ফ্রান্সের শামোনিতে তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে এক ব্যক্তি নিজের শরীরে পানি ছিটিয়ে শীতল হওয়ার চেষ্টা করছেন। ২৫ জুন ২০২৬
ফ্রান্সের শামোনিতে তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে এক ব্যক্তি নিজের শরীরে পানি ছিটিয়ে শীতল হওয়ার চেষ্টা করছেন। ২৫ জুন ২০২৬

ইতিহাসের উষ্ণতম জুন-জুলাই পেরোল ইউরোপ, আরও বিপদ আসছে

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পশ্চিম ইউরোপজুড়ে এই গ্রীষ্মে রেকর্ড মাত্রার তাপপ্রবাহ, খরা ও দাবানল দেখা দিয়েছে। এর ফলে অঞ্চলটি ইতিহাসের উষ্ণতম জুন-জুলাই মাস পার করেছে বলে গতকাল সোমবার জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থা।

বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা মহাদেশ ইউরোপ। এ বছর গ্রীষ্মের প্রথম দুই মাসে অঞ্চলটি একের পর এক তাপপ্রবাহ, তীব্র গরম এবং চরম শুষ্ক আবহাওয়া ও দাবানলের মুখোমুখি হয়েছে।

কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস (সিসিএস) বলছে, জুন-জুলাই মাসে পশ্চিম ইউরোপের গড় তাপমাত্রা ছিল ২১ দশমিক ৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা একই সময়ে আগের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। আগের রেকর্ডটি হয়েছিল ২০২২ সালে।

কোপার্নিকাসের তথ্য অনুযায়ী, এ গ্রীষ্মে দীর্ঘ সময় ধরে অস্বাভাবিক গরম আবহাওয়া থাকার কারণেই তাপমাত্রা রেকর্ড উচ্চতা উঠেছে।

আমরা এখন একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনোর মুখোমুখি, যার তীব্রতা সম্ভবত নজিরবিহীন হতে পারে। এটা স্পষ্ট, ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগর থেকে আসা প্রভাব এখন বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কার্লো বুয়োনতেম্পো, জলবায়ুবিজ্ঞানী

সংস্থাটি আরও বলেছে, এমনকি পশ্চিম ইউরোপে সর্বশেষ ২০২২ সালের জুলাই মাসে দেখা দেওয়া ভয়াবহ খরার তুলনায় এখন সেখানে মাটির আর্দ্রতার মাত্রা উল্লেখযোগ্য রকম কম, যা ওই অঞ্চলে শুষ্ক পরিস্থিতির আরও অবনতির ইঙ্গিত দেয়।

ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর মিডিয়াম-রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টসের (ইসিএমডব্লিউএফ) সামান্থা বার্গেস বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে চরম তাপপ্রবাহকে আরও তীব্র করে তুলছে, এটি তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ। একই সঙ্গে তাপপ্রবাহ ও খরা ক্রমেই একে অপরকে শক্তিশালী করছে এবং পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর করে তুলছে।’

ফ্রান্সে একটি দাবানল নেভাতে কাজ করছেন অগ্নিনির্বাপক বাহিনীর সদস্যরা

গত জুলাই মাসে ফ্রান্স, স্পেন, অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরিসহ পশ্চিম ও মধ্য ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চরম শুষ্ক পরিস্থিতি দেখা গেছে। একই ধরনের শুষ্ক আবহাওয়া যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড ও আইসল্যান্ডের কিছু অংশেও পরিলক্ষিত হয়েছে।

এল নিনো হলো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুচক্রের উষ্ণ পর্যায়, যা সাময়িকভাবে ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে খরা, বন্যা ও অন্যান্য চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনা দেখা দিতে পারে।

নদীগুলোর পানিপ্রবাহ ছিল অস্বাভাবিক রকম কম। বিশেষ করে ফ্রান্সের সেইন, জার্মানির রাইন এবং ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ দানিউব নদী খরায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে ইউরোপের কয়েকটি দেশে পরিবহন, সেচব্যবস্থা এবং জ্বালানি উৎপাদন কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

এই তীব্র গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া দাবানল ছড়িয়ে পড়ার জন্যও অত্যন্ত অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইউরোপে দাবানল-সহায়ক চরম আবহাওয়ার ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে।

এবার ফ্রান্স ও স্পেন সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানলের মোকাবিলা করেছে। এ ছাড়া ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশ, পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও কানাডাতেও বড় বড় দাবানলের ঘটনা ঘটেছে।

‘সামনে আরও তাপপ্রবাহ আসছে’

কোপার্নিকাসের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপের আশপাশের সমুদ্রাঞ্চলে সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ এবং প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনোর প্রভাবে জুলাই মাসে টানা দ্বিতীয় মাসের মতো বিশ্বের মহাসাগরগুলোর তাপমাত্রা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।

জুলাই মাসে বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা ছিল ২০ দশমিক ৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ২০২৩ সালে হওয়া আগের রেকর্ডকে অতিক্রম করেছে।

কোপার্নিকাসের পরিচালক কার্লো বুয়োনতেম্পো বলেন, ভূমধ্যসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরের কিছু অংশে অস্বাভাবিক উষ্ণতা দেখা গেলেও সমুদ্রের রেকর্ড তাপমাত্রার পেছনে মূল চালিকা শক্তি সম্ভবত ক্রমে শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনো।

কার্লো বুয়োনতেম্পো বলেন, ‘সমুদ্রে রেকর্ড তাপমাত্রার পেছনে এল নিনোই সম্ভবত প্রধান ভূমিকা পালন করছে।’

জলবায়ুবিজ্ঞানী কার্লো বুয়োনতেম্পো ৫ আগস্ট সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা এখন একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনোর মুখোমুখি, যার তীব্রতা সম্ভবত নজিরবিহীন হতে পারে। এটা স্পষ্ট, ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগর থেকে আসা প্রভাব এখন বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।’

বিশ্বজুড়ে সমুদ্রে তাপমাত্রা বৃদ্ধির পেছনে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের এই জলবায়ুগত ঘটনাটির অবদান ক্রমেই বাড়ছে বলেন মনে করেন তিনি।

এল নিনো হলো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুচক্রের উষ্ণ পর্যায়, যা সাময়িকভাবে ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে খরা, বন্যা ও অন্যান্য চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনা দেখা দিতে পারে।

এ ছাড়া জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে এরই মধ্যে উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবীতে এল নিনো আরও অতিরিক্ত তাপ যোগ করে।

সাধারণত এল নিনো বছরের শেষ দিকে সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছায়। এরপর সমুদ্রে সঞ্চিত অতিরিক্ত তাপ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে, যা বৈশ্বিক তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়।

এল নিনোর প্রভাবেই ২০২৩ ও ২০২৪ সাল যথাক্রমে রেকর্ডের দ্বিতীয় ও প্রথম উষ্ণতম বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল।

কার্লো বুয়োনতেম্পো বলেন, বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, চলতি বছরের শেষ দিকে অথবা ২০২৭ সালের শুরুর দিকে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড গড়তে পারে।

কোপার্নিকাস জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে গত জুলাই ছিল রেকর্ডের দ্বিতীয় উষ্ণতম জুলাইগুলোর একটি। ওই মাসে ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি বায়ুর গড় তাপমাত্রা ১৮৫০–১৯০০ সালের প্রাক্-শিল্পযুগের গড় তাপমাত্রার চেয়ে ১ দশমিক ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।

দাবানল নেভাতে কাজ করছেন স্পেনের মিলিটারি ইমারজেন্সি ইউনিটের (ইউএমই) সদস্যরা

বুয়োনতেম্পো বলেন, রেকর্ডের সবচেয়ে উষ্ণ বছরগুলো গত ১১ বছরের মধ্যে এসেছে। তিনি আরও বলেন, ‘জীবদ্দশায় এত উষ্ণ জলবায়ু আমরা আগে কখনো দেখিনি। এমনকি সম্ভবত মানবসভ্যতার ইতিহাসেও এমন উষ্ণ জলবায়ু আগে কখনো দেখা যায়নি। আর আমরা জানি, এই উষ্ণায়নের প্রধান কারণ বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি।’

মানবসৃষ্ট কার্বন নিঃসরণের ফলে উৎপন্ন অতিরিক্ত তাপের বেশির ভাগই মহাসাগরগুলো শোষণ করে। ফলে জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে সমুদ্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে সমুদ্রের তাপমাত্রা বেড়ে গেলে এর নেতিবাচক প্রভাবও দেখা দেয়। উষ্ণ সমুদ্র শক্তিশালী ঝড় ও অতিবৃষ্টিকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে এবং প্রবালপ্রাচীরের ব্যাপক ক্ষয় বা বিবর্ণতা ঘটাতে পারে।

কোপার্নিকাস স্থলভাগ ও সমুদ্র থেকে সংগ্রহ করা কোটি কোটি উপগ্রহ ও আবহাওয়া–সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে এসব পরিমাপ করে থাকে। তারা ১৯৪০ সাল থেকে জলবায়ু-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করছে।