেও হতে পারে।’
পেলিকোতের নিজের গ্রাম মাজানের মেয়র লুই বোনেট ধর্ষণের ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি স্পষ্টভাবে এবং দুইবার বলেছেন, জিসেল পেলিকোর ঘটনা নিয়ে মাত্রাছাড়া বাড়াবাড়ি করা হয়েছে। তাঁর দাবি, ধর্ষণের সময় পেলিকো অচেতন ছিলেন। ফলে ধর্ষণের শিকার অন্য যেকোনো নারীর তুলনায় তিনি অপেক্ষাকৃত কম যন্ত্রণা পেয়েছেন।
লুই ওই সময় বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, আমি বিষয়টিকে ছোট করেই দেখছি। কারণ, পরিস্থিতি আরও বাজে হতে পারত। যখন কোনো শিশু ভুক্তভোগী হয় বা কোনো নারীকে হত্যা করা হয়, তখন বিষয়টি অনেক বেশি গুরুতর হয়ে পড়ে। কারণ, এ পরিস্থিতি থেকে আর পেছনে ফেরা যায় না। তবে এ ক্ষেত্রে (পেলিকোর ঘটনা) পরিবারটিকে আবার নিজেকে গড়ে তুলতে হবে। সে কাজ কঠিন হবে তবে এতে কেউ মারা যায়নি। তারা এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।
লুইয়ের এই মন্তব্য ফ্রান্সজুড়ে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল। অবশ্য পরবর্তী সময়ে এক বিবৃতি দিয়ে এ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চান মেয়র।
পেলিকোর ঘটনা সামনে আসার পর অনলাইনে বিষয়টি নিয়ে অনেক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। একটি বিতর্কিত ধারণা অনেক বেশি আলোচনায় আসে। আর তা হলো—‘সব পুরুষই ধর্ষণ করতে পারে। এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। কিছু কিছু পুরুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘নটঅলমেন হ্যাশট্যাগ’ দিয়ে এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন।