রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন

ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে পুতিন আসলে কী চান

চার বছর পেরিয়ে পঞ্চম বছরে পা রাখছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে পূর্ণ মাত্রার রুশ আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে এই সংঘাতের সূচনা হয়েছিল। এখন এই যুদ্ধ ১ হাজার ৪৬১ দিন পূর্ণ করল।

শুরুতে রাশিয়া খুব সহজে কিয়েভ দখলের আশা করেছিল; কিন্তু মস্কোর সেই হিসাবে যে মস্ত বড় ভুল ছিল, তা পরে প্রমাণিত হয়।

মস্কোর দ্রুত কিয়েভ–জয়ের স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়; বরং যুদ্ধ রূপ নেয় দীর্ঘ, ব্যাপক প্রাণঘাতীসহ ক্ষয়ক্ষতিপূর্ণ ও অনিশ্চিত এক সংঘাতে।

এই যুদ্ধের শেষ কোথায়, তা এখনো কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপ এমন বড় যুদ্ধ আর দেখেনি। একই সঙ্গে এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে রাশিয়ার সবচেয়ে প্রাণঘাতী যুদ্ধ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

হতাহতের ভয়াবহ চিত্র

যুদ্ধে সামরিক জনবল হতাহতের মোট সংখ্যা প্রায় ২০ লাখে পৌঁছেছে বলে অনুমান করা হচ্ছে

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে হতাহতের বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয়ে এমন পরিসংখ্যান দিচ্ছে, যেখানে শত্রুপক্ষের ক্ষয়ক্ষতি বাড়িয়ে দেখানো হচ্ছে। অন্যদিকে তারা নিজেদের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে উপস্থাপন করছে। তবু এই পরস্পরবিরোধী পরিসংখ্যানেও ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে।

এই যুদ্ধে সামরিক জনবল হতাহতের মোট সংখ্যা প্রায় ২০ লাখে পৌঁছেছে বলে অনুমান করা হচ্ছে।

ইউক্রেনের জেনারেল স্টাফের হিসাবে, শুধু গত বছরই প্রায় ৪ লাখ ১৮ হাজার রুশ সেনা নিহত বা আহত হয়েছেন। আর এই যুদ্ধে রাশিয়ার সেনা হতাহতের মোট সংখ্যা ১২ লাখ ৫০ হাজারের কিছু বেশি।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) গত মাসে বলেছে, ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত রুশ পক্ষের প্রায় ১২ লাখ সেনা হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে অন্তত ৩ লাখ ২৫ হাজার নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া ইউক্রেনের হিসাব মতে, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আরও ৩১ হাজার ৬৮০ জন রুশ সেনা হতাহত হয়েছেন।

সিএসআইএসের প্রতিবেদন বলছে, এই সংখ্যা অকল্পনীয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কোনো যুদ্ধে কোনো বৃহৎ শক্তির এত বিপুলসংখ্যক সেনা হতাহতের শিকার হননি।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি

অন্যদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি চলতি মাসের শুরুর দিকে দাবি করেন, পুরো যুদ্ধে ৫৫ হাজার ইউক্রেনীয় সেনা নিহত হয়েছেন।

সিএসআইএসের অনুমান, ইউক্রেনের সর্বোচ্চ ৬ লাখ সেনা হতাহতের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার নিহত হতে পারেন।

সামরিক জনবলের ক্ষয়ক্ষতির বাইরে বেসামরিক প্রাণহানির পরিসংখ্যানও ভয়াবহ। জাতিসংঘের ইউক্রেনবিষয়ক মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ মিশনের হিসাবে, চার বছরের যুদ্ধে ১৫ হাজার ১৬৮ জন ইউক্রেনীয় বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন; আহত হয়েছেন ৪১ হাজার ৫৩৪ জন।

অগ্রগতি নাকি স্থবিরতা

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের তথ্যমতে, ইউক্রেনের প্রায় ২০ শতাংশ (এক-পঞ্চমাংশ) ভূখণ্ড এখন রাশিয়ার দখলে। এর মধ্যে ২০১৪ সালে দখল করা ক্রিমিয়া উপদ্বীপও আছে।

যুদ্ধের শুরুতে ২০২২ সালের মার্চে রাশিয়া সর্বোচ্চ ২৬ শতাংশ ইউক্রেনীয় ভূখণ্ড দখলে নিয়েছিল বলে জানায় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিন্তক প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার (আইএসডব্লিউ)। পরে ইউক্রেন কিছু এলাকা পুনর্দখল করে। ফলে রাশিয়ার দখল করা এলাকা কমে আসে।

আইএসডব্লিউ বলছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর নাগাদ ইউক্রেনের ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ ভূখণ্ড (প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার বর্গকিলোমিটার) দখলে রেখেছে রাশিয়া।

রাশিয়ার বিধ্বস্ত ট্যাংক

আইএসডব্লিউর তথ্যমতে, রাশিয়া শুধু ২০২৫ সালে ইউক্রেনের প্রায় ৪ হাজার ৭০০ বর্গকিলোমিটার ভূখণ্ড দখল করেছে।

তবে রাশিয়ার দাবি, তারা গত বছর আরও বেশি ভূখণ্ড দখল করেছে। এর পরিমাণ প্রায় ছয় হাজার বর্গকিলোমিটার।

বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার এই অগ্রগতি এসেছে বিপুল প্রাণহানির বিনিময়ে। আর তা কৌশলগতভাবে রাশিয়ার জন্য বড় কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। বিশেষ করে গত তিন বছরে যুদ্ধ অনেকটাই স্থবির হয়ে আছে।

এই সময়কালে রাশিয়া তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি অর্জনে হিমশিম খেয়েছে। অন্যদিকে ইউক্রেনও বড় আকারে রাশিয়ার দখলে যাওয়া এলাকা পুনরুদ্ধারে সক্ষম হয়নি। এ সময়ে যুদ্ধে উভয় পক্ষ বিপুল ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে।

শান্তি আলোচনা কত দূর

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

আলোচনার মাধ্যমে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের চেষ্টা চালিয়ে আসছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে সমাধান এখনো অধরা।

গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো অবকাশযাপন কেন্দ্রে ট্রাম্প ও জেলেনস্কি বৈঠক করেছিলেন। বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্রের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার ৯০ শতাংশ বিষয়ে একমত হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।

অন্যদিকে ট্রাম্প বলেছিলেন, যুদ্ধ বন্ধে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর খুব কাছাকাছি রয়েছেন তাঁরা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থামবে কি না, তা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বোঝা যাবে। সবকিছু ভালোভাবে এগোলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে চুক্তি হয়ে যাবে।

এরপর আরও শান্তি আলোচনা হয়েছে; কিন্তু কোনো দৃশ্যমান ফলাফল আসেনি। চলতি মাসে জেলেনস্কি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চায় আগামী জুনের মধ্যে এই যুদ্ধের অবসান হোক।

সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ দফা আলোচনা কোনো বড় অগ্রগতি ছাড়াই শেষ হয়েছে।

অবশ্য ইউক্রেনীয় একটি কূটনৈতিক সূত্রের ভাষ্য, সামরিক বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলাইন লেভিট দাবি করেন, উভয় পক্ষের মধ্যে ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’ হয়েছে। শান্তিচুক্তির লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে।

গত তিন বছরে যুদ্ধ অনেকটাই স্থবির হয়ে আছে

তবে ভূখণ্ড-সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো অগ্রগতি যে এখনো হয়নি, তা স্পষ্ট। আর এ বিষয় ছাড়া যুদ্ধবিরতি অসম্ভব। এ ব্যাপারটিতে মস্কো ও কিয়েভের মধ্যে অনেকটা মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের চিফ অব স্টাফ জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহের শেষে আরেক দফা আলোচনা হতে পারে। তবে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা যে সহজ হবে না, তা অকপটে স্বীকার করেছে ইউক্রেনীয় পক্ষ।

অনড় জেলেনস্কি সম্প্রতি বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করে বলেছেন, এই যুদ্ধে তাঁর দেশের পরাজয়ের প্রশ্নই ওঠে না। ইউক্রেনের জনগণ বিজয়ী হিসেবেই এই যুদ্ধ শেষ করবে।

সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দাবি করা যুদ্ধবিরতি চুক্তির ‘মূল্য’ পরিশোধের ঘোর বিরোধিতা করেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেছেন, পুতিন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করেছেন। আর তাঁকে অবশ্যই থামাতে হবে।

পুতিন কী চান

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন

রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন আসলে কী চান, সে বিষয়ে একটি জুতসই পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন উত্তর আমেরিকাকেন্দ্রিক চিন্তক প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর পিস অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসির সিনিয়র ওয়াশিংটন ফেলো নিকোলাই পেট্রো। তাঁর ভাষ্যে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই পুতিনের শান্তি-শর্তগুলো একই রয়েছে। সেগুলো হলো ১. নিরপেক্ষ ও পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত ইউক্রেন, যেটি কোনো সামরিক জোটের সদস্য হবে না; ২. নিরস্ত্রীকৃত ইউক্রেন; ৩. নাৎসিবাদমুক্ত ইউক্রেন।

এ ছাড়া ক্রিমিয়া, দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন ও জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলের ওপর রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি মস্কোর কাছে আপসযোগ্য নয় বলে মত নিকোলাই পেট্রোর। এ ব্যাপারে মস্কোর দৃষ্টিভঙ্গি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তবে ইউক্রেন আনুষ্ঠানিকভাবে তা স্বীকার না করলেও চলবে। মস্কোর শর্ত হলো এসব অঞ্চল থেকে ইউক্রেনকে তার সেনা প্রত্যাহার করতে হবে।

নিকোলাই পেট্রো বলেন, রাশিয়ার ক্ষেত্রে পূর্ণ বিজয় বলতে বোঝাবে উল্লিখিত তিনটি লক্ষ্যই অর্জন করা। এর কম কিছু অর্জিত হলে রাশিয়া সেটিকে আংশিক (তবু মূল্যবান) বিজয় হিসেবে বিবেচনা করবে। আর পশ্চিমা বিশ্ব সেটিকেই রাশিয়ার পরাজয় হিসেবে প্রচার করবে।

পুতিন নিশ্চয়ই এমন কোনো শর্তে রাজি হবেন না, যা তাঁর রাশিয়ার পরাজয়ের শামিল।

তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা, বিবিসি, সিএনএন, রয়টার্স ও রেসপনসিবল স্টেটক্র্যাফট।